মাঠে পর্যাপ্ত লবণ, তারপরও দেড় লাখ টন আমদানির অনুমতি
Advertisement
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৯ এএম
লবণ। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কক্সবাজারের উপকূলে এখন লবণ মাঠ তৈরির প্রস্তুতি চলছে। অনেক চিংড়িঘের ইতোমধ্যে শুকিয়ে গেছে। কোথাও মাটি সমান করা হচ্ছে, কোথাও বাঁধ মেরামত ও পানি চলাচলের নালা তৈরি চলছে। চাষিদের প্রস্তুতি দেখে বোঝা যায়, নতুন মৌসুম আর বেশি দূরে নয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকেই কোথাও কোথাও লবণ উৎপাদন শুরু হবে।
এমন সময় সরকার দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন লবণচাষিরা। তাদের প্রশ্ন, দেশে নতুন মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে, মাঠে ও মিলে লবণ মজুত রয়েছে, তাহলে এখন আমদানি কেন?
চাষিদের আশঙ্কা, আমদানি করা লবণ বাজারে ঢুকলে স্থানীয় লবণের দাম কমে যেতে পারে। এতে গত মৌসুমের লোকসান কাটিয়ে ওঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটিও নষ্ট হতে পারে।
বিসিকের হিসাবে, বর্তমানে মাঠে ৪ লাখ ৯০ হাজার টন এবং বিভিন্ন মিলে ১ লাখ ৭৭ হাজার টন লবণ রয়েছে। সব মিলিয়ে মজুত প্রায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার টন। দেশে প্রতি মাসে লবণের চাহিদা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টন। এই হিসাবে বর্তমান মজুত দিয়ে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব।
তবে বিসিকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, গত মৌসুমে উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছিল। নতুন মৌসুমের শুরুতেও উৎপাদন কম থাকবে। গত বছরের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ২০ থেকে ২৫ দিনের সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কা থেকেই আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে।
মাঠ প্রস্তুত, চাষিরা অপেক্ষায়
কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চাষিরা নতুন মৌসুমের জন্য জমি প্রস্তুত করছেন। যেসব চিংড়িঘেরে এতদিন পানি ছিল, সেগুলো শুকিয়ে লবণ তৈরির উপযোগী করা হচ্ছে।
কুতুবদিয়ার লবণচাষি মো. আলমগীর ও এহাসানসহ কয়েকজন জানান, অক্টোবরের মাঝামাঝি উৎপাদন শুরু হলেও প্রথম দিকে লবণ খুব বেশি হয় না। রোদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন বাড়ে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে মাঠে লবণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এ সময়ের মধ্যে লবণ আমদানির খবরে তারা আতঙ্কিত।
বাংলাদেশ লবণচাষি কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ জে এম সিয়াম বলেন, গত মৌসুমে এক মণ লবণ উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা। মৌসুমের শুরুতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা লোকসানেও লবণ বিক্রি করতে হয়েছে। পরে দাম বাড়ায় এখন প্রতি মণ প্রায় ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, চাষিরা যখন কিছুটা ভালো দাম পাচ্ছেন, তখন আমদানি হলে বাজারদর আবার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে চাষিরা লবণ চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।
আমদানির পক্ষে মিল মালিকরা
বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির বলেন, বর্তমানে চাষিদের হাতে কোনো লবণ নেই। সিংহভাগ লবণ মজুতদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মজুতদাররা যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে এবং অবৈধভাবে লবণ পাচার বন্ধ করা যায়, সে লক্ষ্যেই সরকার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে সাধারণত নভেম্বরের শেষদিকে নতুন মৌসুমের উৎপাদন শুরু হয়। ডিসেম্বর মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার মেট্রিক টন এবং জানুয়ারিতে ২০ থেকে ২২ হাজার মেট্রিক টনের বেশি উৎপাদন সম্ভব হয় না। ফলে ফেব্রুয়ারি-মার্চের আগে বাজারে দেশীয় লবণের পর্যাপ্ত সরবরাহ তৈরি হয় না।
নুরুল কবির আরও বলেন, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের মজুতের হিসাব করে সরকার ৩ থেকে ৪ লাখ টন লবণের ঘাটতির আশঙ্কা করেছে। বাজারে সংকট ঠেকানো এবং অবৈধভাবে লবণ আসা বন্ধ রাখতে মিল মালিক ও চাষি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেই সীমিত পরিসরে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২৫১ মিলের জন্য দেড় লাখ টন
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মোট দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে ২৪৪টি মিলকে ৫৪৩ টন করে মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন এবং সাতটি আধুনিক ভ্যাকুয়াম মিলকে ২ হাজার ৫০০ টন করে মোট ১৭ হাজার ৫০০ টন দেওয়া হয়েছে। দেশে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, পটিয়া, কক্সবাজার, খুলনা ও ঝালকাঠিতে মোট ২৫১টি লবণ মিল রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া ২৪৪টি মিলের মধ্যে ৮৬টি গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত কোনো ভোজ্য লবণ উৎপাদন করেনি বলেও জানা গেছে।
কক্সবাজারের ইসলামপুরের কয়েকজন মিল মালিক অভিযোগ করেন, আমদানির অনুমতিপত্রকে ঘিরে একটি ব্যবসা তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, এসব অনুমতিপত্র উচ্চ দামে হাতবদলের সুযোগ থাকে। গত বছরও আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও পরে তা বাতিল হয়েছিল। আমদানি ছাড়াই তখন বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়নি।
বিসিকের লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার হোসেন বলেন, উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিতেই মিলগুলোকে আমদানির বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কেউ আমদানির অনুমতিপত্র বিক্রি করলে তার নিবন্ধন বাতিল করা হবে।
লবণ আমদানি মানে চাষিদের ওপর জুলুম
লবণ আমদানির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজল। যুগান্তরকে তিনি বলেন, একটি মহল সরকারকে ভুল বুঝিয়ে লবণ আমদানির অনুমোদন নিয়েছে। তাদের বলা হচ্ছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণ আমদানি করা হবে। কিন্তু তার বক্তব্য, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণ’ বলে আলাদা কোনো লবণ নেই, লবণ একটাই।
কাজল বলেন, কিছুদিনের মধ্যেই দেশে নতুন লবণের মৌসুম শুরু হবে। মাঠে ও বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে পর্যাপ্ত লবণ মজুত রয়েছে। এ অবস্থায় লবণ আমদানি করা হলে চাষিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
তিনি বলেন, এ অবস্থায় লবণ আমদানি করা মানে আমাদের চাষিদের ওপর জুলুম করা। আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছি। প্রয়োজনে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও তুলে ধরা হবে।
