জীবনব্যাপী শিক্ষা, নলেজ ইকোনমি ও টেকসই সমাজ
Advertisement
মুহাম্মদ ওমর ফারুক
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৫, ০৭:৪৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘জ্ঞান অর্জন করো দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত’—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিস শুধু একটি ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং জীবনব্যাপী শিক্ষার ধারণার সঙ্গে যুগোপযোগী এক সর্বজনীন দিকনির্দেশনা। এটি নিজের সত্তা, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে প্রতিনিয়ত উন্নত স্তরে নিয়ে যাওয়ার বিরামহীন প্রচেষ্টাকে নির্দেশ করে।
আধুনিক পৃথিবী আজ তথ্য, প্রযুক্তি ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসরমান, যেখানে শিক্ষা আর একটি সময়সীমাবদ্ধ ও শ্রেণী কক্ষ নির্ভর প্রক্রিয়া নয়; এটি হয়ে উঠেছে জীবনব্যাপী এক চলমান যাত্রা। প্রাণের প্রবাহের সাথে জ্ঞানের প্রবাহ না থাকলে টেকসই ও উন্নত সমাজ বির্নিমাণ সম্ভব নয়।
জ্ঞানভিত্তিক সমাজের প্রেক্ষাপট
একবিংশ শতাব্দীতে যে জাতি যত বেশি তথ্য ও জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে, তারাই টেকসই উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’ বলতে বোঝায় এমন এক কাঠামো, যেখানে জ্ঞান উৎপাদন, বিতরণ ও প্রয়োগই নির্ধারণ করে অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির গতিপথ। এই সমাজে প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও উদ্ভাবনের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে শ্রমভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তে দক্ষতা ভিত্তিক কাঠামো গডে উঠে। চিন্তা, গবেষনা, পঠন-পাঠন এ সমাজের শুধু ভিত্তি নয় এটি লোকজ সংস্কৃতিতে পরিগণিত হয়ে শেকড়ের গভীরে সিঞ্চিত হয়।
এই ধারা গড়ে তোলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জীবনব্যাপী শিক্ষা’। ইউনেস্কোর ফাউর রিপোর্ট (১৯৭২) ও ডেলর্স রিপোর্ট (১৯৮৯) এই ধারার ভিত্তি স্থাপন করে। এখানে শিক্ষা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নয়—এটি আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাইরের সব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে অন্তর্ভুক্ত করে।
জীবনব্যাপী শিক্ষার স্তম্ভ
ডেলর্স রিপোর্ট অনুযায়ী জীবনব্যাপী শিক্ষার চারটি স্তম্ভ হলো: শিখতে শেখা, করতে শেখা, মানুষ হতে শেখা ও একসাথে বাস করতে শেখা। এই ভিত্তিগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম করে তোলে সভ্য, উন্নত ও মানবিক সমাজে রূপান্তর করে।
আন্তর্জাতিক অগ্রগতি ও লার্নিং সিটি মডেল
ইউনেস্কোর ইনস্টিটিউট ফর লাইফলং লার্লিং ২০১৩ সালে ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অফ লার্নিং সিটিস’ (জিএনএলসি) গঠন করে। বর্তমানে ৭৬টি দেশের ২০০টিরও বেশি শহর এই নেটওয়ার্কের সদস্য। তাদের লক্ষ্য—শেখাকে বিদ্যালয় থেকে বের করে কমিউনিটি, পরিবার ও কর্মজীবনের অঙ্গ করে তোলা।
সিঙ্গাপুরে চালু আছে ‘স্কিল ফিউচার’ কর্মসূচি, যেখানে নাগরিকরা জীবনব্যাপী নতুন নতুন দক্ষতা শেখার জন্য রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পান।
দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিটি শহরে কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার চালু করেছে। যার মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি নাগরিকের ২৪/৭ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।
জার্মানিতে রয়েছে গণ বিশ্ববিদ্যালয় (Volkshochschule) নামে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। যেখানে সব বয়সের মানুষেরা বাধাহীনভাবে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের সুযোগ পায়।
ফিনল্যান্ডে শিক্ষা একটি নাগরিক অধিকার এবং প্রতিটি শহরে রয়েছে ‘লার্নিং হাব’। যেখানে কর্মজীবী থেকে শুরু করে সবাই নিজেদের জ্ঞান পিপাসা নিবারণ করে।
এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে—জীবনব্যাপী শিক্ষাকে নীতিতে রূপ দিলে একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মানসম্পন্ন মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারে, যার মাধ্যমে শ্রমনির্ভর অর্থনীতি রূপ নেয় নলেজ ইকোনমিতে।
নলেজ ইকোনমি ও জীবনব্যাপী শিক্ষা: সম্পর্ক ও গুরুত্ব
নলেজ ইকোনমি বা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদ নয় বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনই প্রধান চালিকাশক্তি। এতে উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে কর্মীদের নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি আত্মস্থ করার ক্ষমতা, রিসার্চ ও ইনোভেশন সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর। এই ক্ষমতাগুলো গড়ে ওঠে তখনই, যখন নাগরিকদের আজীবন শেখার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ জীবনব্যাপী শিক্ষা নলেজ ইকোনমির অবকাঠামো।
