আহা অরুন্ধতী, হায় আজাদি

  কাকন রেজা ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ১৮:৪২ | অনলাইন সংস্করণ

আহা অরুন্ধতী, হায় আজাদি

‘সরকার একদিন বন্দীশিবিরে থাকবে, আমরা মুক্ত হবো: অরুন্ধতী’, গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম। ‘আহা, আমাদের আকাশে কোনো অরুন্ধতী নেই’, এমন আক্ষেপ হতে পারে সব মজলুমদেরই। নিপীড়িতদের পক্ষে ভয়েস রেইজ করা ফ্যাসিবাদে আক্রান্ত ভূখণ্ডে খুব কঠিন ব্যাপার।

অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস না থাকলে সাধারণত কেউ আওয়াজ করেন না। সুতরাং একজন অরুন্ধতী রায়ের আওয়াজটা অনেক বড় মানে রাখে। সমস্যার সমাধান যখন টেবিলে হয় না, তখন পথই সমাধান। যুগে যুগে তাই হয়েছে।

ভারতে জামিয়ার শিক্ষার্থীদের সমর্থনে পথে নেমে আসা অরুন্ধতী রায় সেই সমাধানের কথাই বলেছেন।

বলেছেন, ‘যদি আমরা সবাই একত্রিত থাকি, তাহলে কোনও বন্দীশিবিরই আমাদের বন্দী করে রাখার মতো যথেষ্ট বড় হবে না। কোনও এক সময় হয়তো এমন দিন আসবে, যখন এই সরকার নিজেই বন্দীশিবিরে বন্দি থাকবে, আর আমরা থাকবো আজাদ।’

আজ সারা ভারত জুড়ে সেই ‘আজাদি’র স্লোগান। শিকল ভাঙার স্লোগান। ‘এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল। এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।’- বলে গেছেন আমাদের নজরুল।

এই উপমহাদেশে তথা দক্ষিণ এশিয়ায় ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে যে আওয়াজ উঠেছে তার বড় দরকার ছিল। এই আওয়াজ মানুষের চোখ খুলে দেয়ার আওয়াজ। রাষ্ট্র যখন নির্যাতক হয়ে উঠে, তখন তার কাঠামোটাকে সংস্কারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

কাঠামো নতুন করে সাজাতে হয়। এক সময় হিটলার পূজিত হতেন জার্মানিতে, আজ তাকে ঘৃণা করে জার্মানদের সিংহ ভাগ। উগান্ডার ইদি-আমিনও তাই। ফ্যাসিবাদীদের চেহারা কেমন হয়। সেদিন পড়লাম, উত্তর কোরিয়ায় প্রেসিডেন্ট কিম ও তার পিতার ছবি না বাঁচিয়ে আগুন থেকে নিজ সন্তানকে বাঁচিয়ে ছিলেন এক মা।

সেই মাকে ওই দুই ছবি না বাঁচানোর দায়ে শাস্তি দিয়েছে আদালত। ঘরে আগুন লেগেছে মা সন্তানকে না বাঁচিয়ে কারো ছবি বাঁচাবে এমনটা কি সম্ভব মানবিক সমাজে, সভ্য জমানায় চিন্তা করা যায়! ফ্যাসিবাদীরা বরাবরই অমানবিক, অসভ্যেরও চূড়ান্ত।

উত্তর কোরিয়ায় আইন রয়েছে ছবি বিষয়ে। নেতাদের ছবি প্রতিটি বাড়ি-ঘরেই টানাতে হবে, তাও এমন জায়গায় যেখানে সবার দৃষ্টি যায়। নিজের ঘর অপরিষ্কার থাক আপত্তি নেই, ছবি থাকতে হবে সাফ-সুতরো। না হলে জেল-জরিমানা। ছবি যত অপরিষ্কার শাস্তি ততো বেশি।

