হবিগঞ্জে গ্যাস সংকটে পৌনে ২০০ কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ
সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন ও রোকন উদ্দিন লস্কর, হবিগঞ্জ
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ২০ দিন ধরে সংকট থাকলেও সরবরাহ ছিল সামান্য। কিন্তু বুধবার থেকে পুরোপুরিই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়েছে জেলার পৌনে ২শ কোম্পানির। বেকার হয়ে পড়েছেন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক।
কারখানা বন্ধ থাকার কারণে প্রতিদিন কোম্পানিগুলোর ক্ষতি হচ্ছে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। যার অধিকাংশই রপ্তানি আয়। একের পর এক বাতিল হচ্ছে কোম্পানিগুলোর বৈদেশিক অর্ডার। দৈনিক খরচ চালানো নিয়ে এখন অনেক কোম্পানিই হিমশিম খাচ্ছে।
এদিকে গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ঠিক রাখতে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
এ বিষয়ে জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, গ্যাসের সংকট এটি জাতীয় সমস্যা। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ সমস্যা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর কারণেই মূলত এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ৩/৪ দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে তিনি জানান।
একটি শিল্পগোষ্ঠীর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) বলেন, আমাদের এখানে মোট ৬টি ফ্যাক্টরি রয়েছে। এর মধ্যে টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক, পাওয়ারপ্ল্যান্ট। এর মধ্যে টায়ার এবং পাওয়ারপ্ল্যান্ট ব্যতীত সবগুলোই শতভাগ রপ্তানিমুখী। শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী মিলিয়ে কর্মরত আছেন ১২ হাজার। সবাই এখন বেকার। সবগুলো ফ্যাক্টরি বন্ধ। এতে কোম্পানির দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
বাদশা পাইওনিয়রের মহাব্যবস্থাপক (এডমিন) মো. খায়রুল আলম বলেন, আমাদের দৈনিক ৩০ মেগাওয়াট গ্যাসের চাহিদা। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাস সরবরাহ কম ছিল। এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ পাওয়া যেত। বুধবার দুপুর থেকে গ্যাস সরবরাহ একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোম্পানির ১৬ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী অলস সময় কাটাচ্ছেন। এতে কোম্পানির দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে ৫ কোটি টাকা।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, তাদের কোম্পানিতে ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী রয়েছে। সবাই এখন বেকার। অলস সময় কাটাচ্ছেন। বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাসের সমস্যা হলেও বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সরবরাহ শূন্য শতাংশ। ফলে এখানে সবগুলো কারখানার উৎপাদন একেবারেই বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক কোম্পানি শতভাগ রপ্তানিমুখী। আর কিছু আছে আংশিক রপ্তানিমুখী। রপ্তানিমুখী কোম্পানিগুলোর প্রায় সবই ক্যাপটিভ পাওয়ারের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলছে। তারা পল্লী বিদ্যুৎ বা পিডিবির বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে না। এ জন্য তারা গ্যাস ব্যবহার করছেন। শুরু থেকে কখনও এমন গ্যাস সংকটে পড়তে হয়নি কোম্পানিগুলোকে। গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে হঠাৎই গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। শুরুতে কিছু কিছু সরবরাহ করা হলেও তা ছিল কোম্পানিগুলোর জন্য একেবারেই অপ্রতুল। কখনও এক-তৃতীয়াংশ, আবার কখনও এক-চতুর্থাংশ গ্যাস দেওয়া হতো।
এদিকে গত কয়েকদিনে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া বা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে একাধিক চিঠি দিয়েছে। কিন্তু কোনো চিঠিতেই কী কারণে গ্যাস কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা বন্ধ করা হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট করে কিছুই লেখা নেই। এতে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়েছেন কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রায় সবগুলো কোম্পানিরই উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বেকার হয়ে পড়েছেন এসব কোম্পানিতে কাজ করা প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। যদিও তাদের এখনও চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। তবে কর্ম না থাকায় তারা বেতনও পাবেন না—এমনটি জানিয়েছেন অনেক শ্রমিক। তাদেরকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। তাই প্রতিটি কোম্পানিতেই শুনশান নীরবতা বিরাজ করছে।
কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন বন্ধ থাকায় কোম্পানিগুলোর দৈনিক প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। মুখ ফিরিয়ে নিতে চলেছেন বিদেশি ক্রেতারা। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো ডেলিভারি দিতে পারছেন না তারা। তাই অধিকাংশ কোম্পানিরই ইতোমধ্যে বৈদেশিক অর্ডার বাতিল করা হয়েছে। নতুন অর্ডারও কেউ নিচ্ছেন না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম খাতটি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

