নারীশক্তির আরাধনা, মুষ্টির চালে দুর্গাপূজা
Advertisement
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’—অর্থাৎ হে দেবী, তুমি সর্বভূতে শক্তিরূপে বিরাজ করছ। এই মন্ত্রকে ধারণ করেই শেরপুরের সনাতন ধর্মাবলম্বী অনগ্রসর একদল নারী নিজেদের জমানো মুষ্টির চাল দিয়ে আয়োজন করেছেন নারীশক্তিরূপের দুর্গাপূজা।
শেরপুর জেলা শহরের পৌর এলাকার সাতানীপাড়া মহল্লায় আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের শ্রমজীবী মানুষের বসবাস। তারা দিন এনে দিন খান। এর মধ্যেও ওই সম্প্রদায়ের নারীরা একজোট হয়ে আলাদাভাবে দুর্গাপূজা উদযাপনের উদ্যোগ নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত দুই বছর ধরে ‘উমা সংঘ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলে ছোট পরিসরে পূজার আয়োজন করে আসছেন তারা।
অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে এবারও বড় পরিসরে সম্ভব না হলেও টানা তৃতীয়বারের মতো কেবল নারীদের উদ্যোগেই হচ্ছে এ আয়োজন।
২৩ সদস্যের উমা সংঘ কমিটির সবাই নারী। তারা সিদ্ধান্ত নেন মহল্লার ৪২টি পরিবার থেকে প্রতিদিন এক মুষ্টি করে চাল সংগ্রহ করবেন। পরবর্তীতে সেই চাল বিক্রি করে প্রতি মাসে প্রায় ২শ টাকা করে সঞ্চয় করা হয়। বছর শেষে এভাবে জমে ওঠা ৬০ হাজার টাকা পুঁজি করে তারা পূজা উদযাপনের প্রস্তুতি নেন। তবে একটি পূজা সম্পন্ন করতে কয়েক লাখ টাকা খরচ হওয়ায় তারা শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্থানীয় বিত্তবানদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে অনুদান সংগ্রহ করছেন।
ইতোমধ্যে শহরের পালপাড়া থেকে ৬০ হাজার টাকায় প্রতিমা তৈরি করে অস্থায়ী মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছে। শেষ মুহূর্তে চলছে সাজসজ্জা, তোরণ নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও পূজার প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের কাজ।
১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে শেষ হবে দুর্গোৎসব। উমা সংঘের নারীদের পাশাপাশি স্থানীয় পুরুষ ও তরুণ-তরুণীরাও এ উদ্যোগে সব ধরনের সহযোগিতা করছেন।
উমা সংঘের সভাপতি মুক্তি বিশ্বাস বলেন, ‘নারীরা শক্তির প্রতীক। নারীশক্তির জাগরণ এবং পুরুষদের পাশাপাশি যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নারীদের সক্ষমতা তুলে ধরতেই আমাদের এ আয়োজন। ২০২৪ সালের প্রথম আয়োজনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার টানা তৃতীয়বারের মতো পূজা করছি। পরিবারগুলো থেকে মুষ্টির চাল সংগ্রহ করে বিক্রি করা ৬০ হাজার টাকা দিয়ে আমরা কাজ শুরু করি। সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে এবারও আয়োজন সম্ভব হয়েছে।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুমিতা বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের পাড়ায় আদিবাসী-দলিতদের পাশাপাশি ব্রাহ্মণ ও সাহা পরিবারের বসবাস। তারাও সহযোগিতা করছেন। এতে আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এবার সফলভাবে পূজা সম্পন্ন করতে পারলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
স্থানীয় আদিবাসী নেতা বিদ্বান বিশ্বাস বলেন, ‘হতদরিদ্র পরিবারের নারীরা যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। সমাজের এই পিছিয়ে পড়া নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই।’
শেরপুর জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি জিতেন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘উমা সংঘের জন্য অন্য মণ্ডপের চেয়ে সরকারি বরাদ্দ কিছুটা বেশি রাখা হয়েছে। তারা কেবল পূজাই করছে না, নারীশক্তির প্রকৃত আরাধনা করছে।’
