গজারি বনের আড়ালে মৃত্যুফাঁদ
কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কে দেড় বছরে ৫০ মৃত্যু
Advertisement
মোহাম্মদ মোরশেদ আলম, গাজীপুর
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুই পাশে গজারি বনের সবুজ সৌন্দর্য, মাঝখানে আঁকাবাঁকা সড়ক। দূর থেকে দেখতে মনোরম হলেও গাজীপুরের কালিয়াকৈর-মাওনা ২৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়কটি এখন যেন মৃত্যুফাঁদ। বিশেষ করে সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। স্থানীয়দের দাবি, গত দেড় বছরে এ সড়কে শতাধিক দুর্ঘটনায় অন্তত অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক।
সবশেষ গত শনিবার সকালে কালিয়াকৈর থেকে পাঁচ যাত্রী নিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তার দিকে যাচ্ছিল। অটোরিকশাটি কালিয়াকৈর-ফুলবাড়িয়া-মাওনা আঞ্চলিক সড়কের কাঞ্চনপুর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশার চালকসহ পাঁচজন গুরুতর আহত হন। পরে আহতদের মধ্যে মা-ছেলেসহ চারজনের মৃত্যু হয়।
কালিয়াকৈর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, সড়কটি দুর্ঘটনাপ্রবণ। এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। চলতি সপ্তাহেই চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ওই সড়কে একটি ট্রাক উল্টে নিচে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ফুলবাড়িয়া হয়ে সহজেই শ্রীপুরের মাওনায় যাওয়া যায় এ সড়ক দিয়ে। মাওনা হয়ে ময়মনসিংহের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করে। তবে আঞ্চলিক সড়ক হলেও এর প্রস্থ মাত্র ২০ থেকে ২৫ ফুট।
প্রায় ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটিতে রয়েছে অন্তত ১৮ থেকে ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। এসব বাঁকের দুই পাশে শালবন ও ঘন ঝোপঝাড় থাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন অনেক সময় দেখা যায় না। ফলে বাঁকে পৌঁছেই হঠাৎ মুখোমুখি হতে হয় যানবাহনের। এতে চালকরা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
স্থানীয়দের দাবি, গত এক থেকে দেড় বছরে সড়কটিতে অন্তত শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দা সোলেমান হোসেন বলেন, সড়কটি দ্রুত প্রশস্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ঝোপঝাড় পরিষ্কার, কার্যকর বাঁক নির্দেশক ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে এ সড়কের বাঁকগুলোতে মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হবে।
এলাকাবাসী জানান, সড়কের দুই পাশে গভীর বন থাকায় অনেক জায়গায় সামনের যানবাহন স্পষ্ট দেখা যায় না। আবার সড়কটি তুলনামূলক ফাঁকা হওয়ায় যানবাহনের গতি থাকে বেশি। ফলে হঠাৎ বাঁকে গিয়ে চালকরা অনেক সময় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। এ সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্রাকই বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয় বলে জানান স্থানীয়রা। বিভিন্ন সময় মাটিবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কে মাটি পড়ে থাকে। বৃষ্টির পানিতে সেই মাটি পিচ্ছিল হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। নির্জন ও বনঘেরা হওয়ায় সড়কটিতে চলাচলকারীদের ডাকাতির আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানান তারা।
সড়কে চলাচলকারী পরিবহণ চালকরা জানান, বিভিন্ন যানবাহন ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করে। এমন গতিতে চলার সময় হঠাৎ বাঁক এলে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক বাঁক এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে এক পাশ থেকে অন্য পাশ দেখা যায় না। কোথাও কোথাও বাঁকের নির্দেশক থাকলেও সেগুলো দূর থেকে সহজে চোখে পড়ে না।
চালক আরিফুল ইসলাম বলেন, সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর দুই পাশে গজারি বন থাকায় ঘন ঘন বাঁকে এক পাশ থেকে অন্য পাশের যানবাহন দেখা যায় না। এ কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে সতর্কতামূলক সংকেত ও গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা জরুরি। বাঁকে এক পাশ থেকে অন্য পাশের যানবাহন দেখা ও আগাম সংকেত পাওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে চালকরা সতর্ক হয়ে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
চালক মো. জনি হাসান বলেন, এ সড়কে যানবাহনের চাপ যেমন বেশি, তেমনি বাঁকের সংখ্যাও অনেক। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। গতি কমিয়ে চলাচল করলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের গাজীপুর জেলা সভাপতি রাকিব হাসান বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এ আঞ্চলিক সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করতে হবে। এর আগে সিএনজি বাদ দিয়ে বাস চলাচলের দাবিতে এ সড়কে মানববন্ধন করা হয়েছে এবং বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখনো তেমন কোনো জোরালো ভূমিকা নেয়নি। তিনি বলেন, এ সড়কে প্রতি মাসেই কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটছে। হিসাব করলে বছরে শতাধিক মানুষ দুর্ঘটনায় হতাহত হচ্ছেন।
জয়দেবপুর সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. তারিক হোসেন বলেন, সড়কটি সংকুচিত এবং এতে অতিরিক্ত বাঁক রয়েছে। ইতোমধ্যে গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান সড়কটি সম্প্রসারণের জন্য মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন। সড়কটি সম্প্রসারণ করা গেলে দুর্ঘটনা কমবে।
তবে সড়ক সম্প্রসারণের কাজ জটিল বলেও জানান তিনি। কারণ, সড়কটির অধিকাংশ অংশজুড়ে বন বিভাগের গাছ ও জায়গা রয়েছে।
গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। আশা করছি, এই অর্থবছরের মধ্যেই সড়কের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সংস্কার করা হবে। এ সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালকদের সচেতনভাবে চলাচল করতে হবে। বিশেষ করে বাঁকগুলোতে গতি কমিয়ে দক্ষতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হবে।

