Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

২৪ ব্যাংক হিসাবে ১৪ কোটি টাকা লেনদেন মাদকসম্রাট দম্পতির

Advertisement

Icon

রাজশাহী ব্যুরো

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম

২৪ ব্যাংক হিসাবে ১৪ কোটি টাকা লেনদেন মাদকসম্রাট দম্পতির

Advertisement

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শীর্ষ পাঁচ মাদকসম্রাটের মধ্যে একজন জুয়েল রানা (৩৪)।  একটি মাদকের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে কয়েদি হিসেবে জেলা কারাগারে সাজা খাটছেন। সম্প্রতি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) একজন কর্মকর্তা বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেন। মামলার পর জুয়েল রানা ও তার স্ত্রী সালমা জাহানের (৩০) সম্পদ ও সম্পত্তির অনুসন্ধানে নামেন মানি লন্ডারিং মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মেহেদী হাসান। সম্প্রতি তদন্ত কর্মকর্তা জুয়েল রানা ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি জব্দের জন্য আদালতে আবেদন করেছেন। আদালতের আদেশ হলে জুয়েল রানা ও তার স্ত্রীর নামে থাকা সব সম্পত্তি ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে। 

এদিকে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জুয়েল রানা ও তার স্ত্রী সালমা জাহানের মোট ২৪টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এসব ব্যাংক হিসাবে গত ৯ বছরে লেনদেন হয়েছে ১৪ কোটি ২৪ লাখ ৫৮ হাজার ২৮৮ টাকা। অনুসন্ধানে এই মাদকসম্রাট দম্পতির বিপুল টাকার জমিজমা বাড়িরও খোঁজ পাওয়া গেছে। জুয়েলের নামে দেশের বিভিন্ন জেলায় মোট ৯টি মাদকের মামলার তথ্য রয়েছে। তার মধ্যে একটি মামলায় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। কয়েদি হিসেবে সে জেলা কারাগারে সাজা ভোট করলেও তার মাদকের সিন্ডিকেট চলমান বলে জানিয়েছে মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের কর্মকর্তা।

এদিকে মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলছেন, জুয়েল রানার একটি আয়কর ফাইল রয়েছে। তবে এ বিপুল পরিমাণ লেনদেনের বৈধ কোন উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার অর্জিত অর্থ সম্পদের পুরোটাই এসেছে মাদকের কারবার থেকে।  সে চাঁপাইনবাবগঞ্জ তথা রাজশাহী অঞ্চলে মাদক পাচারের বড় কারবারি। সীমান্ত পথে ভারত থেকে মাদকদ্রব্য হেরোইন এনে পাইকারিতে সরবরাহ করেন দেশের বিভিন্ন এলাকায়। মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সম্পদ করেছেন নিজের ও স্ত্রীর নামে। তদন্ত শেষে স্বামী ও স্ত্রী দুইজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা।   

মানি লন্ডারিং মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, জুয়েল রানা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া মালবাগডাঙ্গা গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে। ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বার নির্বাচিত হন। বর্তমানে তার পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বেলেপুকুর মহল্লার বাড়িতে বসবাস করেন। সূত্রের মতে, কিশোর বয়সেই জুয়েল রানা মাদকদ্রব্য হেরোইন চোরাচালানে জড়িত হন। সীমান্ত এলাকা থেকে টাকার বিনিময়ে মাদক বহন করতে করতে একসময় নিজেই শুরু করেন মাদকের কারবার। গত ১২ অক্টোবর গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত নিজেই সীমান্ত পথে মাদক চোরাচালান ও দেশের বিভিন্ন জেলায় পাচার সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন। অন্যদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, জুয়েল কারাগারে থাকলেও তার পরিবারের সদস্যরা সিন্ডিকেটের হাল ধরেছেন।  

এজাহার বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন ব্যাংকের শাখায় মোট ১২টি ব্যাংক হিসাব চলমান রয়েছে জুয়েল রানার। এর মধ্যে চারটি চলতি হিসাব, তিনটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব এবং ৫টি সঞ্চয় হিসাব রয়েছে। এসব হিসাবে গত ৯ বছরে লেনদেন হয়েছে ৬ কোটি ১৮ লাখ ৩ হাজার ৩১৭ টাকা। ডিএনসির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জুয়েল রানার নামে দুইটি বাড়িসহ মোট ছয়টি জমির তথ্য উঠে এসেছে। রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে একটি পেট্রল পাম্প ও ঢাকায় আরও দুইটি বাড়ি থাকলেও সেগুলির তথ্য পায়নি ডিএনসি। এসব জমি ও বাড়ির দলিল মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ টাকা। তবে ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে এসব জমি বাড়ির বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। 