ফ্যাসিবাদে মানুষের জন্য চিন্তা থাকে না, নিজের অস্তিত্বের চিন্তা থাকে। ফ্যাসিবাদীরা জানে, তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন। জোর করে বিপন্নতা দূর করার প্রয়াসে তারা ক্রমাগত মানুষ থেকে দানব হয়ে উঠে। আর এই দানব হয়ে উঠার প্রক্রিয়াই ফ্যাসিবাদ।

অনেকে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলেইমানির মৃত্যু নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, আমি বলিনি। কারণ কাসেমিও নিরীহ মানুষের প্রাণহরণকারী, এমনটা বলা হয়। ইসলাম নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করতে বলেনি, অথচ ইরান করেছে। আমেরিকাকে অনেকে যে কারণ ঘৃণা করেন, ইরানও তাই।

আমেরিকার পরিসর বড়, ক্ষমতা অনুযায়ী ইরান ছোট, পার্থক্য এটুকুই। যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে জানেন তাদের বিষয়টি অস্বীকার করার জো নেই। আল্লাহ-তায়ালা, কাফেরদের মধ্যে সত্যাশ্রয়ী নিরীহরা রয়েছেন বলেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলেননি, নিষেধ দিয়েছেন।

বলেছেন, কাফেরদের সঙ্গে থাকা সত্যাশ্রয়ীরা যদি মারা না যেতো তাহলে তিনি যুদ্ধের নির্দেশ দিতেন। সুতরাং নিরীহ মানুষ আছে জেনেও যুদ্ধ বা হত্যার নির্দেশ দেয়া ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যে কাজটা সৌদি আরব করেছে ইয়েমেনে।

বর্তমান পৃথিবীতে ধর্মের, বর্ণের কিংবা সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর নামে মূলত কোনো সংঘাত হয় না। এগুলো শুধু উছিলা। এ পৃথিবীতে সংঘাত হয় লোভের কারণে, আর সে লোভ অর্থ আর ক্ষমতার। কখনো উভয়েরই। আর এর জন্য পুঁজি করা হয় মানুষের আবেগকে।

মানুষের আবেগের সবচেয়ে বড় জায়গা হলো ধর্ম। মানুষকে ধর্মের দোহাই দিয়ে সহজেই উত্তেজিত করা যায়। অথচ আল্লাহ-তায়ালা স্বয়ং, সত্যত্যাগীদের সমালোচনাকে উপেক্ষা করতে বলেছেন, ধৈর্ষ ধরতে বলেছেন। বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া যুদ্ধের নির্দেশ আল্লাহ-তায়ালা দেননি। আর সে সব ক্ষেত্রে যুদ্ধের বিকল্পও ছিল না।

ধর্ম নিয়ে দেশে দেশে যে অপকান্ড হয় তা মূলত ধর্মের জন্য নয়। ভয় দেখিয়ে, মানুষ ঠেঙিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং তাকে পোক্ত করার জন্য। ভারতেও হয়তো তেমনটাই ঘটছে। ফ্যাসিবাদ আক্রান্ত শাসকরা জানে, মানুষ যদি একবার ভয় পেয়ে যায়, তাহলে তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগে।

লিবিয়ায় লেগেছিল চল্লিশ বছর। ফ্যাসিবাদীরা সেই ধারণাতেই প্রতিপক্ষকে নিষ্ঠুর ভাবে দমন করে। তবে এক সময় না এক সময় নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেই। হয়তো ভারতের মতন একটা ‘আজাদ’ দেশে তেমনি করেই ‘আজাদি’র স্লোগান উঠেছে। এই ‘আজাদি’ ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে, এই ‘আজাদি’ ফ্যাসিজম সৃষ্ট ‘ডর’ বা ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে।

‘আজাদি’র এই স্লোগান ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি নিপীড়িত ভূখণ্ডে। মজলুমরা জেগে উঠুক। ভয়ের সংস্কৃতির ‘ডর’কে মাড়িয়ে আজাদ হোক তারা। সেই ‘আজাদি’ কামনায় ভারতে উঠা ‘আজাদি’র ভাষাতেই বলি, ‘আজাদি জিন্দাবাদ।’

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×