Logo
Logo
×

Advertisement

রাজধানী

ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে ডাক্তার, দালাল চক্রে জিম্মি মিটফোর্ড

Icon

মো. মোস্তাকিম আহমেদ, পুরান ঢাকা

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৬ পিএম

ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে ডাক্তার, দালাল চক্রে জিম্মি মিটফোর্ড

Advertisement

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী দালালচক্র ও অবৈধ ক্লিনিক বাণিজ্য। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা নিজেদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টায় রোগীদের সেবা না দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে, হাসপাতাল চত্বরে সক্রিয় দালালচক্র দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসহায় রোগীদের ভুল বুঝিয়ে ও ভয় দেখিয়ে বাইরের অর্ধশতাধিক মানহীন ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে নামমাত্র চিকিৎসা ও প্রতারণার শিকার হয়ে আর্থিক ও শারীরিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা। শুধু দালাচক্র নই, নিয়মিত চুরির ঘটনাও ঘটছে হাসপাতালটিতে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মিটফোর্ড এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের ১৫ থেকে ২০০ গজের মধ্যে প্রায় ১৫-২০টি এবং কোতোয়ালি-চকবাজার এলাকায় অর্ধশতাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে মিটফোর্ড  হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের পাশে ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল, মেডিসান হেলথ কেয়ার, ডক্টরস ক্লিনিক; ২ নম্বর গেটের মুখে আল আরাফাত, বাঁধন, ম্যাক্স এইড, নিউ ঢাকা মডার্ন ও ঢাকা হাসপাতাল এবং ১ নম্বর গেট সংলগ্ন মুনলাইট, ইস্টার্ন ডায়াগনস্টিক ও মেডি লাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল অন্যতম। এসব ক্লিনিকের ভবনের  নিচে সারিবদ্ধ দোকান, কেমিক্যাল গোডাউন এবং ওপরেই চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যূনতম নির্দেশনা মানছে না এবং নেই ভৌত অবকাঠামোও। নেই পর্যাপ্ত ডিউটি ডাক্তার, ডিপ্লোমা নার্স, টেকনিশিয়ান কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা। মূলত সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে এনে ব্যবসা করাই এসব ক্লিনিকের মূল উদ্দেশ্য।

আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর প্রচারসামগ্রী ও চিকিৎসক তালিকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের চিকিৎসকদের নাম ব্যবহারের বিষয়টিও দেখা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরিচয় ব্যবহার করে রোগীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা হয়। এরপর দালালের মাধ্যমে রোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়। একাধিক রোগীর স্বজনের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আশপাশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়েছে।

সরেজমিনে বেলা ১টা ২০ মিনিটে মিটফোর্ড হাসপাতালের বর্হিবিভাগের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ তানভীরকে হাসপাতালের পাশের ‘ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে’ রোগী দেখতে দেখা যায়। অথচ ওই সময়ে তার সরকারি হাসপাতালে ডিউটিতে থাকার কথা ছিল।

একই সময়ে শিশু বিভাগের চিকিৎসক প্রদীপ মালাকার এবং মেডিসিন বিভাগের আরও তিন চিকিৎসককে ওই ক্লিনিকে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দালালে রোগী সংগ্রহ করার পর কল দিলেই চিকিৎসকেরা চা-শিঙারা খাওয়ার অজুহাতে ডিউটি ফেলে ক্লিনিকে ছোটেন। দালালরাও ওৎ পেতে বসে থাকে মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে ক্লিনিকে রোগী ভাগাতে।

সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসার আশায় এসে দালালচক্রের ফান্দে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন মুন্সিগঞ্জ থেকে আগত রোগী আব্দুল মজিদ (৭৫)। চিকিৎসার নামে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মিটফোর্ড হাসপাতালের বাইরে গড়ে ওঠা মেডিসান ক্লিনিকে। সেখানে অপ্রয়োজনীয় ও চড়া মূল্যের টেস্টের বোঝা চাপিয়ে এই অসহায় ব্যক্তিকে আর্থিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি দেউলিয়া করে ছেড়েছে চক্রটি।

