মৃত্যুর হিমশীতল আলিঙ্গনও ভাঙতে পারেনি পোষাপ্রাণী-মনিবের বন্ধন
Advertisement
অহিদুল হক, বড়াইগ্রাম (নাটোর)
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি আকস্মিক শব্দ, প্রচণ্ড ঝাঁকুনি আর পলকেই সব নিস্তব্ধ। নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের এক ভয়াবহ সংঘর্ষ কেড়ে নিয়েছে ১২টি তাজা প্রাণ। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে যখন উদ্ধারকর্মীরা আট বছর বয়সি ছোট্ট তাসফিয়ার নিথর দেহটি উদ্ধার করছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে উঠেছিল এক অদ্ভুত আর বুকফাটা বেদনায়। রক্তাক্ত ও নিথর তাসফিয়ার বুকের সঙ্গে তখনও পরম মমতায় লেপ্টে ছিল তার সাধের পোষা বিড়ালটি। মৃত্যুর হিমশীতল পরশও এই দুই খেলার সাথীকে আলাদা করতে পারেনি; তাসফিয়ার সঙ্গে অনন্তকালের যাত্রায় পাড়ি জমিয়েছে তার অবুঝ পোষা প্রাণীটিও।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে বাবার সঙ্গে রাজশাহীতে খালার বাসায় যাচ্ছিল তাসফিয়া। বিড়ালটিকে বাসায় একা রেখে আসতে রাজি ছিল না সে, তাই দূরপাল্লার এই দীর্ঘ যাত্রায় সেটিকে সঙ্গে নিয়েছিল। পুরোটা পথ বিড়ালটি ছিল তার কোলেই। গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, হয়তো বিড়ালটিকে বুকে জড়িয়েই বাসের সিটে ঘুমিয়ে পড়েছিল ছোট্ট মেয়েটি। কিন্তু ভোর সাড়ে ৪টার দিকে হঠাৎ এক বিকট শব্দে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। দুর্ঘটনায় শিশু তাসফিয়া ও তার বাবা শহীদুল ইসলামসহ মোট ১২ জন প্রাণ হারান।
দুর্ঘটনার পর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসের ভেতর উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয়দের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তারা দেখেন, তীব্র ঝাঁকুনি বা মৃত্যুর চরম আতঙ্কের মুহূর্তেও তাসফিয়া তার পোষা সাথীকে হাতছাড়া করেনি, বরং আরও শক্ত করে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছিল। আর অবুঝ বিড়ালটিও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তার ছোট্ট মনিবের বুকেই আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল।
দুর্ঘটনাস্থলের নিকটতম বাসিন্দা গৃহবধু মাজেদা পারভীন চোখ মুছতে মুছতে বলেন, দুর্ঘটনায় মেয়েটির মাথা থেঁতলে গিয়েছিল। কিন্তু লাশটি যখন বাস থেকে নামানো হয়, তখন বিড়ালটি তার কোলেই ছিল। মরার সময়ও সে বিড়ালটাকে বুক থেকে নামায়নি। মঙ্গলবার সারাদিন দুর্ঘটনাস্থলে বিড়ালের মরদেহটি পড়ে থাকতে দেখে সরকারি কর্মকর্তা, উদ্ধারকর্মী ও সংবাদকর্মীসহ সবাই গভীরভাবে শোকাহত হন। অনেকেই ফেসবুকে এই আবেগঘন দৃশ্য নিয়ে পোস্ট করেন।
বড়াইগ্রামের ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) জুবায়ের জাহাঙ্গীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, অনেকগুলো লাশের ভিড়ে এই শিশু ও তার পোষা বিড়ালের মৃত্যুটি সবাইকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে, আবেগতাড়িত করেছে আমাদেরও।
দেশের মহাসড়কগুলো প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে শত শত মানুষের স্বপ্ন। তাসফিয়া ও তার বিড়ালের এই করুণ মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের বেপরোয়া সড়ক ব্যবস্থার এক নির্মম দলিল। ওপারেতো কোনো নিয়মের বেড়াজাল নেই, নেই গতির প্রতিযোগিতা; তাই তাসফিয়া হয়তো তার প্রিয় খেলার সাথীকে নিয়ে সেখানে কোনো এক নিরাপদ মেঘের দেশে মেতে উঠবে নতুন কোনো খেলায়।