অন্যদিকে জুয়েল রানার স্ত্রী সালমা জাহানের নামেও দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ১২টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পেয়েছে মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের কর্মকর্তারা। গত ৮ বছরে এসব ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৬ কোটি ৮৬ লাখ ১২ হাজার ৯৭০ টাকা। ডিএনসির অনুসন্ধানে জুয়েল রানার স্ত্রীর নামে থাকা ২২ লাখ ৬ হাজার টাকার ৫টি জমির তথ্য উঠে এসেছে। মানি লন্ডারিং মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, স্বামীর মাদক কারবারের টাকা নিজের ১২টি ব্যাংক হিসাবে লেনদেন ও জায়গা জমির মালিক হয়েছেন সামলা জাহান। এক্ষেত্রে তিনি স্বামীকে মাদক কারবারে সহায়তা করেছেন যা দেশের প্রচলিত আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। অন্যদিকে নিজের অবৈধ কারবার চালাতে স্ত্রীর নামে ব্যাংক হিসাব খুলে লেনদেন করেছেন জুয়েল রানা।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, জুয়েল রানার নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৯টি মাদক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৫টি মামলা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায়। ঢাকার দুটি মামলার মধ্যে একটি ডিএমপির মিরপুর ও আরেকটি পল্টন থানায় রয়েছে। বাকি দুটি মামলা রয়েছে নাটোর সদর থানায়। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর জুয়েল রানাকে তার বেলপুকুর ও বালুবাগানের বাড়ি থেকে ৯৫০ গ্রাম হেরোইন ও ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের একটি অভিযানিক দল। মাদকসহ গ্রেফতারের মাত্র ২৮ দিনের মাথায় স্থানীয় একটি আদালত থেকে জামিন পেয়ে যান। ওইসময় কারাফটকে ফুলের মালা দিয়ে জুয়েলকে বরণ করেন তার সমর্থকরা। কারাগার থেকে বেরিয়ে  মোটরসাইকেলের বিশাল বহর দিয়ে বোমা ফাটাতে ফাটাতে নিজ গ্রামে যান জুয়েল। তার সমর্থকরা রাতভর উল্লাস করেন ও গরু জবাই দিয়ে চলে খানাপিনা। 

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদকে ৪০ লাখ টাকা দিয়ে আদালতকে প্রভাবিত করে জামিন পায় জুয়েল। কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে দলবলসহ সোজা চলে যান সাবেক এমপি ওদুদের বাসায়। ওদুদ তাকে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করেন। এসব ছবি ওই সময় সামাজিক মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হলে তোলপাড় হয়। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর দৈনিক যুগান্তরে ‘২৮ দিনে জামিন পেয়ে বোমা ফাটিয়ে উল্লাস’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।   

এদিকে আলোচিত মাদক মামলায় ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ জুয়েল রানাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন। সেই থেকে জুয়েল রানা পলাতক ছিলেন। কাগজে কলমে পলাতক থাকলেও গত মার্চে জুয়েল সৌদি আরবে ওমরাহ পালন শেষে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশ ভ্রমণ করেন। গত ২২ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানা পুলিশ রাজশাহীর লক্ষীপুর এলাকা থেকে জুয়েল রানাকে গ্রেফতার করেন।

জানা গেছে, জুয়েল রানা বর্তমানে উচ্চ আদালত থেকে জামিনের জন্য চেষ্টা করছেন। এজন্য এক কোটি টাকার বাজেট ধরেছেন। রাজনৈতিক তদবিরও চালাচ্ছে জুয়েল সিন্ডিকেটের সদস্যরা। উচ্চ আদালতে বিএনপিপন্থি একজন প্রভাবশালী আইনজীবী তার মামলাটি নিয়েছেন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ভয় দেখিয়ে ২ যাত্রীর টাকা নিয়ে লাপাত্তা রেল পুলিশ

ভয় দেখিয়ে ২ যাত্রীর টাকা নিয়ে লাপাত্তা রেল পুলিশ

‘শুধু একটা স্নাইপার এর অভাব ছিল’ বলা সেই যুবকের পরিণতি

‘শুধু একটা স্নাইপার এর অভাব ছিল’ বলা সেই যুবকের পরিণতি

ইউপি সদস্যের কাছে প্রতিবন্ধী ভাতার ১২ সিম, টাকা তুলতে গিয়ে আটক

ইউপি সদস্যের কাছে প্রতিবন্ধী ভাতার ১২ সিম, টাকা তুলতে গিয়ে আটক

‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্যকারী যুবক আটক

প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফর ‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্যকারী যুবক আটক

উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হচ্ছে ভূমিমন্ত্রীকে

উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হচ্ছে ভূমিমন্ত্রীকে

রাজশাহীতে ১০৩টি ককটেল উদ্ধার

রাজশাহীতে ১০৩টি ককটেল উদ্ধার

আরও পড়ুন

আদালতের রায়ে মেয়র, শাহাদাত এবার চট্টগ্রাম সিটির প্রশাসক

আদালতের রায়ে মেয়র, শাহাদাত এবার চট্টগ্রাম সিটির প্রশাসক

পানিতে ডুবে মামা-ভাগ্নের মৃত্যু

পানিতে ডুবে মামা-ভাগ্নের মৃত্যু

পুলিশ শক্তিশালী না হলে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না: আইজিপি

পুলিশ শক্তিশালী না হলে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না: আইজিপি

স্বামীর বাসা থেকে কুবি শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার

স্বামীর বাসা থেকে কুবি শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম