টিভি বিজ্ঞাপন, চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান

  মাসুদ আনসারী ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

টিভি বিজ্ঞাপন
দীর্ঘক্ষণ বিজ্ঞাপন চলতে থাকায় টিভি বিজ্ঞাপনে দর্শক চরম পর্যায়ে অতিষ্ঠ

আমাদের দেশে টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন বিরতিটা বিরক্তির কারণ হিসেবেই আসে দর্শকদের সামনে। এটি দর্শকদের খুব পুরনো অভিযোগ। তারা বিজ্ঞাপন বিরতির নামে দীর্ঘক্ষণ বিজ্ঞাপন চলতে থাকার ওপর চরম পর্যায়ে অতিষ্ঠ।

তাদের মতে, আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোতে নাটক- অনুষ্ঠান দেখায় না, দেখায় বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের মাঝে কিছু নাটক- প্রোগ্রাম দেখায় আরকি।

মূলত দর্শকরা এই বিজ্ঞাপন থেকে বাঁচতে মূলত কি করে? অন্য চ্যানেল পরিবর্তন করে নিশ্চয়ই। অন্য চ্যানেলে মনোযোগ দেয়, ফলে পুরনো চ্যানেলে দেখা বিষয়টার খেই হারিয়ে ফেলে অনেক সময়। তারা যে কোনো একটা চ্যানেলের অনুষ্ঠান কিংবা নাটক পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে দেখতে পারে না।

দেশে শুধুমাত্র দু-চারটা চ্যানেল না এখন, বাংলা ট্রিবিউনের ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে করা একটা রিপোর্টে সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে বর্তমানে দেশে অনুমোদিত বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সংখ্যা ৪৪টি। এই চ্যানেলগুলো ভালো কাজ করছে না, এমন না কিন্তু। ভালো কাজ করছে। তবে দর্শকরা সেগুলোতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না বিজ্ঞাপনের জ্বালায়। তারা খুব বিরক্ত হয়।

একটা চ্যানেলে বিজ্ঞাপন আসলে, আরেকটা চ্যানেলে চলে যায় দর্শকরা। ওটাতে বিজ্ঞাপন দেখালে আরেকটাতে যায়, ওটাতে যদি ভালো কিছু দেখায় তখন সেটিই দেখে। বা এই চ্যানেলে দেখানো বিষয়টা ভালো না লাগলে অন্য চ্যানেলে যায়। এইভাবে চ্যানেল পরিবর্তন খুব ভালোই হয় আমাদের দেশে! রিমোট নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মারামারি হয়, এটাকে মারামারি না বলে খুনসুটি বললেই ভালো দেখায়। শুনতে ভালো লাগে।

চ্যানেলগুলোর কাজের কোয়ালিটিও এখানে খুব গুরত্বপূর্ণ। যাই কাজ হচ্ছে কোয়ালিটি কাজের খুব অভাব। বৈচিত্র্য নেই। আহামরি কিছু নেই। দর্শক ধরে রাখার শক্তি নেই কাজে। ভালো কাজ হচ্ছে খুব কম। যেহেতু আমাদের দেশের ডিশ সংযোগে বাইরের দেশের চ্যানেলগুলো চলছে, সুতরাং দেশীয় চ্যানেলে ভালো কাজ দেখতে না পারলে তারা বিদেশি চ্যানেলগুলোতে ভিড় করবে এটাই স্বাভাবিক।

দেশীয় চ্যানেলের তুলনায় বিদেশি চ্যানেলই আমাদের দেশের মানুষ বেশি দেখে, এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। দেশের দর্শকদের আনন্দ দিতে চ্যানেলগুলোকে বিশ্বমানের কাজ করতে হবে। বিদেশি চ্যানেলগুলোর কাজের কোয়ালিটি ছোঁয়ার চেষ্টা থাকতে হবে। যাতে বিজ্ঞাপন বিরতি দর্শকের বিরক্তির কারণ না হতে পারে এমন কোয়ালিটির কাজ করতে হবে। দর্শকের যাতে শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য চ্যানেল পাল্টানোর ইচ্ছা না জাগে। অন্যদের প্রোগ্রামের কনসেপ্ট কপি না করে নিজেদের হাউস থেকে আইডিয়া বের করে কাজ করা দরকার। এতে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় সৃষ্টি হবে, দর্শক বাড়বে।

