Logo
Logo
×
   

সারাদেশ

স্কুলে অনুপস্থিত চার বছর, বেতন তোলেন নিয়মিত

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন, মানিকগঞ্জ

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:০২ পিএম

স্কুলে অনুপস্থিত চার বছর, বেতন তোলেন নিয়মিত

মানিকগঞ্জ পৌরসভার অভ্যন্তরে কুশেরচর ইসমাইল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়। ছবি: যুগান্তর

চার বছর ধরে বিদ্যালয়ে নিয়মিত যান না। অনেক শিক্ষার্থী তাকে কখনো দেখেইনি। সহকর্মীদের কাছেও তার উপস্থিতি যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। অথচ নিয়মিত হচ্ছে হাজিরা। আর সেই হাজিরা খাতাও সপ্তাহে একদিন বিদ্যালয় থেকে চলে যায় তার বাড়িতে। সেখানে একদিনেই পুরো সপ্তাহের স্বাক্ষর করে আবার খাতা ফেরত দেওয়া হয় বিদ্যালয়ে। এভাবেই চলছে হাজিরা। আর সেই হাজিরার ভিত্তিতে সরকারি অংশের বেতন-ভাতাও উঠছে নিয়মিত। এরকম তুঘলকি ঘটনা ঘটছে মানিকগঞ্জ পৌরসভার অভ্যন্তরে কুশেরচর ইসমাইল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ে।   

মানিকগঞ্জের কুশেরচর ইসমাইল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনজুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তিনি সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক। শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিদ্যালয়ে যেতে পারেন না বলে দাবি করলেও, তার অনুপস্থিতির বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তার অনুপস্থিতিতে অন্য একজনকে দিয়ে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। বিনিময়ে ওই ‘প্রক্সি’ শিক্ষককে বিদ্যালয় থেকে মাসে সাড়ে ৩ হাজার টাকা দেওয়ার হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হাজিরা খাতা নিয়ে। বিদ্যালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার সকালে মনজুরুল ইসলামের ছোট মেয়ে বিদ্যালয়ে এসে তার বাবার হাজিরা খাতা বাড়িতে নিয়ে যান। পরে ওই খাতায় একদিনে পুরো সপ্তাহের স্বাক্ষর করিয়ে আবার বিদ্যালয়ে ফেরত দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকলেও হাজিরা খাতায় তার উপস্থিতি ঠিকই থেকে যাচ্ছে। বিধি ভেঙ্গে স্কুলের খাতায় চলে যায় তার বাড়িতে। 

সরেজমিন বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ে গিয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে তাদের বক্তব্যে উঠে আসে বিস্ময়কর তথ্য। নবম শ্রেণির মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী সঞ্চিতা মন্ডল জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে একই বিদ্যালয়ে পড়ছে। কিন্তু এ সময়ে মনজুরুল ইসলাম নামে কোনো শিক্ষককে সে কখনো দেখেনি। এমনকি শিক্ষকটি কেমন দেখতে, সেটিও তার জানা নেই। 

একই কথা জানায় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুনিয়া, এবং আয়মা আক্তার।  

দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মরিয়ম, মানবিক বিভাগের মুন্নি আক্তার, শামিমা আক্তার এবং মারুফা ইসলামও জানায়, বিগত বছরগুলোতে সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মনজুরুল ইসলামকে তারা একদিনের জন্যও বিদ্যালয়ে দেখেনি। 

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষকদের বক্তব্যেও উঠে আসে একই চিত্র। সিনিয়র শিক্ষক মো. রমজান আলীসহ কয়েকজন শিক্ষক মনজুরুল ইসলামের দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই শিক্ষক চার বছর ধরে গুরুতর অসুস্থ। শারীরিক অবস্থার কারণে তার পক্ষে হেঁটে বিদ্যালয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না। শারীরিকভাবে সক্ষমতা না থাকায় স্কুলে আসতে না পারা শিক্ষকের বাড়িতে স্কুলের শিক্ষকদের হাজিরা খাতা বাড়িতে পাঠিয়ে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগের বিষয়টি প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান নিজেও স্বীকার করেন। 

তিনি বলেন, বিষয়টি সঠিক হয়নি এবং আইনের বরখেলাপ হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ওই শিক্ষকের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।  

বাড়িতে গিয়ে মিলল অসুস্থতার প্রমাণ

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বৃহস্পতিবার মনজুরুল ইসলামের বাড়িতে যান প্রতিবেদক। সেখানে দেখা যায়, তিনি শারীরিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ। একা চলাফেরা করতে পারছেন না। অন্যের সহায়তা ছাড়া নিত্যদিনের কাজ করাও তার জন্য কঠিন। কথাবার্তাও স্পষ্টভাবে বলতে পারছিলেন না। 

