মোস্তাফা জব্বারের সামনে ৩ চ্যালেঞ্জ

  ফাহিম মাসরুর ০৪ জানুয়ারি ২০১৮, ১৮:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

মোস্তাফা জাব্বার
মোস্তাফা জাব্বার

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে পরিচিত মুখ মোস্তাফা জব্বার ভাইকে সরকারের শেষ বছরে মন্ত্রী করা আসলেই একটি বড় ঘটনা। জব্বার ভাই রাজনীতিবিদ না। তবে বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণে তার নিজস্ব পক্ষ বা অবস্থানের ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট স্পষ্ট। কিন্তু আমরা সবাই যা জানি বা বুঝতে পারি তা হচ্ছে তাকে মন্ত্রী করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে তার ভূমিকার জন্য এবং হয়তো বর্তমান সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ভিশনে শেষ বছরে আরো গতি আনার জন্য।

অতীতে আমরা অনেক 'টেকনোক্রেট' (মেইনস্ট্রিম রাজনীতিবিদ বা এমপি নয়) মন্ত্রী দেখেছি। কিন্তু জব্বার ভাইয়ের প্রেক্ষিত এক্ষেত্রে আলাদা। তিনি আমলা বা শিক্ষক হিসাবে পরিচিতি অর্জন করেননি। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন 'একটিভিস্ট' (সামাজিক আন্দোলনকর্মী)। তথ্য প্রযুক্তি নিয়েই তার 'এক্টিভিজম'। বিভিন্ন বিষয়ে তার বক্তব্য বা অবস্থান নিয়ে যে ছোটোখাটো বিতর্ক নেই তা নয়। যেকোনো 'একটিভিস্ট'-এর ক্ষেত্রে সেটা থাকাই স্বাভাবিক।

কিন্তু ব্যাপারটা তখনই 'ইন্টারেস্টিং' হয় যখন একজন 'একটিভিস্ট' সরকারের একটি নির্বাহী পর্যায়ে অবস্থান নেয়। সাধারণ একজন রাজনৈতিক মন্ত্রীর জবাবদিহিতা তার নেতার কাছে, তার ভোটারদের কাছে, কিন্তু একজন 'একটিভিস্ট' এর জবাবদিহিতা তার নিজের কাছে। যে সকল 'দাবি'তে তিনি এতদিন আন্দোলন করেছেন, সেই 'দাবি' গুলোর কাছে।

তো সেই 'দাবি' বা 'এজেন্ডা' গুলো কি যা 'একটিভিস্ট' মোস্তাফা জব্বার গত দুই দশকে করেছেন এবং দেশের সব বয়স, সব পেশার আর সব শ্রেণীর মানুষ তার সমর্থন দিয়েছেন? অনেকেই হয়তো জানেন, তারপরেও ৩টি প্রধান দাবির কথা বলা যায় যা মোস্তাফা জব্বারের পরিচিতির সাথে জড়িয়ে আছে-

এক. কম খরচে ইন্টারনেট ব্রডব্যান্ডকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া গত কয়েক বছর এই ইস্যু নিয়ে মোস্তাফা জব্বার ভাই সবচেয়ে বেশি মুখর ছিলেন। মোবাইল টেলিকম কোম্পানিগুলো শহরভিত্তিক থ্রিজির নামে যে ভাওতাবাজি করছে, কম দামে ব্রডব্যান্ড 'স্পিড' কিনে 'ডাটা' হিসাবে অস্বাভাবিক দামে বিক্রি করছে; সেই সচেতনতা জব্বার ভাই গড়ে তুলেছেন। এছাড়াও সারা দেশের গ্রামে গঞ্জে ইন্টারনেটের যে করুণ অবস্থা, প্রতি নিয়ত তিনিই তা তুলে ধরেছেন। ব্রডব্যান্ডকে (ডাটা নয়, স্পিড) মৌলিক অধিকার হিসাবে ঘোষণা করাও তার দাবি।

দুই. দেশীয় সফটওয়্যার বাজারকে বিদেশী কোম্পানিগুলোর রাহুমুক্ত করা বেসিসের সভাপতি হিসাবে এটি ছিল তার একটি প্রধান দাবি। একদিকে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ভিশন বাস্তবায়নে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার সফটওয়্যার বাজার তৈরী হয়েছে, কিন্তু অন্যদিকে কাজের অভাবে অনেক দেশীয় আর তরুণ উদ্যোক্তারা কোম্পানি বন্ধ করে দিচ্ছে, কেননা বাজার দখল করছে বিদেশী কোম্পানিগুলো! এছাড়া বিদেশী টেলিকম কোম্পানিগুলোও আইন ভঙ্গ করে বিভিন্ন ডিজিটাল সার্ভিস (ভ্যাস, ই-কমার্স, মিডিয়া ইত্যাদি) ব্যবসা দখল করছে। গত কয়েক বছর বেসিস এবং অন্য (বিসিএস, BAFCOM) প্ল্যাটফর্ম-এর মাধ্যমে মোস্তাফা জব্বার ভাই সরকারি বিভিন্ন ফোরামে এই বিষয়ে সরকারের জরুরি পদক্ষেপের ব্যাপারে নিরন্তন চাপ সৃষ্টি করে চলেছেন।