একজন ব্যক্তি শুধু একবার শিক্ষা নিয়ে আজীবন পেশাগত বা সামাজিকভাবে কার্যকর থাকবেন—এই ধারণা আজ অচল। বরং নিয়মিত স্কিল আপডেট, প্রযুক্তি জ্ঞান ও অনুপ্রেরণা থাকা এখন প্রয়োজন। সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, ফিনল্যান্ডে এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এখনো গার্মেন্টস, কৃষি ও প্রবাসী আয়ের মতো শ্রমনির্ভর খাতের ওপর নির্ভরশীল—যা মূলত ট্র্যাডিশনাল ইকোনমির অংশ। এখানে উৎপাদন নির্ভর করে সস্তা শ্রম, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সীমিত দক্ষতায়। অন্যদিকে নলেজ ইকোনমি নির্ভর দেশ যেমন সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া বা ফিনল্যান্ড, তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গড়ে উঠেছে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, ও দক্ষ মানবসম্পদকে ঘিরে।
সিঙ্গাপুর এক সময় একটি বাণিজ্যিক বন্দরে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণাকেন্দ্র ও টেকনোলজি হাবের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। এদিকে বাংলাদেশ এখনো শিক্ষাকে উৎপাদনের সরাসরি শক্তি হিসেবে গণ্য করছে না, ফলে প্রযুক্তি-নির্ভর খাতে প্রবেশ, উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। গার্মেন্টস খাত আমাদের বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান দিলেও এটি চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা জেনারেটিভ ইনোভেশনভিত্তিক প্রতিযোগিতায় টিকতে সক্ষম নয়। অন্যদিকে নলেজ ইকোনমি শুধু চাকরি নয়, উদ্ভাবন, উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক বাজারে নেতৃত্বদানের সামর্থ্য তৈরি করে। অতএব, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে চায়, তবে কেবল ঐতিহ্যবাহী খাতে নয়—জ্ঞান, শিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষাকে অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে।
বাংলাদেশ: প্রেক্ষাপট ও ঘাটতি
বাংলাদেশে শিক্ষা এখনো বয়স ও শ্রেণিভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কোনো জাতীয় শিক্ষানীতি নেই, নেই জাতীয় জীববব্যাপী শিক্ষা আইন।
বহু এলাকায় কমিউনিটি লাইব্রেরি বা শেখার কেন্দ্রও অনুপস্থিত। বাজেটে গণশিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষার জন্য বরাদ্দ প্রায় শূন্যের কোঠায়।
বাংলাদেশকে একটি জ্ঞাননির্ভর রাষ্ট্রে রূপ দিতে হলে ‘স্কিল বেজড লাইফলং লার্লিং’ বাধ্যতামূলক। অন্যথায়, বিশাল জনগোষ্ঠী প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমবাজার ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।
করণীয় ও সুপারিশ
১. জীবনব্যাপী শিক্ষা আইন প্রণয়ন: জাতীয় সংসদে একটি ‘লাইফলং লার্লিং অ্যাক্ট’ পাশ করে আইনি কাঠামো গড়া।
২. জাতীয় জ্ঞান ও শিক্ষা কমিশন গঠন: ‘নলেজ অ্যান্ড লার্লিং কমিশন’ গঠন করে নীতিনির্ধারণ ও পরামর্শ দেওয়া।
৩. থানায় জ্ঞানকেন্দ্র স্থাপন: প্রতিটি থানায় আধুনিক জ্ঞানকেন্দ্র বা ‘কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার’ চালু করা।
৪. বাজেটে বরাদ্দ নিশ্চিত: শিক্ষা বাজেটের অন্তত ৫% গণশিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা।
৫. ডিজিটাল মাইক্রো-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম: মোবাইলভিত্তিক শিক্ষা অ্যাপ চালু করে সাধারণ মানুষকে শেখার সুযোগ দেওয়া।
৬. ‘লার্নিং সিটি’ উদ্যোগে অংশগ্রহণ: বাংলাদেশি শহরগুলোকে ইউনেস্কোর জিএসএলসি-তে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া।
৭. সচেতনতা বৃদ্ধি: ‘শেখা হবে সারাজীবন’ নামে জাতীয় পর্যায়ের প্রচারণা শুরু করা।
৮. প্রান্তিক ও কর্মজীবি মানুষের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা: শ্রমিকদের বিশেষভাবে গার্মেন্টস শ্রমিকাদের কারখানার ভিতরে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য লাইব্রেরী, লার্নিং সেন্টার ও রিডিং ক্লাব তৈরী করা যাতে তারা শিক্ষার মাধ্যমে নতুনভাবে রূপান্তরের সুযোগ পায়়। প্রান্তিক, বাস্তবাসী ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
উপসংহার
একটি টেকসই, ন্যায্য ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য শেখা, পুনঃশেখা ও নিরবচ্ছিন্ন শিখনের সুযোগ অপরিহার্য। জীবনব্যাপী শিক্ষা কেবল শিক্ষা ব্যবস্থা নয়; এটি একটি সংস্কৃতি, একটি জীবনদর্শন এবং উন্নয়নের ভিত্তি। শুধু মেশিনের উন্নতি নয় মননের উন্নতি অপরিহার্য।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি ‘স্মার্ট, উদ্ভাবননির্ভর ও জ্ঞানসমৃদ্ধ’ রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে এখনই প্রয়োজন জীবনব্যাপী শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রে আনা। এটি কেবল উন্নয়নের উপায় নয়—এটি ভবিষ্যতের জন্য আমাদের জাতীয় প্রস্তুতি।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, গ্লোবাল নলেজ ফাউন্ডেশন
