রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়?
Advertisement
আবদুল আহাদ সালমান
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একজন মানুষ যখন বিমানবন্দরের গেট দিয়ে বিদেশের উদ্দেশে বেরিয়ে যান, তখন তিনি শুধু একজন যাত্রী নন। তার কাঁধে থাকে একটি পরিবারের দায়িত্ব, চোখে থাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর বুকের ভেতর থাকে দেশ ছাড়ার অদৃশ্য কষ্ট।
মায়ের চোখে পানি, বাবার নীরব দোয়া, স্ত্রীর উৎকণ্ঠা, সন্তানের প্রশ্ন—‘বাবা কবে ফিরবে?’—সবকিছু পেছনে ফেলে তিনি পাড়ি জমান অচেনা এক দেশে।
কেউ যান শ্রমিক হয়ে। কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ রেস্তোরাঁকর্মী, কেউ চালক, কেউ কৃষিশ্রমিক। কেউ আবার ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক কিংবা প্রযুক্তিবিদ। পেশা ভিন্ন, দেশ ভিন্ন, জীবনযাত্রা ভিন্ন। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মিল আছে—তারা বাংলাদেশের সন্তান।
বিদেশের মাটিতে তাদের শ্রমে বাংলাদেশের পরিবার চলে। তাদের পাঠানো অর্থে সন্তানের পড়াশোনা হয়, ঘর নির্মিত হয়, জমি কেনা হয়, চিকিৎসার খরচ চলে। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। একই তথ্য বলছে, দেশের চলতি হিসাবের অবস্থার উন্নতিতেও শ্রমিকদের রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই। প্রবাসী কি শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর একটি মাধ্যম?
রেমিট্যান্সের সময় তিনি দেশের অর্থনীতির নায়ক, কিন্তু বিপদের সময় তিনি কেন অনেক ক্ষেত্রে একা? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিমানবন্দরে প্রবাসী: সম্মান কোথায়?
বিদেশ যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে একজন প্রবাসীকে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দেশে ফেরার সময়ও তার সঙ্গে থাকে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, লাগেজ, পরিবারের জন্য কেনাকাটা এবং বহুদিন পর আপনজনকে দেখার আবেগ।
কিন্তু বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা যদি হয় হয়রানি, অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণ, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—যে মানুষটি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, রাষ্ট্রের প্রবেশদ্বারে তার সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
প্রবাসীর জন্য আলাদা লাউঞ্জ, বিভিন্ন সেবা ও সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি ব্যবস্থায় প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথাও উল্লেখ আছে।
কিন্তু সুযোগ-সুবিধা থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন একটি প্রবাসীবান্ধব আচরণ সংস্কৃতি।
একজন প্রবাসীকে যেন মনে না হয়, তিনি নিজের দেশে ফিরে কোনো অপরাধ করেছেন।
দূতাবাস: প্রবাসীর শেষ আশ্রয়ের জায়গা
বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলার মিশনগুলো একজন প্রবাসীর কাছে শুধু পাসপোর্ট বা কাগজপত্রের অফিস নয়। বিপদের মুহূর্তে সেটিই হওয়া উচিত তার রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান আশ্রয়।
পাসপোর্ট হারিয়েছে, চাকরিদাতা বেতন দিচ্ছে না, কারও বিরুদ্ধে অন্যায় মামলা হয়েছে, দুর্ঘটনা ঘটেছে, কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে, কেউ হাসপাতালে, কেউ নিখোঁজ, আবার কারও মৃত্যু হয়েছে—এসব মুহূর্তে প্রবাসী বুঝতে চান, ‘আমার দেশ কি আমার পাশে আছে?’
সরকার ইতোমধ্যে প্রবাসীদের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নিরসন সেল গঠনের কথা জানিয়েছে।
এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। কিন্তু এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে একজন বিপদগ্রস্ত প্রবাসীর অভিজ্ঞতায়।
কত ঘণ্টায় উত্তর মিলল? কত দিনে সমস্যার সমাধান হলো? কতটা স্বচ্ছ ছিল প্রক্রিয়া? কর্তৃপক্ষ কি নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখল? রাষ্ট্রীয় সেবার আসল পরীক্ষা অফিসের টেবিলে নয়, মানুষের সংকটের মুহূর্তে।
বিদেশের মাটিতে মৃত্যু: সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা
প্রবাসী জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় মৃত্যু। একজন মানুষ জীবিত অবস্থায় পরিবারের জন্য টাকা পাঠান। নিজের কষ্টের কথা অনেক সময় পরিবারকে জানান না। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই মানুষটির শেষ ঠিকানাটুকুও নিশ্চিত করতে পরিবারকে সংগ্রাম করতে হয়।
ইউরোপের কোনো দেশে একজন বাংলাদেশি মারা গেলে তার মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। প্রবাসী সমাজের অভিজ্ঞতায় অনেক ক্ষেত্রে কয়েক হাজার ইউরো পর্যন্ত খরচের কথা সামনে আসে। পরিবার যদি সেই অর্থ বহন করতে না পারে, তখন শুরু হয় আরেক সংগ্রাম।
মানুষের দরজায় দরজায় যেতে হয়।
কেউ দেন ১০ ইউরো।
কেউ দেন ২০ ইউরো।
কেউ দেন ১০০ ইউরো।
এভাবে চাঁদা তুলে একজন মানুষের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়। ভাবুন দৃশ্যটি।
একজন মানুষ জীবিত অবস্থায় দেশের অর্থনীতিতে অর্থ পাঠিয়েছেন। মৃত্যুর পর তার লাশ দেশে পাঠানোর জন্য তারই স্বজনদের বিদেশের রাস্তায় মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে।
এর চেয়ে নির্মম বৈপরীত্য আর কী হতে পারে?
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অবশ্য প্রবাসে মৃত কর্মীর মরদেহ দেশে আনতে সহায়তার বিধান রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা হয়।
দেশে মরদেহ পৌঁছানোর পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে পরিবহন ও দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। পাশাপাশি মৃত কর্মীর পরিবারকে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদানের বিধান রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই সহায়তা কি বাস্তব খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
যদি একজনের মরদেহ দেশে পাঠাতে কয়েক হাজার ইউরো প্রয়োজন হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় সহায়তার কাঠামো কি সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন নয়?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: কোনো প্রবাসীর লাশ দেশে পাঠানোর জন্য তার পরিবারকে কি মানুষের কাছে গিয়ে চাঁদা তুলতে হবে? রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়? আমরা রেমিট্যান্সের মাসিক হিসাব প্রকাশ করি। কত বিলিয়ন ডলার এসেছে, কত শতাংশ বেড়েছে, কোন মাসে রেকর্ড হয়েছে—সবকিছুর হিসাব থাকে।
কিন্তু কতজন প্রবাসী বিদেশে আহত হলেন?
কতজন প্রতারণার শিকার হলেন?
কতজন বেতন পেলেন না?
কতজন কারাগারে গেলেন?
কতজন কর্মক্ষেত্রে মারা গেলেন?
কতজন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানসিক ও সামাজিক সংকটে পড়লেন?
কতজন দেশে ফিরে আর কোনো কর্মসংস্থান পেলেন না?
এই হিসাবগুলো কি একই গুরুত্বে আলোচিত হয়?
প্রবাসীকে যদি অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার জীবনকেও অর্থনীতির বাইরে রাখা যাবে না।
প্রবাসী বিনিয়োগ চান, শুধু সম্মান নয়, আস্থাও চান
প্রবাসীরা শুধু টাকা পাঠাতে চান না। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চান।
অনেকে জমি কিনেছেন, ব্যবসা করেছেন, শিল্প স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছেন। কেউ কৃষিতে বিনিয়োগ করতে চান, কেউ প্রযুক্তিতে, কেউ পর্যটনে, কেউ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে।
কিন্তু বিনিয়োগের সঙ্গে প্রয়োজন নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা এবং আইনি নিশ্চয়তা।
একজন প্রবাসী যদি বছরের পর বছর বিদেশে শ্রম দিয়ে অর্জিত অর্থ দেশে বিনিয়োগ করতে চান, অথচ জমি, ব্যাংকিং, কর, প্রশাসনিক অনুমোদন কিংবা ব্যবসায়িক জটিলতায় পড়ে আস্থা হারান, তাহলে ক্ষতি শুধু একজন ব্যক্তির নয়। ক্ষতি দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার।
তাই প্রবাসী বিনিয়োগকে ‘অনুদান’ বা ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে দেখা যাবে না। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য শক্তি।
ইউরোপে নতুন বাস্তবতা
ইউরোপে বাংলাদেশি অভিবাসীদের জীবনও বদলে যাচ্ছে। একসময় প্রবাসী মানেই ছিল শ্রমিক। এখন বাংলাদেশিরা উদ্যোক্তা হচ্ছেন, ব্যবসা করছেন, রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল এজেন্সি, আমদানি-রপ্তানি, নির্মাণ, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সেবা খাতে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন।
দ্বিতীয় প্রজন্ম বেড়ে উঠছে ইউরোপের সমাজে। তাদের কেউ বাংলা বলতে পারে, কেউ পারে না। কেউ বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, কেউ জন্মভূমিকে শুধু বাবা-মায়ের গল্পে চেনে।
এই নতুন প্রবাসী বাস্তবতার জন্য বাংলাদেশেরও নতুন নীতি প্রয়োজন।
শুধু ‘রেমিট্যান্স পাঠান’ বললে হবে না।
বলতে হবে—
আপনার অধিকার আছে। আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আপনার বিনিয়োগের জন্য রাষ্ট্র পাশে থাকবে।
আপনার সন্তানদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গড়ে তুলতেও রাষ্ট্র কাজ করবে। এখন দরকার জবাবদিহি
প্রবাসী কল্যাণের নামে প্রকল্প, ডেস্ক, হেল্পলাইন, ওয়েবসাইট এবং নীতিমালা থাকা যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন হলো, সেবা কতটা কার্যকর?
প্রবাসীদের অভিযোগের কত শতাংশ নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে?
দূতাবাসগুলোর কনস্যুলার সেবার মান কী?
বিদেশে মৃত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে পাঠাতে গড় ব্যয় কত?
রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেতে কতদিন লাগে?
প্রবাসীদের বিনিয়োগের কতগুলো অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে?
এই তথ্যগুলো প্রকাশ্যে আসা দরকার।
কারণ জবাবদিহি ছাড়া প্রবাসী কল্যাণ একটি স্লোগান হয়ে থাকে।
শেষ কথা
প্রবাসী বাংলাদেশের বাইরে বসবাস করেন, কিন্তু বাংলাদেশ তার ভেতরে বসবাস করে।
তিনি ঈদের দিন পরিবারকে টাকা পাঠান।
বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ দেন।
সন্তানের স্কুলের ফি দেন।
দেশে ঘর বানান।
জমি কেনেন।
ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন।
আর নীরবে দেশের অর্থনীতিতে নিজের অংশটুকু দিয়ে যান।
তাই রাষ্ট্রের কাছে তার দাবি দয়া নয়।
এটি তার অধিকার।
আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখন একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হবে:
প্রবাসী নীতি কি সত্যিই প্রবাসীবান্ধব, নাকি আমরা এখনো প্রবাসীকে মূলত রেমিট্যান্সের একটি উৎস হিসেবেই দেখি?
যে রাষ্ট্র তার কাছ থেকে অর্থনৈতিক অবদান প্রত্যাশা করে, সেই রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে তার জীবন, শ্রম, বিনিয়োগ, পরিবার এবং মৃত্যুর পর তার মরদেহের মর্যাদা নিশ্চিত করার।
প্রবাসীর হাতে যখন টাকা থাকে, তখন তাকে ‘দেশের সম্পদ’ বলা সহজ।
কিন্তু যখন সে বিদেশের হাসপাতালের বিছানায় অসহায়, থানার হাজতে বন্দী, চাকরিদাতার কাছে বেতনহীন, অথবা মৃত্যুর পর হিমঘরে পড়ে থাকে, তখনও তাকে বাংলাদেশের সম্পদ এবং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেখার সক্ষমতাই রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিকতার পরীক্ষা।
রেমিট্যান্সের অঙ্ক দিয়ে প্রবাসীর মূল্য নির্ধারণ করা যাবে না।
কারণ— প্রবাসী শুধু রেমিট্যান্সের নাম নয়। প্রবাসী একজন মানুষ। তিনি বাংলাদেশের সন্তান।
তার শ্রমের যেমন মূল্য আছে, তার জীবনেরও তেমনি মূল্য আছে। আর তার মৃত্যুর পরও তার মর্যাদা রাষ্ট্রের দায়িত্বের বাইরে নয়।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (PBCCI)
