বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস আজ
রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করি
Advertisement
মো শামীম আলম খান
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমরা যখন অসুস্থ হয়ে পড়ি তখন স্বাভাবিক ভাবেই কোনো না কোনো চিকিৎসক, এমন কি কখনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। চিকিৎসক যথাযথ টেস্ট ও ডায়াগনোসিসের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করে একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। আমরা সেই চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র অনুসারে নিকটবর্তী ফার্মেসি থেকে ওষুধ ক্রয় করে রোগ থেকে মুক্তির আশায় চিকিৎসা চালিয়ে যায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর সফলতা পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এরই মাঝে কখনো কখনো ওষুধের কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে যায়, যা অনেক সময় আলোচনায় আসে না। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ক্রমাগত জটিলতা এবং হাসপাতাল, ক্লিনিক, চেম্বার বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর অব্যবস্থাপনা, ওষুধ বিক্রয়, বিতরণ ও সংরক্ষণের অব্যবস্থাপনাসহ নানাবিধ কারণে এখন রোগীর স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে ওষুধের অনাকাঙ্খিত ঘটনার কারণে রোগী অসুস্থ হওয়া এমন কি মৃত্যু হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে হাসপাতালের চিকিৎসার সময় প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি রোগীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ওষুধের অনাকাঙ্খিত ঘটনার ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এবং এর মধ্যে ২৬ লাখ রোগীর মৃত্যু হয়। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রতি ১০ জনে একজন রোগী কোনো না কোনো ক্ষতির স্বীকার হোন। আর এসবের কারণে বিশ্বজুড়ে রোগীর নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। রোগীর এই নিরাপত্তার স্বার্থে ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস পালন করে আসছে।
বিশ্বব্যাপী রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার করা, রোগীর নিরাপত্তার স্বার্থে পারস্পরিক বিষয়গুলো আদান-প্রদান করা, ওষুধসহ স্বাস্থ্যখাতে সম্ভাব্য ক্ষতি হ্রাসের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশসমূহকে পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। এই বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস প্রতি বছর কোনো না কোনো বিশেষ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে পালিত হয়। যেমন এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘নন-কমিউনিকেবল রোগের নিরাপদ সেবা’। এখন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বা রোগ বলতে কি বুঝি, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বা রোগ হল- সেই সব রোগ সমূহ যেগুলো সংক্রমণ নয় অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনের মাঝে ছড়ায় না। এই রোগসমূহ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী হয় এবং ধীরে ধীরে খারাপের দিকে এগোতে থাকে। যেমন- হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, ক্যানসার, অ্যাজমা ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কেন এবার এই নন-কমিউনিকেবল রোগকে প্রাধান্য দিল।
দেখা যাচ্ছে, সারাবিশ্বে কোটি কোটি রোগী এই জাতীয় রোগে ভুগছেন এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭৪ শতাংশ মৃত্যুর কারণ, এই জাতীয় নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ। আমরা সবাই জানি, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, অ্যাজমা এবং মানসিক রোগ- এগুলো দীর্ঘমেয়াদী রোগ এবং তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা দীর্ঘসময় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমৃত্যু চালিয়ে যেতে হয়। আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- এই সব রোগ কখনো একটি ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা সম্পন্ন করা যায়না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চড়ষুঢ়যধৎসধপু অর্থাৎ একসঙ্গে অনেক ওষুধ সেবন করতে হয়। যেহেতু দীর্ঘমেয়াদী এবং একই সঙ্গে অনেক ওষুধ সেবন করতে হয় সেক্ষেত্রে ওষুধের অনাকাঙ্খিত ঘটনা বা ক্ষতির কারণ হতে পারে। ওষুধের অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়ানো, এমনকি ঘটনা ঘটে গেলেও তার সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য এবং ওষুধের ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে এই সকল অনাকাঙ্খিত ক্ষতিকর ঘটনা আমাদের দেশের ওষুধ বিষয়ক সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে অবহিত করা উচিত। ওষুধ প্রশাসনে বিশেষজ্ঞ সমৃদ্ধ একটি ADRM (Adverse Drug Reaction Monitoring Cell) আছে।
যারা এই সকল রিপোর্ট গ্রহণ, বিশ্লেষণ, বিবেচনা করে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করেন উক্ত ওষুধটির ব্যবহারের সঠিক নির্দেশনার আশায়। সুতরাং ওষুধের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাক্তিবর্গ যেমন রোগী, ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মী সকলের দায়িত্ব ওষুধ ব্যবহারের ফলে কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা, কি ধরণের যেমন- মৃদু, মাঝারী, মারাত্মক নাকি মৃত্যু ঘটিত এবং সম্ভাব্য কোনো ওষুধের কারণে তা যতার্থ ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে নির্ধারিত ফর্মে বা ফোনে অথবা ইমেইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে অবহিত করা। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি এবং হাসপাতাল ও ক্লিনিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ এই তথ্যগুলো সঠিকভাবে সঠিক সময়ে প্রদানে বিশেষ ভুমিকা রাখতে পারে। আর এই রিপোর্টের মাধ্যমেই আমরা Good Pharmacovigilance Practices প্রতিষ্ঠা করতে পারি যাতে করে আর বেশি ওষুধ সম্পর্কিত অনাকাঙ্খিত ঘটনাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এখানে উল্লেক্ষ্য যে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনে একজন এই ওষুধ সম্পর্কিত অনাকাঙ্খিত ঘটনার স্বাস্থ্যক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আরও বলা যায়, প্রতি তিনজনে একজন ক্যানসার রোগী ক্ষেত্রে ওষুধের অনাকাঙ্খিত ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং আমাদের সকলকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে- এই সকল নন-কমিউনিকেবল রোগের রোগীর চিকিৎসাকালীন যেন কোনো ধরণের অনাকাঙ্খিত ঘটনা না ঘটে এবং প্রয়োজনে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
মনে রাখতে হবে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজের ক্ষেত্রে সেই পুরোনো বানী Prevention is better than cure অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়। আমরা যদি স্বাস্থ্যকর পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করি, ফাস্টফুড এড়িয়ে চলি, নিয়মিত ব্যায়াম করি, ধুমপান-মদ্যপান থেকে বিরত থাকি, মানসিক চাপ এড়িয়ে চলি, সময়মত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করি, তবে এই সকল রোগ হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারি। সেই সঙ্গে উপহার দিতে পারি একটি সুস্থ জাতি। সুতরাং আজ এই বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসে আমাদের সকলের অঙ্গীকার হওয়া উচিত নন-কমিউনিকেবল রোগ প্রতিরোধ করব, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।
লেখক
সিনিয়র ফার্মাসিস্ট, বি ফার্ম, এম ফার্ম (ঢাবি)
