ভাসমান বেডে ১০ কোটি টাকার সবজির চারা, বদলাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি
Advertisement
পিরোজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বছরের প্রায় ছয় মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি-দোবরা ও নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। জলাবদ্ধতাকে বাধা না ভেবে সম্ভাবনায় রূপ দিয়েছেন এখানকার কৃষকরা। ভাসমান বেডে উৎপাদন করছেন বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। প্রতি মৌসুমে উৎপাদিত প্রায় এক কোটি চারা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০ কোটি টাকায়। এই কৃষিকাজ ঘিরে জীবিকার পথ তৈরি হয়েছে হাজারো পরিবারের। পুরুষের পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছেন নারীরাও। তবে পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তার স্বপ্ন আটকে আছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ভাসমান চাষপদ্ধতি সময়ের সঙ্গে কিছুটা আধুনিক হলেও এখনো এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। তবু নিজেদের মেধা ও শ্রমে এলাকার কৃষকরা বদলে দিচ্ছেন জীবনযাত্রা। ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন ঘিরে ঘুরছে এক হাজারেরও বেশি পরিবারের ভাগ্যের চাকা।
নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ২০০৫ সাল থেকে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন তিনি। স্থানীয় অসহায় ও কর্মহীন নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন কাজের পরিসর। বর্তমানে তার সঙ্গে কাজ করছেন প্রায় ১০ জন নারী।
কেউ দুলালী লতা দিয়ে তৈরি ম্যাদার ভেতর বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ বুনছেন, কেউ আবার অঙ্কুরিত চারা সাজিয়ে রাখছেন। এভাবেই পানির ওপর তৈরি বেডে বেড়ে উঠছে সবজির চারা। নুরজাহানের স্বপ্ন, নিজের উদ্যোগকে আরও বড় করার পাশাপাশি কর্মহীন নারীদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা না থাকায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়ছেন তিনি।
নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমি একজন নারী উদ্যোক্তা। ২০০৫ সাল থেকে এই কাজ করে আসছি। অনেক পরিবার দুঃখ-কষ্টে আছে। আমি তাদের সামনে এগিয়ে নিতে চাই, কিন্তু পারছি না। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ দিত, তাহলে সামনে এগোতে পারতাম। নারীদের কাজ দিতে পারতাম, তারা ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারত। আমি ঘরে বসে থাকা নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।’
ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের প্রাথমিক কাজে যুক্ত নারীরা প্রতিদিন কয়েকশ থেকে দুই হাজার পর্যন্ত চারার কাজ করেন। প্রতি এক হাজার দুলালী লতা দিয়ে ম্যাদা তৈরি করে তারা পান ১৫০ টাকা। এই আয় দিয়েই চলে তাঁদের সংসার।
বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, ‘সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করি। সারাদিন এত পরিশ্রম করেও ২০০ টাকা আয় করতে অনেক কষ্ট হয়। নারীদের আর কোনো কাজ নেই, তাই এগুলোই করি। আমাদের ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ভালো হতো। এক হাজার ম্যাদা বানিয়ে দেড়শ টাকা পাই। তাতে কি আর সংসার চলে!’
স্থানীয় নারীদের মতে, প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁদের অনেকেই নিজেরাই উদ্যোক্তা হতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন তাঁদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।
নাজিরপুরের দেউলবাড়ি-দোবরা ও নেছারাবাদের বলদিয়া ইউনিয়নের পাঁচটি ব্লকে ভাসমান বেড ও ধাপ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হয়। বিলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শিম, পেঁপে, করলা, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারা উৎপাদিত হচ্ছে। এসব চারা পিরোজপুরের পাশাপাশি খুলনা, যশোর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকারী কৃষক লুৎফুর রহমান বলেন, ‘এখানে সকাল ছয়টায় কাজ করতে আসি। বেডে চারা রোপণ করি, ওষুধ দিই, লতা পরিষ্কার করি। এখানকার চারা ঢাকা, খুলনা, গোপালগঞ্জ, বরিশালসহ অনেক জায়গায় যায়। প্রতিবছর এখানে লাখ লাখ চারা উৎপাদন হয়। বিভিন্ন জাতের সবজির চারা প্রতিটি ৩ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।’
পিরোজপুর পৌর শহরে এসব চারা খুচরা বিক্রি করেন রফিক শেখ। তিনি বলেন, নাজিরপুরের ভাসমান বেড থেকে বিভিন্ন জাতের চারা কিনে এনে বিক্রি করেন। প্রতিটি চারা ৫ থেকে ৭ টাকা দরে কিনে ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। এ পেশার সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত। কৃষি অফিস থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, প্রতি মৌসুমে ভাসমান বেডে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় এক কোটি সবজির চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারা বিক্রি করে প্রায় ১০ কোটি টাকা আয় হয়।