আমাদের দেশে নিউজ চ্যানেলই সংখ্যাগরিষ্ঠ, বলতে গেলে মোটামুটি সবগুলোই নিউজ চ্যানেল। আমাদের দেশের মানুষ প্রচুর খবর দেখে, সচেতন থাকতে চায়, দেশকে নিয়ে তাদের মাথাব্যথা আছে; দেশে এত এত নিউজ চ্যানেল থাকাটা এটাই প্রমাণ করে। প্রতি ঘণ্টায় ৪০-৪৫ মিনিটের সংবাদে প্রায় তিন, চার কখনো পাঁচবার বিজ্ঞাপন দেখায়। ফলে দর্শকরা নিউজ দেখতেও অন্য চ্যানেলে চলে যায়। যে চ্যানেলে নিউজ চলছে দর্শকরা তাতে মনোযোগ দেয়।

চ্যানেল কর্তৃপক্ষের কিছু করার থাকে না। তাদের বিশাল অঙ্কের খরচ মিটিয়ে সেখান থেকে তাদের লভ্যাংশও বের করে আনতে হয়। লাভ না হলে কোনো গ্রুপ কিংবা বিজনেস প্রতিষ্ঠান টেলিভিশন চ্যানেল চালাবে না। সুতরাং একটা টেলিভিশন চ্যানেলের মৌলিক আয়টাই আসে বিজ্ঞাপন থেকে। সুতরাং ঢালাওভাবে তাদের দোষও দেয়া যায় না।

মূলত আমার পয়েন্ট এখানে না। আমার পয়েন্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত এত এত ব্র্যান্ড, কোম্পানি যে বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে চ্যানেলগুলোতে তাদের প্রচার-প্রসার কি সঠিকভাবে হচ্ছে এখন? টার্গেট সংখ্যক দর্শকদের বিজ্ঞাপনগুলো কি দেখাতে পারছে? অনলাইনের এই যুগে আগের মতো কি রেসপন্স পাওয়া সম্ভব? এই বিজ্ঞাপনের বাজারটা আসলে ছোট হয়ে যাচ্ছে না তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে? শুধুমাত্র টিভি বিজ্ঞাপনের ওপর আসক্তি ব্র্যান্ডগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়?

দেশে বেসরকারি ৪৪টি চ্যানেল, এখন আরও বাড়তেও পারে। সঠিক সংখ্যা আমার জানা নেই। এতো চ্যানেল থাকায় বিজ্ঞাপন দেখানো শুরু করলে অন্য চ্যানেলে দর্শক চলে যেতে পারে; সুতরাং টিভিসির বেলায় এখন আরেকটু যত্নশীল হতে হবে বিজ্ঞাপনদাতাদের। দু-একটা চ্যানেলে শুধু বিজ্ঞাপন দিলে চলবে না, কারণ দু-একটা চ্যানেলে আপনি বিজ্ঞাপন দেখাতে চাইলে পুরো দেশ, দর্শক তথা আপনার গ্রাহকদের এই বিজ্ঞাপন রিচ করাতে পারবেন না। টিভিসি দিলে বিগ বাজেট নিয়েই আসতে হবে এবং মোটামুটি দেশীয় টপ সবকয়টা চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেখাতে হবে। তাহলে দর্শক যে চ্যানেলই পাল্টাক না কেন, তাদের এই বিজ্ঞাপন দেখতেই হবে। অনেকটা বাধ্য করার মতো। বাধ্য করবেন দেখতে। তবে এতে অনেক বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন। অনেক কোম্পানি, প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মার্কেটিংয়ে এত টাকা বিনিয়োগ করা সম্ভবও হয় না।

দর্শকদের এটাও একটা অভিযোগ আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোতে ভালো কাজ হচ্ছে না বিধায় তারা বিদেশি চ্যানেলগুলো দেখতে বাধ্য হচ্ছে। সুতরাং আপনার বিজ্ঞাপন আসলেই দেশের দর্শকরা অর্থাৎ আপনাদের প্রডাক্টের কনজিউমাররা কি বিজ্ঞাপনগুলো দেখতে পাচ্ছে, এটা নিয়ে ভাবার সময় এসে গেছে। নাকি তারা বিদেশি চ্যানেল দেখতে দেখতে বিদেশি প্রডাক্ট বা সেবার ওপর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে!

দর্শকদের বিজ্ঞাপন দেখতে বাধ্য করার আরেকটা স্ট্রাটেজি হচ্ছে গল্পনির্ভর বিজ্ঞাপন তৈরি করা। যেটা সবারই দেখতে ভালো লাগবে। ভেতরে অদ্ভুত আনন্দময় একটা শীতল স্রোত বয়ে যাবে। বারবার দেখলেও বিরক্ত আসবে না। আশার কথা আমাদের দেশে গল্পনির্ভর বিজ্ঞাপন নির্মাণের জোয়ার এসেছে। এখন প্রায়ই কাজ হচ্ছে গল্পনির্ভর। যেটা আগের বিজ্ঞাপনগুলোতে দেখতে পারতাম না আমরা। আমাদের দেশের বিজ্ঞাপন বাজারটাও এখন অনেক বড় হচ্ছে, আমার কাছে অন্যান্য দেশের বিজ্ঞাপনের তুলনায় আমাদের দেশের বিজ্ঞাপনগুলো অনেক বেশি ভালো লাগে। স্বস্তি দেয়, আনন্দ দেয়। ভাবতে শেখায়। গর্বও করে অনেক সময়, যখন আমাদের দেশীয় নির্মিত বিজ্ঞাপনগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা হয়, স্বীকৃতি আসে! দেশে বর্তমানে বিজ্ঞাপনের ক্রিয়েটিভির, গল্প বলার শক্তি অনেক জোরালো। সুতরাং গল্পনির্ভর বিজ্ঞাপন তৈরি হতে পারে বিজ্ঞাপন বিরতির বিরক্তি থেকে বাঁচার অন্যতম উপায়।

আমি জানতে পেরেছি ডিশ সংযোগ ব্যবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন আনছে প্রোভাইডাররা। আরও আধুনিক করা হচ্ছে। আরও অনেক বেশি বিদেশি চ্যানেল যোগ হবে এই ডিজিটাল পদ্ধতিতে। মূলত ডিশ সংযোগ রিচার্জ কার্ড সিস্টেমের মতোই থাকবে, এক মাসের জন্য কার্ড রিচার্জ করে নিতে হবে নির্ধারিত টাকায়। এবং এই কার্ড নির্দিষ্ট ডিভাইসে লাগালে চ্যানেল দেখার অনুমতি পাবে।

যেহেতু এই সংযোগে আরও বিদেশি চ্যানেল যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেহেতু বিজ্ঞাপনদাতাদের সতর্ক হতে হবে এখন থেকেই। এ ছাড়া এই সিস্টেম দর্শকরা গ্রহণ করবে কিনা সেটাও একটা বিষয়। কারণ ইন্টারনেট নির্ভশীলতা বাড়ার কারণে মানুষ এখন সব ইন্টারনেটেই পাচ্ছে। বহুমুখী বিনোদনমাধ্যম রয়েছে। এখানে নেই বিজ্ঞাপন বিরতির মাত্রাতিরিক্ত জ্বালাও। মফস্বল শহরের দিকেও ছড়িয়ে যাচ্ছে ব্রডব্যান্ড সংযোগ। তাই নতুন করে মানুষ এই ডিভাইসে আমার মতে খুব বেশি আগ্রহী হবে না।

