Logo
Logo
×
   

ডাক্তার আছেন

ডায়াবেটিস ও কিডনি: নীরব ক্ষতি ঠেকাবেন যেভাবে

Icon

অধ্যাপক ডা. মো. মাকসুদুর রসুল

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪০ পিএম

ডায়াবেটিস ও কিডনি: নীরব ক্ষতি ঠেকাবেন যেভাবে

ফাইল ছবি

ডায়াবেটিস এখন আর শুধু একটি রোগ নয়, ইদানীং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় এক স্বাস্থ্য-চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিন দিন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ডায়াবেটিসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি অনেক সময় বছরের পর বছর কোনো বড় উপসর্গ ছাড়াই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর মধ্যে কিডনি অন্যতম।

অনেকেই মনে করেন, কিডনি রোগ হলে প্রস্রাব কমে যাবে, শরীর ফুলে যাবে কিংবা কোমরে ব্যথা হবে। বাস্তবে ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগের শুরুতে এসবের প্রায় কিছুই থাকে না। রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে থাকেন, অথচ ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। এ কারণেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির কিডনি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়াবেটিস কীভাবে কিডনি নষ্ট করে?

আমাদের কিডনিতে অসংখ্য সূক্ষ্ম রক্তনালি থাকে, যেগুলো রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে এসব সূক্ষ্ম রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং ধীরে ধীরে কিডনির ফিল্টারিং ক্ষমতা নষ্ট হতে থাকে। প্রথম দিকে প্রস্রাবে অল্প পরিমাণে অ্যালবুমিন বের হতে শুরু করে। বাইরে থেকে এর কোনো লক্ষণ বোঝা যায় না। পরবর্তী সময়ে প্রস্রাবে প্রোটিন বাড়তে পারে এবং ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। শেষপর্যায়ে কেউ কেউ কিডনি বিকল হয়ে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তায় পৌঁছাতে পারেন।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, স্থূলতা, হৃদ্রোগ, পারিবারিকভাবে কিডনি রোগের ইতিহাস—এসব কারণে ঝুঁকি বাড়ে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—ডায়াবেটিস থাকলেই কিডনি নষ্ট হবে এমন নয়। নিয়মিত চিকিৎসা, রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো কিডনি পরীক্ষা করলে কিডনি সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

কিডনি ভালো আছে কি না, তা জানার জন্য দুটি পরীক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—

১. প্রস্রাবে অ্যালবুমিন-ক্রিয়েটিনিন অনুপাত (ইউএসিআর): যার মাধ্যমে প্রস্রাবে অতি অল্প পরিমাণ অ্যালবুমিন বের হচ্ছে কি না, তা বোঝা যায়।

২. ইজিএফআর: রক্তের ক্রিয়েটিনিনসহ অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে কিডনি কতটা কার্যকরভাবে রক্ত পরিশোধন করছে, তার একটি আনুমানিক হিসাব পাওয়া যায়।

তাই ডায়াবেটিসের রোগীর নিয়মিত ইউএসিআর ও ইজিএফআর পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর থেকেই কিডনি পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

কিডনি রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?

প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা। তবে শুধু সুগার নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না। রক্তচাপও যথাযথ মাত্রায় রাখতে হবে। বর্তমানে ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের চিকিৎসায় কিছু ওষুধ কিডনি সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। 

যেমন এসিই ইনহিবিটর/এআরবি, বিশেষ করে প্রস্রাবে অ্যালবুমিন থাকলে; এবং উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে এজিএলটি২ ইনহিবিটর কিডনি ও হৃদ্যন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্টও উপকারী হতে পারে। তবে এসব ওষুধ কার জন্য উপযুক্ত, কী মাত্রায় দিতে হবে এবং কখন বন্ধ বা পরিবর্তন করতে হবে, তা কিডনির অবস্থা ও অন্যান্য রোগ বিবেচনা করে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

খাবার ও জীবনযাপনেও সতর্কতা জরুরি। ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগে খাবার নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। সবার জন্য একই ধরনের খাদ্যতালিকা প্রযোজ্য নয়। তবে অতিরিক্ত লবণ, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস পরিহার করা জরুরি। নিয়মিত হাঁটা বা উপযুক্ত শারীরিক পরিশ্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার এবং পর্যাপ্ত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—নিজে থেকে ব্যথার ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে কিছু এনএসএআইডি জাতীয় ব্যথানাশক দীর্ঘদিন বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে গ্রহণ করলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। ডায়াবেটিসের রোগীদের তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক গ্রহণ করা উচিত নয়।

কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে কি আর কিছু করার থাকে না?

কিডনি রোগের যেকোনো পর্যায়েই চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি ধীর করা যায়। বরং কিডনি রোগ যত দ্রুত শনাক্ত হবে, তত বেশি সময় কিডনিকে রক্ষা করার সুযোগ থাকবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মানুষ সাধারণত কিডনি রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর পরীক্ষা করান। অথচ তখন অনেক সময় কিডনির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়ে যায়। ডায়াবেটিসের রোগীর কিডনি পরীক্ষা করার জন্য কিডনি ব্যথা হওয়া বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ নয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ মানে চোখ, হৃদ্যন্ত্র, স্নায়ু ও কিডনিকে রক্ষা করা। প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগীর মনে রাখা উচিত— ‘সুগার নিয়ন্ত্রণ করুন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করুন, নিয়মিত ইউএসিআর ও ইজিএফআর পরীক্ষা করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনি-সুরক্ষাকারী চিকিৎসা নিন।’



অধ্যাপক ডা. মো. মাকসুদুর রসুল

মেডিসিন ও কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ 

আলোক হাসপাতাল, মিরপুর-৬, ঢাকা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম