পালটাপালটি অবরোধে জিম্মি সাজেকবাসী
সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০০ পিএম
পালটাপালটি অবরোধে জিম্মি সাজেকবাসী
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেকে সংকট ক্রমেই জটিল হচ্ছে। মুখোমুখি অবস্থানে দুইপক্ষ, বিচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ। অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের মধ্যে এবার পালটা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি। দুইপক্ষের পালটাপালটি কর্মসূচিতে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে সাজেক পর্যটন সড়ক। বন্ধ পর্যটন, ব্যাহত কৃষিপণ্য পরিবহণ, সংকটে খাদ্য ও জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সব মিলিয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের সংলাপ উদ্যোগও কার্যত অচলাবস্থায়।
জানা যায়, বুধবার ভোর ৬টা থেকে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে ৪৮ ঘণ্টার পাল্টা অবরোধ শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি। অবরোধের সমর্থনে ভোর থেকে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা সাজেক-দীঘিনালা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন।
এর আগে ৩ নভেম্বর সংগঠনটির সদস্য সচিব বিন্দু লাল চাকমা স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, সাজেক পর্যটন সড়ক সচল করা এবং পাহাড়ে সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি। তবে জরুরি সেবা, চিকিৎসাসামগ্রী ও সংবাদকর্মীদের যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত রাখার কথা জানিয়েছেন তারা। বিবৃতিতে বিন্দু লাল চাকমার নাম উল্লেখ থাকলেও যোগাযোগের জন্য কোনো মোবাইল ফোন বা ল্যান্ডলাইনের নম্বর দেওয়া হয়নি। তাই তাদের কারও সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বা কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে সংগঠনটি বলছে, সাজেক পর্যটন সড়ক সচল করা এবং পাহাড়ে সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধের দাবিতে সাজেক পর্যটন সড়কে ৪৮ ঘণ্টার শান্তিপূর্ণ ও সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
তাদের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, আশা ছিল ১ নভেম্বর সাজেক সড়কে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির অবরোধ পালনের পর সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন স্থানীয় জনগণের কথা বিবেচনা করে ২ নভেম্বর থেকে অবরোধ বন্ধ করবে। কিন্তু তারা অবরোধ বন্ধ না করে সশস্ত্র দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমেছে। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ নিরসনে প্রশাসনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
এতে আরও বলা হয়, গত ১১, ১৫ ও ২২ থেকে ৩১ অক্টোবর এবং সর্বশেষ ২ নভেম্বর থেকে চতুর্থ দফায় সাজেক সড়কে অবরোধ চলছে। ধারাবাহিক এ অবরোধের কারণে পর্যটন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যটনশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, পরিবহণ মালিক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অবরোধের কারণে স্থানীয় জুমচাষিরা উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে পারছেন না। ফলে খেতে ও ঘরে উৎপাদিত পণ্য পচে নষ্ট হচ্ছে। পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্টদের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে পড়েছে।
এর বিপরীতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে গত ২২ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। সংগঠন দুটির দাবি, সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে। ২২ অক্টোবর উজোবাজারে হামলার বিচার, নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও রয়েছে তাদের।
গত ২৬ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠক হয়। আলোচনায় পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতার কথা জানানো হলেও সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা নিয়ে মতবিরোধে চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরকারপক্ষ তিন সপ্তাহ সময় চাইলেও আন্দোলনকারীরা পাঁচ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দাবি করেন। এরপর থেকে সংকট নিরসনে নতুন কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ কর্মসূচি চলতে থাকবে বলে জানান সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা।
এদিকে অবরোধের প্রভাব পড়েছে সাজেকের অর্থনীতি ও জনজীবনে। কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। পর্যটন বন্ধ থাকায় হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় স্থবিরতা নেমেছে বলে জানান সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা।
খাদ্য ও জরুরি ওষুধ সরবরাহেও দেখা দিয়েছে সংকট। যদিও আন্দোলনকারীরা কৃষিপণ্য পরিবহণ, শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং জরুরি সেবার যানবাহন চলাচলে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, তবু পাল্টা অবরোধে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরছে না বলে জানান সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা।
অন্যদিকে দুইপক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়লেও স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান।
সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, অবরোধে দীঘিনালা-সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক ও শান্ত আছে। এ পর্যন্ত অবরোধের ফলে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
