Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

অভ্যুত্থানের গল্প, স্ট্যাটাসের ঢেউ: ২৪-এর স্মৃতিকে ঘিরে বিতর্ক

ড. শামীম হামিদী

ড. শামীম হামিদী

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫, ০৯:৫০ পিএম

অভ্যুত্থানের গল্প, স্ট্যাটাসের ঢেউ: ২৪-এর স্মৃতিকে ঘিরে বিতর্ক

ফাইল ছবি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা। কেউ এটিকে নেতৃত্বহীন গণজাগরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কেউ এর মাধ্যমে বহুমুখী রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত প্রতিবাদ দেখতে পেয়েছেন, আবার অনেকে এটিকে বিকল্প রাজনীতির উত্থানের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করছেন। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, ওই দিনটি ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি এক সাহসী অস্বীকৃতি এবং তরুণদের আত্মত্যাগের একটি জীবন্ত দলিল।

কিন্তু প্রশ্ন ওঠেএই আত্মত্যাগের ইতিহাস কে লিখবে? কে বলবে, কে শুনবে? আর কাদের ভুলে যাবে? এই প্রশ্নগুলো আবার সামনে এসেছে, যখন সম্প্রতি আন্দোলনের অন্যতম একজন ফ্রন্টলাইনার সামাজিক মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যাটাস প্রকাশ করেন। তার সাহসিকতা, ত্যাগ ও প্রতিকূলতার মুখে সক্রিয় অবস্থান ইতোমধ্যেই সম্মানিত ও স্বীকৃত; এই ভূমিকা নিয়ে কারও সংশয় থাকার কথা নয়, এবং কোনো বিবেকবান ব্যক্তি তাতে প্রশ্ন তোলে না। বরং তার লেখার সূত্র ধরেই ইতিহাসের ভেতরে ও বাইরে থেকে অংশগ্রহণকারীদের স্বর ও অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ওই স্ট্যাটাসে তিনি অভ্যুত্থানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক, প্রস্তাবনা ও মতানৈক্যের বিবরণ তুলে ধরেন। এই লেখাটি নিছক কোনো ব্যক্তি অভিমত নয়; বরং একটি দীর্ঘ দিনের জমে থাকা বিতর্কের উৎসবিন্দু। এটি যেমন ইতিহাসের কিছু গোপন স্তর উন্মোচন করে, তেমনি নতুন প্রশ্ন তোলেকারা কাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, কারা নীরবে ইতিহাসে থাকছেন, আর কারা প্রচারের কোলাহলে চাপা পড়ে যাচ্ছেন?

তার স্ট্যাটাসের কমেন্ট বক্সে প্রতিক্রিয়াগুলো এককণ্ঠ ছিল না; বরং সেখানে ফুটে উঠেছে অংশগ্রহণের বহু কণ্ঠের দীর্ঘ অপেক্ষা, স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, এবং উপেক্ষিত হওয়ার ক্ষোভের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। কেউ বলছেনআপনারা শুধু আপনাদের বলয়ের নাম বলছেন, বাকিদের কোথাও নেই! কেউ বলছেনশিবির, ছাত্রদল, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রতিবাদী শিক্ষক, মাদ্রাসার ছাত্র কিংবা সাধারণ অভিভাবকদের কথা বলা হচ্ছে না কেন? কেউ আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেনযারা কোনো পোস্টারে ছিলেন না, কোনো প্রেস ব্রিফিংয়ের মঞ্চে দাঁড়াননি, কিন্তু রাস্তায় গুলি খেয়েছেন, তারাও ইতিহাসের দাবিদার।

এই প্রশ্নগুলো আজকের নয়। ইতিহাস নির্মাণে কে নায়ক আর কে প্রান্তিকসে বিতর্ক এ দেশে বহুকাল ধরে চলমান। মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাতেও আমরা দেখেছি, কিছু নাম বারবার উচ্চারিত হয়েছে, আর বহু নাম হারিয়ে গেছে পদচিহ্নহীন কর্দমাক্ত রাজপথে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানও সেই একই পুনরাবৃত্তির মুখোমুখি। এটি কোনো গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং জাতির জমাট প্রতিবাদ আর জাগরণের একটি সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যখন ইতিহাস রচনার প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন চোখে পড়েকে ছিলেন প্রেস ব্রিফিংয়ের টেবিলে, কে ছিলেন রাজনৈতিক যোগাযোগে, কে কার সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেনএসবের বিস্তর বিশ্লেষণ। নিঃসন্দেহে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাতেই কি ইতিহাসের পূর্ণতা আসে?

কোথায় সেই তরুণ, যিনি ক্যাম্পাস থেকে ফেসবুক লাইভ চালিয়েছিলেন? কোথায় সেই অভিভাবক, যিনি সন্তান হারানোর পরও রাস্তায় বেরিয়েছিলেন? কোথায় সেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যিনি কারফিউ ভেঙে প্রতিবাদের প্রথম মুখ হয়েছিলেন? কিংবা সেই মাদ্রাসার শিক্ষক, যিনি শহরের প্রবেশমুখে পুলিশি বলয়ের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, অথবা কোথায় সেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা যারা তাদের শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেনতাদের ইতিহাসে কীভাবে দেখা হচ্ছে?