খেয়াল করে দেখবেন এখন অনেক আধুনিক পরিবারেই টেলিভিশন নেই, সবার হাতে স্মার্টফোন আছে। যেমন আমার বাসায়ও টেলিভিশন নেই, পরিবারের সব সদস্যদের আলাদা স্মার্টফোন আছে। বাসায় ওয়াইফাই কানেকশন আছে। বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্যও আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে এইখানে গ্রাহকপর্যায়ে তাদের প্রডাক্টের কমিউনিকেশন করাটা।

আমার কাছে টিভিসির একটি শক্তিশালী সুবিধা এটাকে মনে হয় আমাদের দেশের মানুষরা টিভিতে যে ব্র্যান্ড কিংবা কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখে তাদের প্রোডাক্ট, সেবা বেশি ক্রয় করে। তাদের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়। দুর্বলতা বাড়ে। আস্থা অর্জন করে সহজেই। কারণ কনজিউমারের আস্থার অর্জনের জায়গা টিভিসি এখনো ধরে রেখেছে। মানুষ সত্যিই এটি মনে করে যে, টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে তারমানে এটি কোনো দুই নম্বরি কোনো ব্র্যান্ড- কোম্পানি হবে না!

শুধুমাত্র টিভিসির ওপর আসক্তিটা কমিয়ে আনতে হবে। অনলাইনে মনোযোগ দিতে হবে। ওভিসিকে টিভিসির তুলনায় সমান গুরত্ব দিতে হবে। বরং এখন আমি ওভিসিকে টিভিসির তুলনায় বেশি গুরত্ব দিতে বলব। যারা শুধুমাত্র টিভিসি নির্ভর কমিউনিকেশন করতে চান তারা অন্তত এই নিয়ম থেকে বেরিয়ে আসুন। না হয় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাটা খুব চ্যালেঞ্জিং হবে সামনে।

টিভি বিজ্ঞাপনের তুলনায় অনলাইন বিজ্ঞাপনে সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। অনলাইন জগতে নিবন্ধিত লোকের সংখ্যা শুধু বাড়ছেই, কমছে না। এই বাড়ার প্রক্রিয়া কখনো কমবে না, বাড়তেই থাকবে। যতো আধুনিক হবে বিশ্ব, তত লোক এই রঙিন জগতে ভিড় করবে। ২০১৭ সালের সরকারি হিসাবে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭ কোটি ছাড়িয়েছে। বিটিআরসির দেয়া তথ্যমতে দেশে মোট জনসংখ্যার ৪৪.৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে! অনলাইন বিজ্ঞাপনে আগ্রহী হওয়াটা কেন এত বেশি গুরত্বপূর্ণ শুধুমাত্র আপনাদের সামনে এই পরিসংখ্যান উপস্থাপন করলাম।

টার্গেট অডিয়েন্স-লোকেশন নির্ধারণ, কম বাজেট, দ্বিপক্ষীয় কমিউনিকেশন, ইনসাইট জানা যায় বলে এখন অনলাইন বিজ্ঞাপনের শক্তি অনেক বেশি। দাপট তুঙ্গে। কনজিউমারের মনোযোগ অতি সহজে অর্জন করা যায়, সঙ্গে তাদের ফিডব্যাকও পাওয়া যায়।

সুতরাং ব্র্যান্ড কিংবা কোম্পানি যাই বলি আপনারা অতিরিক্ত টিভিসি নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনুন। অনলাইনের সব প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দিন। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়াকে বেশি গুরত্ব দিতে শিখুন। ইন্টারনেট জগতে বিজ্ঞাপনের সব রকম টুলস ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়াতে পারলে আপনাদের মার্কেটিংয়ের কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনটা সহজতর হবে।

লেখক: মাসুদ আনসারী, ফ্রিল্যান্সার লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×