বাবা-মায়ের ত্যাগের মর্যাদা দিতে পড়াশোনা করতে হবে: ডেপুটি স্পিকার
Advertisement
দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। বাবা-মা অনেক কষ্ট করে সন্তানদের স্কুলে পাঠান। তাদের সেই ত্যাগের মর্যাদা দিতে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সুসং আদর্শ বিদ্যানিকেতন স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সুসং আদর্শ বিদ্যানিকেতন স্কুল চত্বরে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন করলেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি মেধা, মনন, মানসিকতার বিকাশ এবং উন্নত চরিত্র গঠন করতে হবে। তবেই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
মতবিনিময় সভায় শিক্ষার্থী ওমি ও রায়াত এর বক্তব্যের প্রশংসা করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, তাদের বক্তব্য অত্যন্ত চমৎকার ও প্রভাবশালী হয়েছে। তাদের বক্তব্য শুনে আমি গর্ববোধ করছি। বিদ্যালয়ের নাম যেমন ‘সুসং আদর্শ বিদ্যানিকেতন’ তেমনি তোমাদেরও সেই নামের সুনাম ধরে রাখতে হবে। তোমাদেরকেও নিজেদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠতে হবে।
বিদ্যালয়ের সামনের ভাংগা সড়কের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ পথ দিয়ে যাতায়াতের সময় শিক্ষার্থীদের কষ্ট আমি দেখেছি। বৃষ্টির দিনে বিদ্যালয়ের সামনে কাঁদা থাকায় শিক্ষার্থীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। অভিভাবকদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর দুর্গাপুর পৌরসভার মধ্যে এই সড়কটির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। আমি যেহেতু দুর্গাপুরের প্রথম কাজ তোমাদের স্কুলের সামনে থেকে শুরু করেছি, তেমনি তোমাদের স্কুলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যও সর্বোচ্চ চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
দুর্গাপুর-কলমাকান্দাকে দীর্ঘদিনের অবহেলিত জনপদ উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। সম্প্রতি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, এমনকি বিদ্যালয়ের সামনে খেলার মাঠও নেই। এসব সংকটের জন্য শিক্ষার্থীরা দায়ী নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরই এসব সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।
আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। চাইলেই অনেক কিছু করা যায় না। তারপরও আমি চেষ্টা করছি। যতদিন এই এলাকার সংসদ সদস্য হিসেবে থাকব, এই দায়িত্বকে পবিত্র আমানত হিসেবে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করব। এলাকার অনেক অভিভাবক অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল নন। কেউ রিকশা চালান, কেউ শ্রমিকের কাজ করেন, কেউ কৃষিকাজ করেন। নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। অনেক সময় বাবার নিজের পরনে ভালো পোশাক না থাকলেও সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর জন্য নতুন পোশাক কিনে দেন। এই ত্যাগ উপলব্ধি করে শিক্ষার্থীদের আরও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।
জীবনের স্মৃতিচারণ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, আমার বাবা একজন কৃষক ছিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফি দেওয়ার জন্য তার বাবাকে ধার করতে হয়েছিল। এ কথা তিনি গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন। আমার বাবার মতো অনেক বাবা-মায়ের সন্তান এখানে হয়তো তোমরা আছ। তোমরা যদি বাবা-মায়ের কষ্টটা উপলব্ধি করে অতিরিক্ত সময় নিয়ে পড়াশোনা কর, তাহলে অবশ্যই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারবে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল না করলে ভালো কলেজে পড়ার সুযোগ কঠিন হয়ে পড়ে। আবার ইন্টারমিডিয়েটে ভালো ফলাফল না করলে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগও সীমিত হয়। তাই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হচ্ছে বিদ্যালয় জীবন।
নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, পরীক্ষার আগে তিনি অনেক সময় মশারি না টানিয়ে ঘুমাতেন, যাতে মশার কামড়ে ঘুম ভেঙে যায় এবং গভীর রাতে উঠে পড়াশোনা করতে পারেন। সকল শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায় ও মনোযোগের সঙ্গে পড়াশোনা করার আহ্বান জানান।
সভায় শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংসদ অধিবেশন দেখার আগ্রহের বিষয়টিও উঠে আসে। এ বিষয়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, অধিবেশন চলাকালীন সময়ে দুর্গাপুরের শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংসদে অধিবেশন চলাকালীন পরিদর্শনের সুযোগ করে দেবেন।
বিদ্যালয়ের সোলার প্যানেলের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্ভব হলে বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেলের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন বলে জানান। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ আরও ভালো করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
দুর্গাপুরের মাদক সমস্যা নিয়েও কথা বলেন ডেপুটি স্পিকার। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের বলেন, পরিবারের কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলে তাকে সুপথে ফিরিয়ে আনার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এমন একটি মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে প্রত্যেকে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারবে। নির্বাচনের পর নানা কারণে সব জায়গায় আমার যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এলাকার মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধ সবসময় থাকবে।
এসময়, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতাকর্মী, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী অভিভাবকরা উপস্থিত ছিলেন।
এ দিকে ডেপুটি স্পিকার সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় দুর্গাপুর বাজার বণিক সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। সভায় তিনি বলেন, সন্ত্রাস চাঁদাবাজ মুক্ত প্রাণের দুর্গাপুর গড়ে তুলতে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে ব্যবসা পরিচালনার নিশ্চয়তা দেওয়ার পাশাপাশি মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সকল শ্রেনি-পেশার মানুষের সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘আপনারা যখন মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিলেন, তখন আমি ওয়াদা করেছিলাম আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হতে পারলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত দুর্গাপুর গড়ার জন্য কাজ করব। সেই লক্ষ্যেই আমরা চেষ্টা করছি। কতটুকু সফল হয়েছি, সেই বিচারের ভার আপনাদের ওপর।’
মাদকমুক্ত ও মানবিক দুর্গাপুর গড়ে তুলতে আমরা কাজ করে যাব। মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহমেদ সাদাত। অন্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতা, ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ, দুর্গাপুর বাজার ব্যবসায়ী ও বণিক সমিতির নেতা, ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
