স্কুলে পুষ্টির বদলে পচা খাবার!
কামাল হোসাইন, নেত্রকোনা
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১২ পিএম
জেলার কোথাও পচা ডিম, কলা ও বনরুটি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেত্রকোনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার বিতরণে অনিয়ম ও নিম্নমানের খাবার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জেলার দুর্গম হাওড়াঞ্চলসহ বিভিন্ন উপজেলার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ও নির্ধারিত পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। কোথাও পচা ডিম, কলা ও বনরুটি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী- স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের বিস্কুট, ডিম, কলা, দুধ, বনরুটিসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার কথা। তবে অভিভাবকদের অভিযোগ, নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী নিয়মিত সব খাবার বিতরণ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে বিস্কুট দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া হচ্ছে না। আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা খাবার নিম্নমানের হওয়ায় তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ না করেই বাদ দিতে হচ্ছে।
দুর্গম হাওরাঞ্চলের বানোয়ারি জুয়েল চৌধুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রানিচাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মেন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ১৫টি বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে নিম্নমানের খাবার বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব বিদ্যালয়ে পচা বনরুটি, পচা ডিম এবং আকারে ছোট ও পচা কলা সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত দিনে খাবার দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে খাবার গ্রহণের আগে এর গুণগত মান যাচাই করার দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকদের। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে সেই যাচাই হচ্ছে না। ফলে সরবরাহকারীরা নিম্নমানের খাবার বিদ্যালয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কোথাও কোথাও ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে মানহীন খাবার গ্রহণের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
নির্দেশনা অনুযায়ী- বনরুটি গ্রহণের আগে তা তাজা, নরম ও সঠিকভাবে মোড়কজাত করা হয়েছে কিনা, তা যাচাই করতে হবে। প্যাকেট অক্ষত থাকার পাশাপাশি এতে পচন, ফাঙ্গাস বা দুর্গন্ধ আছে কিনা, সেটিও দেখতে হবে। প্যাকেটে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ও ১২০ গ্রাম নেট ওজন উল্লেখ রয়েছে কিনা, তাও যাচাই করার কথা। এছাড়া ডিমে ফাটল, দুর্গন্ধ বা পিচ্ছিল ভাব থাকা যাবে না। কলা হতে হবে দাগ ও পোকামাকড়মুক্ত। বেশি পাকা বা পচা কলা বিতরণ করা নিষিদ্ধ। ইউএইচটি মিল্ক ও ফর্টিফাইড বিস্কুটের ক্ষেত্রেও প্যাকেট অক্ষত থাকা, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নেট ওজন যাচাই করার নির্দেশনা রয়েছে। তবে এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলার দুর্গম হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে খাবার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ বেশি। খালিয়াজুরী উপজেলার একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিস্কুট নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে না। অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বিতরণেও রয়েছে অনিয়ম। নিম্নমানের বা পচা খাবার দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা তা খেতে চায় না। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
মেন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক প্রিয়াংকা আক্তার ও রীতামনি আক্তার বলেন, রুটিগুলো খাবারযোগ্য নয়। ফাঙ্গাসে আক্রান্ত রুটি ফেলে দিতে হয়। কলা, ডিমও নষ্ট থাকে। দুধ মাঝে মাঝে দেওয়া হয়। এসব খাবার খেয়ে শিশুরা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়।
একই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিমাংশু সরকার বলেন, খালিয়াজুরীতে বিস্কুট প্রথম সপ্তাহে দিয়ে পরে আর দিচ্ছে না। রুটি, কলা মানসম্মত না হলে আমরা রাখছি না। তবে শিশুদের খাবার না রাখলেও পরে আর এগুলো দেওয়া হয় না। এতে শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা উপজেলা আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সভায় বারবার বলেছি।
খালিয়াজুরী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজিমেল কদর বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের খাদ্যসামগ্রী বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি তারা অবগত হয়েছেন। বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী নিয়মিত বিতরণে সমস্যা রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত খাদ্যসামগ্রী বিতরণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। দুর্গম হাওরাঞ্চলে নির্ধারিত তালিকার খাদ্যসামগ্রীর ধরন পরিবর্তন করা হলে এ ধরনের সংকট কিছুটা কমতে পারে।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে কোনো অবস্থাতেই কারও গাফিলতি মেনে নেওয়া হবে না। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও ঝরে পড়া রোধে সরকার দেশের ১৫০টি উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয়ে পরিচালিত এ কর্মসূচিতে খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।