​ভুক্তভোগী মজিদ জানান, পিত্তথলির পাথর ও তলপেটের ব্যথার নিয়ে কষ্ট করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে এসেছিলাম ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু বহির্বিভাগে টিকিটের লাইনে দাঁড়ানোর পর থেকেই একাধিক দালাল কম খরচে ও দ্রুত অভিজ্ঞ ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।

একপর্যায়ে না বুঝে তাদের কথায় বিশ্বাস করে হাসপাতালের বাইরে ক্লিনিকে যান মজিদ। ​সেখানে নেওয়া মাত্রই শুরু হয় নানা অজুহাতে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খেলা। মজিদের শারীরিক পরিস্থিতি বোঝার নামে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় প্যাথলজিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক টেস্ট দেওয়া হয়। নিজের জমানো শেষ সম্বল এবং সঙ্গে থাকা সামান্য টাকা পুরোটাই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন তিনি। কিন্তু এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অর্থ খরচের পরও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা। 

​সর্বস্ব হারিয়ে কান্নাভেজা চোখে মজিদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে ভাবছিলাম কম খরচে চিকিৎসা পামু। দালালরা আমারে ফুসলাইয়া বাইরে নিয়া গেল। যা টাকা-পয়সা আছিল সব টেস্টের নামে কাইড়া নিছে। এখন আমার কাছে বাড়ি ফেরার ভাড়াও নাই, চিকিৎসাও পাইলাম না।

​মিটফোর্ড এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন মজিদ মিয়ার মতো শত শত গ্রামীণ ও দরিদ্র রোগী এভাবে দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালের ভেতরের ভিড় ও চিকিৎসকদের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে চক্রটি রোগীদের বাইরে পাঠায়। সেখানে ক্লিনিকে অনৈতিক চুক্তি অনুযায়ী কমিশন পাওয়ার লোভে ভুয়া ও নিম্নমানের প্যাথলজি টেস্ট করিয়ে মোটা অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়।

​স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, হাসপাতালের প্রশাসনিক শিথিলতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক গলেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এসব চক্র। অবিলম্বে এই দালালচক্র ও লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে কড়া টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান না চালালে মজিদ মিয়ার মতো হাজারও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নিতে এসে নিঃস্ব হওয়ার মিছিল থামবে না।

ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এর নেতা ও নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অফিস সময়ে এভাবে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখা ১৯৮২ সালের দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিনেন্স-এর ৪ নম্বর ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন। চিকিৎসকদের এই অনিয়মের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়েও চিকিৎসা না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে সমগ্র দেশের ডাক্তারদের বদনাম হচ্ছে। অনতিবিলম্বে এসব অনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধের মাধ্যমে দালালচক্রকে কঠোর আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এ এইচ এম এ রুস্তম বলেন, ‘অফিস চলাকালীন কোনো চিকিৎসক বাইরের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হাসপাতালের চুরি ও দালালদের উপদ্রব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দালাল ও চুরি প্রতিরোধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে চোরেরা প্রায়ই স্বজন সেজে হাসপাতালের ভেতরে ঢোকে, ফলে আনসারদের শনাক্ত করতে কষ্ট হয়। তবুও নিয়মিত চোর ধরে পুলিশে সোপর্দ করা হচ্ছে। রোগী ও তাদের স্বজনদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।’

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে ডাক্তার, দালাল চক্রে জিম্মি মিটফোর্ড

ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে ডাক্তার, দালাল চক্রে জিম্মি মিটফোর্ড

‎যুবদলের বহিষ্কৃত নেতার গুলিবর্ষণ, গুরুতর আহত ১

‎যুবদলের বহিষ্কৃত নেতার গুলিবর্ষণ, গুরুতর আহত ১

ধর্মকে ব্যবসা হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্র চালানো যায় না: গয়েশ্বর

ধর্মকে ব্যবসা হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্র চালানো যায় না: গয়েশ্বর

অনুমোদিত স্থান ছাড়া হকার বসলেই মালামাল ক্রোক ও মামলা: ডিএসসিসি প্রশাসক

অনুমোদিত স্থান ছাড়া হকার বসলেই মালামাল ক্রোক ও মামলা: ডিএসসিসি প্রশাসক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম