সাঈদীর মামলার বাদী মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা কিনা, যা জানা গেল
Advertisement
পিরোজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার বাদী মানিক পশারী। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার বাদী মানিক পশারীর মৃত্যুর পরে তাকে গার্ড অব অনার এবং দাফন নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানা বিষয়ে সংবাদ প্রচার করা হয়েছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে মানিক পশারীর লাশ দাফনে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, এমন সংবাদও প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও তিনজন নারী মিলে লাশ দাফনসহ নানা বিতর্ক রয়েছে। তবে মানিক পশারীকে কেউ কেউ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করলেও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বলছে ভিন্ন কথা।
মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার বাদী মানিক পশারীর মৃত্যুর পাঁচদিন পর বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বেলা ১১টায় পিরোজপুর সদর উপজেলার পৌর শহরের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের সামনে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সংসদ পিরোজপুর সদর উপজেলা কমান্ডের আয়োজনে মানিক পশারীর গার্ড অব অনার এবং দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করা হয়েছে।
মানববন্ধনে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পিরোজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক আহমেদ শহিদুল হক দাবি করেন, কিছু লোক মানিক পশারীর লাশ গার্ড অব অনার এবং দাফনে বাধা প্রদান করে। এ ঘটনায় তারা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম পিরোজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক গাজী কামরুজ্জামান শুভ্র মানিক পশারীর মৃত্যুর পরে সাংবাদিকদের বলেন, দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করা হয়েছে এবং সাক্ষ্য দেওয়ার অনেক পরে তিনি গেজেটভুক্ত হয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধের তর্কে যাব না, যুদ্ধের পরে আমার জন্ম। আমি বলতে চাই, একজন মুসলমান মরে গেলে তার দাফন-কাফন হতে হবে। এ ব্যাপারে আমরা কাউকে বাধা দিতে পারি না।
মানববন্ধনে গাজী কামরুজ্জামান শুভ্র বলেন, মানিক পশারী গেজেটভুক্ত হওয়ার আগে মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলাটি হয়েছে। গেজেটের তালিকা অনুযায়ী দেখা যায়, গেজেটের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ওই মামলার পরবর্তীতে হয়েছে।
এটা দ্বারা আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- আমি কিছুই বোঝাতে চাইনি, গেজেট সম্পর্কে জানাইতে চাইছি।
মানববন্ধন শেষে সাংবাদিকরা বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পিরোজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক আহমেদ শহিদুল হকের কাছে সাংবাদিকতা মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তৎকালীন সুন্দরবন এলাকার ভেতর দিয়ে নৌকা চালিয়ে শরণার্থী এবং প্রশিক্ষণ নিতে ইচ্ছুক মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে নিয়ে যাওয়ার কাজে যুক্ত ছিলেন মানিক পশারী।
তিনি বলেন, আমার বড় ভাই শহীদ ফজলুল হক খোকন প্রথম তাকে এবং তার চাচা রেয়াজ উদ্দিন পশারীকে এই কাজে নিয়োগ করেন। আমার ভাই শহীদ হওয়ার পর মেজর জিয়াউদ্দিন, যিনি সুন্দরবনে অবস্থানকালে সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, তিনিও রেয়াজ উদ্দিন পশারী ও মানিক পশারীকে তার অধীনে কাজ করার জন্য অনুরোধ করেন। এভাবেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন।
১৯৮০ সালে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা তালিকা তৈরির সময় আমি পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন মহকুমা ইউনিটের দায়িত্বে ছিলাম। তখন তাকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে সহযোগিতা করি। এভাবেই চলছিল কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার ক্যাটাগরি তুলে দিয়ে সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই হিসেবেই তিনি গেজেটভুক্ত হন।
তিনি আরও বলেন, যে কেউ যদি দাবি করেন, মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা নন, তাহলে তার গেজেট প্রণয়নকারী জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্যপ্রমাণসহ আবেদন করে গেজেট বাতিলের দাবি জানাতে পারেন। এভাবে ফেসবুকে ও পত্রিকায় বিষয়টি ভাইরাল করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য।
দুই মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেছেন এবং সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে—এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আহমেদ শহিদুল হক বলেন, ওই দুজন মুক্তিযোদ্ধা কি প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযোদ্ধা, তা নিয়েই আমার প্রশ্ন। পরে তাদের দুজনের নাম বলা হলে তিনি জানান, আব্দুস সালাম বাতেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। আরেকজন মির্জা জহিরুল হক গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা নন; তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন একজন রাজনৈতিক নেতা। তিনি কী কারণে রাজনৈতিকভাবে এমন বক্তব্য দিচ্ছেন, তা আমরা তার কাছে জানতে চাইব।
এছাড়াও মানিক পশারীর লাশ পিরোজপুরে আনার পরে কী ঘটেছিল, তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম যেদিন মানিক পশারীর লাশ পিরোজপুরে আসে, সেদিনই আমি পুষ্পস্তবক নিয়ে সিও অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে আমার সঙ্গে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তারা আমাকে সঙ্গে মব তৈরি করে। পুষ্পস্তবক ছিনিয়ে নিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয়। আমি তাদের নাম জানি না। এ ধরনের পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী সময়ে আমরা সব কর্মসূচি বাদ দিয়ে দিই। পরদিন সকালে পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা সেখানে যাইনি।
এদিকে মানিক পশারীর মৃত্যুর পরে সাংবাদিকদের দেওয়া একটি বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন বলেন, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছে। সাঈদী সাহেব কখনো রাজাকার ছিলেন না। ১৯৭১ সালে মানুষ তাকে চিনতো না। তিনি পিরোজপুরেও ছিলেন না। সাঈদী সাহেব একজন ভালো বয়ানকারী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী বক্তা ছিলেন।
তিনি বলেন, যেহেতু মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা, সে কারণে পুলিশ প্রশাসন তাকে গার্ড অব অনার দিতে বাধ্য হয়েছে। সাঈদী সাহেবের বিপক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তৎকালীন সরকার পুরস্কার হিসেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে। সাঈদীর অনুসারীরা বাধা দিয়েছিল। আমরাও জানি, তিনি একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।

-6ae337f2a7369.jpg)