হাসপাতালে অসুস্থ বাবার কাছ থেকে দলিলে স্বাক্ষর মেয়ের, যা জানা গেল
Advertisement
ভাটারা (ঢাকা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪২ পিএম
দলিল নিয়ে হাসপাতালে আসার কারণ জানতে চাইছেন ভিডিও ধারণকারী নারী। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথোপকথন হয়।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অসুস্থ বৃদ্ধ বাবার কাছ থেকে জমিসংক্রান্ত দলিলে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে তারই এক মেয়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তবে পরবর্তী অনুসন্ধানে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং পালটা-পালটি অভিযোগের তথ্যও সামনে এসেছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, হাসপাতালের একটি বেডে শারীরিকভাবে দুর্বল অবস্থায় বসে আছেন এক বৃদ্ধ। এ সময় এক নারী তার সামনে একটি দলিল ধরে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তির দাবি, ওই নারী বৃদ্ধের মেয়ে।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, দলিল নিয়ে হাসপাতালে আসার কারণ জানতে চাইছেন ভিডিও ধারণকারী নারী। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথোপকথন হয়। একপর্যায়ে ওই নারীকে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যেতে বলতেও শোনা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, একজন অসুস্থ বৃদ্ধের শারীরিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা?
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওতে থাকা বৃদ্ধের নাম মো. রবিউল হোসেন। তিনি একসময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এমইএসে সিভিল প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার দুই ছেলে ও চার মেয়ে।
-6aa18e90b8dc6.jpg)
বড় ছেলে মো. সাখাওয়াত হোসেন (৪০) একসময় ব্যাংকার ছিলেন। ছোট ছেলে মো. তৌসিফ হোসেন সৌরভ (৩০) বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। চার মেয়ের মধ্যে ফরিদা আনজুমান হোসেন (৫৩) ও ফারজানা আনজুমান হোসেন (৪৯) কানাডায় এবং ফারহানা আনজুমান হোসেন (৪৭) অস্ট্রেলিয়ায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। মেঝ মেয়ে ডা. ফারিয়া আনজুমান হোসেন (৫১) বাংলাদেশে বসবাস করেন এবং বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের একজন চিকিৎসক।
পরিবারটির কুড়িলের জোয়ার সাহারার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তুলনামূলক পুরোনো ছয়তলা ভবনটির নিচতলায় কয়েকটি দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা দোতলায় বসবাস করেন। বাসায় গিয়ে কথা হয় রবিউল হোসেনের স্ত্রী খুরশীদা বেগমের সঙ্গে। ঘরের দেয়ালে পরিবারের পুরোনো কয়েকটি ছবি টাঙানো ছিল। এর মধ্যে চার বোন, দুই ভাই ও বাবা-মায়ের একটি পারিবারিক ছবিও দেখা যায়। ছিল ডা. ফারিয়ার সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বাবার সঙ্গে তোলা ছবিও।
ছবিগুলোর প্রসঙ্গ উঠতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন খুরশীদা বেগম। তিনি বলেন, কত সুখের সংসার ছিল আমাদের। সন্তানদের বড় করতে জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। সম্পদের কারণে সন্তানদের মধ্যে এমন দূরত্ব তৈরি হবে, কখনো ভাবিনি।
বৃদ্ধের বড় ছেলে সাখাওয়াত হোসেনের দাবি, গত ২ সেপ্টেম্বর তার মেঝ বোন বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তার ভাষ্য, বাড়িতে বাবার রক্তচাপ মাপার পর বোন তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলেন। এরপর তাকে কুড়িল থেকে মুগদা মেডিকেলে না নিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সাখাওয়াতের দাবি, তার মা সঙ্গে তাকে পাঠাতে চাইলেও বোন নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে একাই বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
সাখাওয়াত বলেন, পরে তার স্ত্রী হাসপাতালে গিয়ে দেখতে পান ওয়ার্ডের পর্দা ঘিরে বাবার কাছ থেকে একটি দলিলে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তখন তিনি মোবাইল ফোনে ঘটনাটি ধারণ করেন এবং স্বজনদের জানান। পরে সাখাওয়াত হাসপাতালে গেলে তার বোন গাড়িতে করে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে তিনি দাবি করেন। এ সময় দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয় এবং উভয়েই হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে যান। পরে একটি দলিল দুর্নীতি দমন কমিশনের এক কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
পারিবারিক বিরোধের সূত্রপাত হিসেবে সাখাওয়াত ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারির একটি ওসিয়তের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, ওই দিন তার বাবা সন্তানদের মধ্যে বিভিন্ন সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়ে ওসিয়ত করেন। পরিবারের মালিকানাধীন সম্পত্তির মধ্যে মিরপুরের সেনপাড়ায় একটি তিনতলা বাড়ি, পূর্বাচলে পাঁচ কাঠার একটি প্লট এবং কুড়িলের জোয়ার সাহারায় সাড়ে পাঁচ কাঠা জমির উপর নির্মিত ছয়তলা বাড়ি রয়েছে।
সাখাওয়াত জানান, মিরপুরের বাড়ি ও পূর্বাচলের প্লট চার বোনের নামে ওসিয়ত করা হয়। আর জোয়ার সাহারার বাড়িটি তিনি ও তার ছোট ভাইয়ের নামে হেবা (লিখে) করে দেওয়া হয়। তার দাবি, এরপর থেকেই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ শুরু হয় এবং হেবা দলিল বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অসুস্থ বাবার কাছে কয়েক দফা দলিলে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ কারণে পরিবারের পক্ষ থেকে বাবার কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
বাবার ওসিয়তের খবর পাওয়ার পর তারা হেবা দলিল বাতিলের উদ্যোগ নেন বলে অভিযোগ করেন সাখাওয়াত। তার দাবি, ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর প্রমোশনের কাগজে স্বাক্ষর করার কথা বলে বাবাকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার স্বাক্ষর নিয়ে হেবা দলিল বাতিলের জন্য গোপনে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মামলা করা হয়। এরপর তাদের বাসায় এসিল্যান্ড কার্যালয়ের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসেন।
সাখাওয়াত বলেন, এসিল্যান্ড কার্যালয়ের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসার পর তাদের সেখানে ডাকার কথা ছিল। কিন্তু তাদের কোনো ধরনের নোটিশ বা তথ্য না দিয়ে গত ২ সেপ্টেম্বর হেবা দলিল বাতিলের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। তার দাবি, ওই দিনই তার বোন অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে একটি দলিলে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এছাড়া চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি আদালতের মাধ্যমে তাদের কোনো কিছু না জানিয়ে গোপনে হেবা দলিল বাতিল করা হয়েছে বলেও দাবি করেন সাখাওয়াত।
সাখাওয়াতের অভিযোগ, সম্পত্তির মূল্য বিবেচনায় তার বোনেরা তুলনামূলক বেশি সম্পদ পেয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা অন্য সম্পত্তিতে কোনো ভাগ চাইনি। বাবা আমাদের এই বাড়িটি দিয়েছেন, যাতে ভাড়া থেকে অসুস্থ বাবা-মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে সংসার চালাতে পারি। আমরা শান্তিতে বাঁচতে চাই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গালিগালাজসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার মা জমিজমা সম্পর্কে তেমন কিছু বোঝেন না এবং পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বাবার সিদ্ধান্তকেই তিনি মেনে চলেছেন।
খুরশীদা বেগম বলেন, আমার ৬০ বছরের জীবনে এই প্রথম পুলিশ, সাংবাদিক এসব দেখতে হচ্ছে। সন্তানদের বড় করতে অনেক কষ্ট করেছি। সম্পদের কারণে ছেলে-মেয়েদের সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে—এটাই আমার সবচেয়ে বেশি কষ্টের।
অন্যদিকে এক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডা. ফারিয়া আনজুমান অভিযোগ করেন, তার ভাই জোর করে বাবার কাছ থেকে সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়েছেন। এমনকি সম্পত্তি লিখিয়ে নিতে গিয়ে বাবার গলায় ছুরি ধরা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
ডা. ফারিয়া আনজুমানের বক্তব্যের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে কয়েক দফা মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে তার বাসায় গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে দারোয়ানকে জানিয়ে দেওয়া হয়, যুগান্তরের কোনো সাংবাদিককে যেন ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া না হয়।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) পুনরায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে একজন ব্যক্তি ফোনটি ধরেন। তার কাছে ডা. ফারিয়া আনজুমানকে চাইলে তিনি বলেন, আপনারা আগে এ বিষয়ে না জানিয়ে নিউজ করেছেন কেন? আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিউজ করে এখন যোগাযোগ করছেন কেন? এরপর তিনি জানান, ডা. ফারিয়া এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চান না।