তবে প্রথমে তিনি জানান, তিনি বিদ্যালয়ে যান, তবে নিয়মিত নয়। পরে কথার একপর্যায়ে শারীরিক অক্ষমতার বিষয়টি স্বীকার করেন।

মনজুরুল ইসলাম জানান, শারীরিক সমস্যার কারণে তার পক্ষে বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। এ কারণে তার ছোট মেয়েকে দিয়ে সপ্তাহে একদিন হাজিরা খাতা বাড়িতে আনানো হয়। তিনি সেই খাতায় পুরো সপ্তাহের স্বাক্ষর করে দেন।

 অর্থাৎ বিদ্যালয়ে তার শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও হাজিরা খাতায় উপস্থিতির স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি তার নিজের বক্তব্যেও উঠে এসেছে। কাগজে কলমে শিক্ষক ১২ জন, ১ জন আসেন না চার বছর।  

কুশেরচর ইসমাইল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত। প্রায় চার শত শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে কাগজে-কলমে প্রধান শিক্ষকসহ রয়েছেন ১২ জন শিক্ষক। এর মধ্যে মনজুরুল ইসলাম চার বছর বিদ্যালয়ে না থাকায় তার বিষয়ের ক্লাস পরিচালনার জন্য স্থানীয় জাহিদ হাসান নামে একজনকে দিয়ে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে বলে বিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে।   

প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান সোজা সাপটা স্বীকার করেন। মনজুরুল ইসলামের অনুপস্থিতিতে জাহিদ হাসানকে ‘প্রক্সি’ শিক্ষক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর বিনিময়ে বিদ্যালয় থেকে তাকে মাসে সাড়ে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কয়েক বছর আগে একটি রেজুলেশনের মাধ্যমে ওই প্রক্সি শিক্ষকের বিষয়টি অনুমোদন করা হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।  

প্রভাবশালী স্বজনের ছায়া

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয়ভাবে অত্যান্ত প্রভাবশালী অ্যাডভোকেট এটিএম সাজাহান। আর শিক্ষক মনজুরুল ইসলাম তারই ভাতিজা। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, এই পারিবারিক সম্পর্কের কারণেই শিক্ষক মনজুরুল ইসলাম বছরের পর বছর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও দিব্বি বাড়তি সুবিধা পেয়ে আসছেন। 

সূত্রের দাবি, বিদ্যালয়ে এ বিষয়ে কেউ যাতে মুখ না খোলেন, সে বিষয়ে শিক্ষকদের সতর্ক করা হয়েছে। প্রভাবশালী ওই ব্যক্তির কারণে প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকরা বিষয়টি নিয়ে অনেকটা নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছেন। স্কুলটিতে প্রতিষ্ঠাতা প্রভাবশালী অ্যাডভোকেট সাজাহানের আপন ভাতিজা বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, স্ত্রী মাহমুদা বেগম শিক্ষক, দুই ভাতিজাও শিক্ষক। অন্য কয়েকজনও আত্বীয়স্বজ্ন রয়েছে।  

এসব অভিযোগের বিষয়ে অ্যাডভোকেট এটিএম সাজাহান এই প্রতিবেদককে নিউজ না করতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, প্রধান শিক্ষক আপনার সাথে (এই প্রতিবেদক) দেখা করবে! নিউজটি না করলে ভালো হয়। 

বিদ্যালয়ের বর্তমান এডহক ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। বিষয়টি তার নজরে নেই।

তবে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডভোকেট এটিএম সাজাহানের সঙ্গে কথা বলে নেওয়ার অনুরোধ করেন। 

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা কমিটির সংশ্লিষ্টরা এবং শিক্ষকরা বিষয়টি জানলেও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে এতদিন তা অজানাই ছিল।  

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আমীর হোসেনকে অভিযোগের বিষয়ে জানানো হলে তিনি বলেন, যুগান্তরের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি প্রথম জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে আরো অনেক অনিয়মের চিত্র। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি শুধু একজন শিক্ষকের দীর্ঘ অনুপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বিদ্যালয়ের হাজিরা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক উপস্থিতি, বিকল্প শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনা, এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা, সবকিছুর প্রশ্ন জড়িত। বিষয়টি খতিয়ে দেখলে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক অনিয়ম বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।  

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .