মিয়ানমারে বন্দি রামগতির ৯ জেলের অপেক্ষায় দিশেহারা পরিবার
কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৮ এএম
নিখোঁজ জেলেদের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের রামগতির ৯ জন।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মায়ের দোয়া ট্রলারে করে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে গিয়ে নিখোঁজ হন ১৬ জেলে। তাদের উদ্ধার করতে পরিবারগুলতে চলছে বুকফাটা আর্তনাদ। নিখোঁজ জেলেদের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের রামগতির ৯ জন। তাদের সকলের বাড়ি রামগতি উপজেলার চর পোড়াগাছা ইউনিয়নের পোড়াগাছা গ্রামে। নিখোঁজদের মধ্যে নোয়াখালীর ৩ জন, চট্টগ্রামের ৩ জন এবং ভোলার ১ জন রয়েছেন।
এদিকে, নিখোঁজ হওয়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ‘মা-বাবার দোয়া’ ট্রলারের ১৬ জেলের কোনো হদিস নেই। পরিবারগুলোর মধ্যে চলছে চরম অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠা। শোক নয়, বরং প্রিয়জনের ফেরার প্রতীক্ষায় এক বুক হাহাকার আর দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটছে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের।
সরেজমিনে চরপোড়াগাছা এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কারো হাতে স্বামীর শেষ স্মৃতি হিসেবে থাকা গামছা, কেউবা কোলের শিশুকে নিয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সাগরের নীল জলরাশির দিকে। বৃদ্ধা মা ফাতেমা বেগম ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে বিলাপ করে বলছেন; বাবারে, শেষবার যখন কথা অইল, পোলায় কইল মা ওরা আমাগোরে ধইরা লইয়া যায়। এরপর থাইকা মোবাইল বন্ধ। ওগো নাকি খাইতে দেয় না, মারধর করে। আমার মানিকরে কি আর ফিরা পামু? সরকার কি পারে না আমার বাজানরে ফিরায়া আনত?
এই ৯টি পরিবারের অধিকাংশেরই আয়ের একমাত্র উৎস ছিলেন এই জেলেরা। গত কয়েকদিন ধরে অনেক ঘরে চুলা জ্বলে না, শিশুদের মুখে ঠিকমতো অন্ন জুটছে না। কিন্তু পেটের ক্ষুধার চেয়েও প্রিয়জনের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এখন সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে।
জানা গেছে, গত ২২ মার্চ লক্ষ্মীপুর থেকে সাগরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ১৬ জেলের এই দলটি গত ২৮ মার্চ শেষবারের মতো বাড়িতে কথা বলতে পেরেছিলেন। তখন তারা জানিয়েছিলেন, কক্সবাজারের উখিয়া সংলগ্ন বাংলাদেশ-মিয়ানমার জলসীমা থেকে মিয়ানমার কোস্টগার্ড তাদের আটক করে নিয়ে গেছে। সেখানে তারা চরম খাদ্য সংকট ও অমানবিক পরিস্থিতির শিকার। এরপর থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সব যোগাযোগ।
স্থানীয় সমাজকর্মী মো. নিজাম উদ্দিন জানান, দিনরাত পরিবারগুলোর পাশে থাকছেন এবং প্রশাসনিক মহলে যোগাযোগ রক্ষা করছেন।
তিনি বলেন, এটি কেবল আইনি বিষয় নয়, এটি ১৬টি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। আমরা চাই সরকারি পর্যায়ে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আমাদের ভাইদের ফিরিয়ে আনা হোক।
এদিকে ট্রলার মালিক পক্ষ ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদন জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের প্রতিটি মানুষ এখন একটাই প্রার্থনা করছেন, বাংলাদেশ সরকারের শক্তিশালী কূটনৈতিক পদক্ষেপে যেন দ্রুত মিয়ানমারের জিম্মি দশা থেকে জেলেদের ফিরিয়ে আনতে পারে। প্রিয়জনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় এমনটাই সপ্ন দেখছেন স্বজনরা।
এ বিষয়ে রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফার ইয়াসমিন নিপা বলেন, নিখোঁজ হওয়া ১৬ জন জেলের বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। বিশেষ করে রামগতির ৯ জন জেলের পরিবার আজ দিশেহারা, তাদের কষ্ট আমরা অনুধাবন করছি। এটি কেবল দাপ্তরিক দায়িত্ব নয়, আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতা। আমি ব্যক্তিগতভাবে সরকারের উচ্চপর্যায় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে যোগাযোগ করছি। কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য সংস্থাগুলোও তৎপর রয়েছে।
আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি জেলেরা যেন দ্রুত ও নিরাপদে তাদের প্রিয়জনদের বুকে ফিরে আসতে পারেন।