আন্দোলনের প্রকৃত টার্নিং পয়েন্ট ছিল ১৮ থেকে ৩০ জুলাই। কারফিউ, গুলিবর্ষণ, ধরপাকড়সবকিছুর মাঝেও যেভাবে জনতার ঢল রাজপথে নেমে এসেছিল, তা ছিল একটি সংগঠিত চেতনার বহিঃপ্রকাশ, যেটি কোনো ‘শীর্ষ নেতৃত্ব’ ছাড়াই সম্ভব হয়েছিল। তখন অনেকেই ডিবির হেফাজতে ছিলেন, কেউ কেউ নজরদারিতে, আবার কেউ স্বেচ্ছায় নীরবতা বেছে নিয়েছিলেন। তবু আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে শহরতলিতে, ক্যাম্পাস থেকে গলির চায়ের দোকানে।

এই দৃশ্যপট সামনে রেখেই প্রশ্ন ওঠেইতিহাস কি কেবল কিছু নির্দিষ্ট মুখের গল্প হবে? যদি ‘ক্রেডিট’ কেবল একপক্ষ নিয়ে নেয়, তাহলে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তা শুধু রাজনৈতিক নয়তা সমাজের সামষ্টিক স্মৃতির মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করে। ইতিহাস তখন আর অন্বেষণের বিষয় থাকে না, হয়ে পড়ে একপাক্ষিক স্বার্থ হাসিলের নির্মাণের যন্ত্র।

এই জন্যেই ইতিহাসকে হতে হবে অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলকযেখানে নেতা থাকবেন, কিন্তু শুধু নেতা নয়; যেখানে উপস্থিত থাকবে সেইসব নাম, যাদের কেউ ডাকে না, কিন্তু যাদের পায়ের ধুলোতেই রাজপথ ধুলিমলিন হয়েছিল।

আমরা জানি, ইতিহাস নিরপেক্ষ হয় না। তবে ইতিহাস যেন অন্তত বহুস্বরের, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল হয়এটাই জরুরি। মিশেল ফুকো আমাদের দেখিয়েছেন, ইতিহাস কেবল অতীতের প্রতিবিম্ব নয়, বরং এটি ক্ষমতা ও জ্ঞানের এক অবিচ্ছেদ্য সমন্বয়। কে কথা বলবে, কে চুপ থাকবে, কে হবে মুখপাত্র, কে থাকবে ছায়ায়এই বাছাইয়ের পেছনে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করে, যা প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করা হলে ইতিহাস পক্ষপাতের শিকার হয়। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ইতিহাস রচনার প্রশ্ন ঘিরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেনআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নাম ও ভূমিকা কি যথাযথভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে? কারা সামনে থাকছেন, আর কারা আড়ালে পড়ে যাচ্ছেন? একটি বড় আন্দোলনের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু কণ্ঠ সামনে আসে, কিছু মুখ প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই প্রতীক গঠনের পেছনে যেন সত্যিকার অবদান ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়এমনটাই প্রত্যাশিত। নয়তো প্রশ্ন উঠবেইএই প্রতিনিধিত্ব কাদের? এটি ইতিহাস, না কেবল আত্মপ্রচারের এক নির্মাণ?

এই পর্যায়ে এসে আমরা আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করিআন্দোলনে যারা সামনে থেকে কাজ করেছেন, যারা নিঃশব্দে সংগঠনের ভিত গড়েছেন, যারা পথে ছিলেন কিন্তু আলোয় আসেননিতাদের স্মৃতি কতটা জায়গা পাচ্ছে চলমান ইতিহাস চর্চায়? অনেকেই বলছেন, প্রতিটি গণআন্দোলন এক সময় ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। তবে সেই ইতিহাস রচনার কাজটি যেন কেবল বিজয়গাথা নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমুখী চিত্রনির্মাণ হয়সেটিই কাম্য। ইতিহাস হোক এমন, যেখানে শুধু নেতৃত্বের নয়, বরং সাহস, ত্যাগ, ভুল ও সংশোধনের কণ্ঠগুলোও স্থান পায়।

আমাদের অতীতও দেখিয়েছেএকটি জাতীয় ঘটনার পর ইতিহাসকে কখনো কখনো একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় বাঁধা হয়, যার বাইরে থাকা বহু সত্য হারিয়ে যায়। এ অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ২০২৪-এর অভ্যুত্থানকে ইতিহাসে পরিণত করার কাজটি হোক আরও সংবেদনশীল, আরও ইনক্লুসিভ।

এই আন্দোলনের কৃতিত্ব কে পেল, কার নাম ইতিহাসে উঠল, কে থাকল প্রান্তরেএসব নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু সেই বিতর্ক যেন আমাদের মূল আকাঙ্ক্ষাকে আড়াল না করে দেয়। কারণ, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান কোনো গোষ্ঠীর ক্যারিয়ার নির্মাণের সোপান নয়এটি ছিল রাষ্ট্রের এক পুনর্চিন্তার আহ্বান, যেখানে নাগরিকের অধিকার, গণতন্ত্রের অন্তঃসার, এবং সাংবিধানিক স্বপ্নগুলো আবারও উচ্চারিত হয়েছিল।

সুতরাং আজ আমাদের জরুরি দায়িত্ব সেই আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রাখা। ইতিহাসের প্রতি দায় মানে কেবল অতীতকে রক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করা। বাংলাদেশ যেন আর কখনো কোনো স্বৈরতান্ত্রিক বলয়ের বন্দি না হয়, ফ্যাসিবাদের ছায়া যেন আর কখনো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গ্রাস না করেএই চেতনায় আমরা চাই একটি নাগরিক-ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র। ইতিহাস হোক কেবল ক্ষমতাসীনদের বয়ান নয়, হয়ে উঠুক জনগণের সংগ্রাম ও সম্ভাবনার দলিল।

লেখক: শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .