পরিবারের সঙ্গে খাবার খেলে কমে হতাশা: গবেষণা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এক সময়ে পরিবারের সবাই এক সঙ্গে বসে খাবার খাওয়া ছিলো পরিবারিক ঐতিহ্য। খাবার খেয়ে পেট ভরার থেকে এক সঙ্গে বসে খাবার খাওয়াই ছিলো সবচেয়ে বেশি আত্মতৃপ্তির। বড় থেকে ছোট; পরিবারের সবাই খাবারের টেবিলেই খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে সুখ-দুঃখ, আনন্দ সবকিছুই ভাগাভাগি করে নিত। কিন্তু বর্তমান ব্যস্ত জীবনে এসব ঐতিহ্য কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে।
আধুনিক যুগে টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ও অফিসের ব্যস্ততার কারণে পরিবারের সঙ্গে বসে খাবার খুব কম মানুষ খায়। এখন যে যার মতো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে খায়। সন্তানেরা তাদের নিজেদের মতো টিভি কিংবা মোবাইল ফোন দেখে খাবার খায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের সঙ্গে খাবার খাওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারি। বিশেষজ্ঞরা এই অভ্যাস পুনরায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত কারো সঙ্গে খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনোমি অ্যান্ড বিহেভিয়রাল সায়েন্স বিভাগের প্রফেসর জন এমানুয়েল ডি নেভ বলেন, সম্পর্ক মজবুত এবং বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়া অন্যতম এবং মৌলিক উপাদান।
পরিবারের সঙ্গে খাওয়া কী হতাশা কমায়?
বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এক সঙ্গে খাবার খাওয়া এবং খাবার ভাগাভাগি করে নেওয়া মানসিক স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে। জেজিয়াং প্রভিনশিয়াল সেন্টারের গবেষক জেনয়ি ওয়াং চীনে ৬০ বছর এবং তার বেশি বয়সি ৯,৩৬১ জন নারীর ওপর গবেষণা করেছেন। দেখা গেছে যারা একা একা খাবার খান তারা হতাশায় সবচেয়ে বেশি ভোগেন। গবেষণাকালে অংশগ্রহণকারী নারীদের অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত দিক কিংবা একাকিত্বের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরেও ফলাফল অপরিবর্তিত ছিলো। অন্য আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫-৭৪ বছর বয়সি বৃদ্ধরা তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও একা একা খাবার খান। তাদের মধ্যে হতাশায় ভোগার ঝুঁকি যারা নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে খায় তাদের তুলনায় ৫ গুণ বেশি।
খাবার ভাগাভাগি করে খেলে আত্মতৃপ্তি বাড়ে
ওয়াল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের তথ্য অনুসারে, খাবার এক সঙ্গে এবং ভাগাভাগি করে খেলে সম্পর্কের ভীত মজবুত হয়। ২০২৪ সালের এক রিপোর্টের তথ্যানুযায়ী, গবেষকরা প্রায় ১৫০,০০০ মানুষকে জিজ্ঞাসা করেছে তারা গত এক সপ্তাহে পরিবারের কিংবা পরিচিত কারো সঙ্গে দুপুরের লাঞ্চ বা রাতের ডিনার করেছে কিনা। ফলাফলে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত কারো সঙ্গে খেয়েছেন তারা মানসিকভাবে অন্যদের তুলনায় সুস্থ রয়েছেন। তবে গবেষণায় এটি পুরোপুরিভাবে প্রমাণিত নয় যে, শুধুমাত্র একসঙ্গে খাবার খেলেই ডিপ্রেশন কিংবা একাকিত্ব দূর করা সম্ভব। খাবার একসঙ্গে এবং ভাগাভাগি করে খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়, আত্মতৃপ্তি আসে।
ভালো সঙ্গ খাবারের টেস্ট আরো বাড়িয়ে দেয়
একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার সুফল কেবল মানসিক সুস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজিক্যাল আর্থোপোলজিস্ট রবিন ডানবারের মতে, খাবার খাওয়ার সময় শরীরে এন্ডোরফিন নামক এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হতে পারে। এই পদার্থটি সুখ ও সন্তুষ্টির অনুভূতি জাগায়। এবং মানুষের মধ্যকার বন্ধন দৃঢ় করতে সাহায্য করে। পেনিসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এরিকা বুথবি এবং তার সহযোগী অন্য আরেকটি গবেষণায় আবিষ্কার করেন অন্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে চকলেট খেলে সেটি মানসিক ভাবে আরোও উপভোগ্য করে তোলে।
কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি একে অপরের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খায়
বিশ্বজুড়ে সবাই মিলে বা একত্রে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাসের ক্ষেত্রে বেশ বড় ধরণের পার্থক্য দেখা যায়। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাপানে সপ্তাহে চার বারেরও কম মানুষ একসঙ্গে খাবার খায়, আমেরিকায় ৭-৮ বার এবং ইতালিতে তা ৯ বারেরও বেশি। ইতালিতে পারিরারিক এবং সামাজিকভাবে সবচেয়ে বেশি এক সঙ্গে খাবার খাওয়ার জন্য গভীরভাবে সংযুক্ত।
দিন দিন পরিবারের সঙ্গে খাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। কেউ ব্যস্ততার কারণে একসঙ্গে খায় না কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে একা একা খায়; গবেষণায় এমন তথ্যই উঠে এসেছে। আমাদের উচিত মানসিকভাবে সুস্থ্য থাকতে,একাকিত্ব দূর করতে এবং পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে কারোর না কারোর সঙ্গে বসে নিয়মিত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা।
