পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই দশকেও প্রতিষ্ঠা হয়নি পারিবারিক আদালত, বিচারবঞ্চিত নারী ও শিশুরা
Advertisement
বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম
বান্দরবানে জেলা ও দায়রা জজ আদালত। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০০৮ সালে বান্দরবানে জেলা ও দায়রা জজ আদালত যাত্রা শুরু করলেও প্রায় দুই দশক ধরে প্রতিষ্ঠা হয়নি কোনো পারিবারিক আদালত। শুধু বান্দরবান নয়, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতেও কোনো পৃথক পারিবারিক আদালত নেই। ফলে খোরপোষ, দেনমোহর, বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার এবং সন্তানদের অভিভাবকত্ব নির্ধারণের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে আইনি প্রতিকার পাচ্ছেনা পার্বত্য এলাকার হাজার হাজার নারী ও শিশু।
১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ (যা বর্তমানে ২০২৩ সালের পারিবারিক আদালত আইন দ্বারা প্রতিস্থাপিত) ধারা ১(২) অনুযায়ী, এই আইনের আওতাভুক্ত এলাকা নির্ধারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে বাইরে রাখা হয়েছে। যুক্তি দেখানো হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের নিজস্ব প্রথাগত আইন রয়েছে, যেখানে কারবারি ও হেডম্যানরা পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধের মীমাংসা করেন।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক ও জনসংখ্যার বিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতীদের পাশাপাশি এখানে বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি স্থায়ী বাঙালিরা বসবাস করছে, যাদের পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে এই প্রথাগত আইনের কোন সুযোগ নাই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, তিন পার্বত্য জেলায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ বাঙালি। এর মধ্যে বান্দরবানে প্রায় ৫৯ শতাংশ, খাগড়াছড়িতে ৫১ শতাংশ এবং খাগড়াছড়িতে ৪২ শতাংশ বাঙ্গালী বসবাস করে। ২০২৬ সালে এই শতাংশ আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই অন্তত বাঙ্গালীদের জন্য হলেও পারিবারিক আদালত স্থাপন খুবই জরুরী বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট রাজীব চন্দ্র ধর বলেন, দেওয়ানি আদালতের জটিল কার্যপদ্ধতির বদলে পারিবারিক আদালতে খুব দ্রুত সময়ে স্বল্প খরচে সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পাহাড়ে পৃথক পারিবারিক আদালত না থাকায় নারী ও শিশু সুরক্ষার মৌলিক আইনি অধিকার এখানে প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে।
বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু জাফর বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত আইনকে সম্মান জানিয়ে বলছি, সময়ের প্রয়োজনে এখন পারিবারিক আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য। প্রথাগত ব্যবস্থা বহুক্ষেত্রে বর্তমান যুগের আইনি জটিলতা বা খোরপোষের কার্যকর বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে স্থায়ী বাঙালি অধিবাসী এবং আধুনিক আইনি সুরক্ষা প্রত্যাশী পাহাড়িদের জন্য পারিবারিক আদালত স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। মূল আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে পাহাড়েও এই আইন চালু করা দরকার।
বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বলেন, বিচার পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা বান্দরবানের নারীদের দ্রুত পারিবারিক বিচার দিতে পারছি না। সাধারণ দেওয়ানি প্রক্রিয়ায় খোরপোষ বা অভিভাবকত্বের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। আমাদের জোর দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রথাগত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়ে কীভাবে পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ পার্বত্য জেলায় কার্যকর করা যায়, সে ব্যাপারে সরকার ও আইন মন্ত্রণালয় যেন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