তিন. ডিজিটাল মিডিয়ায় বাংলা কন্টেন্টের ব্যবহার বাড়ানো যে দেশের নব্বই শতাংশের বেশি মানুষ ইংরেজি পড়তে পারে না, সেই দেশে এখনো বেশির ভাগ ডিজিটাল কনটেন্ট বা সার্ভিস 'ইংরেজি' মাধ্যমে! দেশে সর্বস্তরে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে সবচেয়ে বড় বাধা হিসাবে এটিকেই মনে করেন মোস্তাফা জব্বার। এই সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন পর্যায়ে সকল 'যোগাযোগ' ও 'ইন্টারফেসিং' বাংলা মাধ্যমে করার ব্যাপারে সব সময়েই সবচেয়ে সোচ্চার জব্বার ভাই।

সময় কম: সামনে পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ জব্বার ভাইয়ের হাতে এক বছরের বেশি সময় নেই। এটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে উনি যা চান তা সহজেই করতে পারবেন। সবচেয়ে বড় বাধা আসবে 'আমলাতন্ত্র' ও 'ভেস্টেড ইন্টারেস্ট' গ্রূপ থেকে। উদাহরণ হিসাবে বলতে গেলে ইন্টারনেটের দাম প্রান্তিক গ্রাহক পর্যায়ে কমানোর ব্যাপারে ২টি বড় প্রতিবন্ধকতা- টেলিকম কোম্পানিগুলো কোনোভাবেই চাইবে না 'ডাটা' হিসাবে ইন্টারনেট বিক্রি না করে 'স্পিড' হিসাবে বিক্রি করতে। তা হলে তাদের মুনাফা কমে যাবে নিশ্চিত ভাবে।

ঢাকার বাইরে ব্রডব্যান্ড না যাবার আরেক প্রধান কারণ হচ্ছে ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) মনোপলি। মাত্র ২টি এনটিটিএনকে মনোপলি লাইসেন্স দেওয়াতে সারা দেশে ডাটা ট্রান্সফার খরচ কমানো যাচ্ছে না। এই সকল সমস্যাই বিটিআরসির জানা, কিন্তু বরাবরের মতো তারা এক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করছে।

বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল সফটওয়্যার কোম্পানি বাংলাদেশ তাদের 'সেলস অফিস' (তাদের কোনো ডেভেলপমেন্ট সেন্টার বাংলাদেশে নেই; বাংলাদেশ তাদের কাছে শুধুই একটা বাজার) খুলে বসেছে। এদের নিয়মিত আনাগোনা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের করিডোরে বড় বড় আইটি প্রজেক্ট বাগানোর জন্য সরকারি কর্তাদের বিভিন্ন সুবিধা আর নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করছে। ইতিমধ্যেই কোটি কোটি ডলারের কন্ট্রাক্ট হয়ে গেছে, আরো কিছু হবার অপেক্ষায়!

অনেক 'ভেস্টেড ইন্টারেস্ট'কে মোকাবেলা করতে হবে 'মন্ত্রী' মোস্তাফা জব্বারকে ওনার 'গণ দাবি' আদায় করতে। নিশ্চয়ই কাজটা সহজ হবে না। একটিকে আমলাতন্ত্র, অন্যদিকে বড় বড় বিদেশী কোম্পানি দুই শক্তিকে সামাল দিয়েই মোস্তাফা জব্বার ভাইকে তার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার যুদ্ধে নামতে হবে। সময় কম, কাজটা অনেক কঠিন। তবে ইতিহাস সব সময় রচিত হয় অল্প সময়েই, কঠিন পরিস্থিতিতেই। সেই ইতিহাস তৈরীর আগাম অভিনন্দন জব্বার ভাইকে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

SELECT id,hl2,parent_cat_id,entry_time,tmp_photo FROM news WHERE ((spc_tags REGEXP '.*"people";s:[0-9]+:"মোস্তাফা জাব্বার".*')) AND id<>2994 ORDER BY id DESC LIMIT 0,5

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter