চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?
Advertisement
আজিম ভূঁইয়া
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
ছবি-এআই সম্পাদিত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্রতারণা, অবৈধ অনলাইন জুয়া, ভূয়া ঋণ দেয়া অ্যাপ অবৈধ ভিওআইপি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থপাচারের সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের সম্পৃক্ততার বেশ কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় অধিকাংশ চীনা নাগরিকের নাম আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে কেন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে? আর কেন এসব চক্রে কিছু চীনা নাগরিকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় একটি কথিত অনলাইন প্রতারণা চক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা। তাদের মধ্যে পাঁচজন চীনা নাগরিক ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কাছ থেকে ৫১ হাজারের বেশি মোবাইল সিম, ভিওআইপি গেটওয়ে ডিভাইস, মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার ল্যাপটপ জব্দ করার কথা জানায়। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী টেলিগ্রাম অ্যাপ, ওয়াটসঅ্যাপ, ইমু এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অনলাইন ভুয়া চাকরি, আকর্ষণীয় বিনিয়োগ ও ঘরে বসে অনলাইনে আয়ের বিভিন্ন উপায় দেখানো হতো।
এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা ও অর্থপাচারের অভিযোগে আরও কয়েকজন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তারের খবর আসে। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ ছিল, অনলাইন জুয়া ও প্রতারণার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বিদেশে পাচার করা হচ্ছিল নিয়মিত।
এছাড়া আগস্টে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তিন চীনা নাগরিকসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় পুলিশ ৬ হাজারের বেশি সক্রিয় সিম, ২০টি গেটওয়ে ডিভাইস ও ১৪টি ল্যাপটপ উদ্ধারের কথা জানায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি অবৈধ ভিওআইপি, অনলাইন জুয়া এবং অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারে। একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে পাঁচ চীনা ও একজন তাইওয়ানের নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রায় ১,৯৩৮টি আইফোনসহ বিপুলসংখ্যক ল্যাপটপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির সঙ্গে আরও শত শত বিদেশি নাগরিকের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচার ও তদন্তের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশের কারা কারা জড়িত সে বিষয়ে কোন কিছুই প্রকাশ করা হয় নি!
বর্তমানে অনলাইন প্রতারণা কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র সাধারণত এমন দেশকে তাদের কার্যক্রমের জন্য বেছে নেয় যেখানে কম খরচে বড় সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, সহজে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি ও প্রবেশ করা যায় এবং স্থানীয় সহযোগী সহজেই পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে রয়েছে বিপুল মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী, দ্রুত গতির বিস্তৃত ইন্টারনেট ব্যবহার এবং জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবস্থা। ফলে একটি প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন, ফোনকল, এসএমএস বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দিয়ে খুব অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্যের সিম ও অন্যদের পরিচয় ব্যবস্থাপনা সহজেই পাওয়া যায়। বিপুলসংখ্যক সিম ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয় তৈরি, বিভিন্ন নম্বর থেকে যোগাযোগ এবং ডিভাইস পরিবর্তনের মাধ্যমে তদন্তকে জটিল করার চেষ্টা করা হতে পারে। গত জানুয়ারিতে একটি অভিযানে ৫১ হাজারের বেশি সিম উদ্ধারের ঘটনাটি এ ধরনের ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ।
চীনা নাগরিকদের সম্পৃক্ততা যে উদ্বেগের কারণ
প্রথমত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্ক বিস্তারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব নেটওয়ার্কে বিভিন্ন দেশের নাগরিক যুক্ত থাকে এবং তাদের কাজও ভাগ করা থাকে! কেউ প্রযুক্তি পরিচালনা করে, কেউ অর্থ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে, কেউ ভুক্তভোগী সংগ্রহ করে এবং কেউ স্থানীয় সকল ব্যবস্থাপনা করে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে স্থানীয় সহযোগী ছাড়া এ ধরনের বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা কঠিন। বাসা, হোটেল বা অফিস ভাড়া করা, সিম সংগ্রহ, স্থানীয় ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর, কর্মী সংগ্রহ প্রতিটি পর্যায়েই স্থানীয় সহযোগিতার প্রয়োজন হয়।
তৃতীয়ত, অনলাইন প্রতারণা এখন আর শুধু একটি কম্পিউটার ও কয়েকটি ফোনের অপরাধ নয়। এটি অনেক ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক মডেলের মতো পরিচালিত হয়; ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, ভুয়া ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, ডেটাবেস, কলিং সিস্টেম, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অর্থ স্থানান্তরের বিভিন্ন স্তর এতে যুক্ত থাকে।
কক্সবাজারের সাম্প্রতিক ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ। কারণ সেখানে পুলিশ শুধু কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেনি; বিপুলসংখ্যক মোবাইল ডিভাইস এবং একটি বড় নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য অস্তিত্বের কথা জানিয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা অনুযায়ী, কয়েকশ বিদেশি নাগরিকের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ব্যাপকহারে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে গেছে, যা ওই এলাকার সার্বিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য খুবই উদ্যেগের কারণ হবে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক ভাবে পরিচিত থাইল্যান্ড, মিয়ানমার,কম্বোডিয়া, লাওস বর্ডারে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘স্ক্যাম ট্রায়াঙ্গেল’ বা স্ক্যাম সিটি যেখানে হাজার হাজার অধিবাসীদের আটকে এই বিজনেস পরিচালনা করা হয়। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) বিভিন্ন মূল্যায়ন অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংঘবদ্ধ অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো অনলাইন প্রতারণার মাধ্যমে বছরে আনুমানিক ২৭ বিলিয়ন থেকে ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের বর্ডার নিয়ে এমন একটি অপরাধ চক্র সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো যদি বিচ্ছিন্ন না হয়ে একই ধরনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ হয়, তাহলে বাংলাদেশকে শুধু অনলাইন প্রতারণার বাজার হিসেবে নয়, সম্ভাব্য অপারেশনাল বেস হিসেবেও দেখা দরকার।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে একাধিক অভিযানে বড় সংখ্যক সিম, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ভিওআইপি ডিভাইস ও অন্যান্য প্রযুক্তি জব্দ করেছে। সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে চট্টগ্রামে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিয়ে পরিচালিত কথিত অনলাইন স্ক্যাম ও জুয়ার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানোর কথা জানা যায়। এগুলো বাংলাদেশের জন্য শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি আর্থিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির বিষয়ও। শুধু বিদেশিদের গ্রেপ্তার করলেই সমাধান হবে না এই ধরনের অপরাধ দমনে বিদেশি নাগরিকদের গ্রেপ্তার গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই শেষ সমাধান নয়। প্রশ্ন করতে হবে—তারা কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করল? কীভাবে বাসা বা হোটেল ভাড়া করল? এত বিপুল সিম কীভাবে সংগ্রহ করল? স্থানীয়ভাবে কারা তাদের সহযোগিতা করেছে? অর্থ কোন চ্যানেলে স্থানান্তরিত হয়েছে? কোন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা অন্য মাধ্যমে অর্থ দেশের বাইরে গেছে? অর্থাৎ, অপরাধীকে ধরার পাশাপাশি পুরো অবকাঠামোটি শনাক্ত করতে হবে।
অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে লড়াই কেবল কয়েকজন প্রতারককে গ্রেপ্তারের লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার লড়াই।
লেখক:
আজিম ভূঁইয়া,
আইটি ইঞ্জিনিয়ার ও এক্টিভিস্ট ফাউন্ডার ও সিইও,
নেপচুন ইনফরমেশন টেকনোলজি বাংলাদেশ
