আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের কবলে বিশ্ব, কোন দেশের কত?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, সাধ্যের বাইরে বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে তাদের মধ্যে।
ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে বিক্ষোভের কিছু ঘটনা সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপ নিয়েছে। তবে অনেক বিক্ষোভই শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের মধ্যেই এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের আর্থিক সংকট নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকার এ সংকট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ায় অনেক ইউরোপীয় দেশ গভীর ঋণসংকটে পড়েছে। সেই ঋণের সুদও দিন দিন বাড়ছে।
ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকার ঋণের সুদ পরিশোধে যত বেশি অর্থ ব্যয় করবে, বিক্ষোভকারীদের দাবির মুখে থাকা স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো খাতে ব্যয়ের জন্য তত কম অর্থ অবশিষ্ট থাকবে।
আলজাজিরার এক ভিজ্যুয়াল বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, সরকার কীভাবে ঋণ নেয়, সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের অবস্থান কোথায় এবং ঋণের সুদ পরিশোধে বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো কত ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে।
সরকার কীভাবে ঋণ নেয়?
সাধারণ মানুষ যেভাবে ঋণ নেন, সরকারও অনেকটা একই পদ্ধতিতে ঋণ নেয়। তবে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে।
এর বিনিময়ে সরকার বন্ড ক্রেতাদের সুদ দেয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
১০ বছর মেয়াদি বন্ড হলো এমন এক ধরনের ঋণ, যা সরকার এক দশক পর পরিশোধ করে। এ বন্ডের ইল্ড বা ফলন হলো ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা যে মুনাফা পান। ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি দেশের সক্ষমতা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের আস্থার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে এটি বিবেচিত হয়।
বিষয়টি যেভাবে কাজ করে
সরকার ঋণ নেয়: একজন বিনিয়োগকারী ১০ বছর মেয়াদি একটি বন্ড কিনতে ১০০ ইউরো দেন।
সরকার সুদ দেয়: পরবর্তী ১০ বছর প্রতি বছর বিনিয়োগকারী নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ পান। সুদের হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ হলে বছরে ২ ইউরো ৫০ সেন্ট করে মোট ২৫ ইউরো সুদ পাবেন। আর সুদের হার ৫ শতাংশ হলে বছরে ৫ ইউরো করে ১০ বছরে মোট ৫০ ইউরো পাবেন।
সরকার মূল অর্থ ফেরত দেয়: ১০ বছর শেষে বিনিয়োগকারী তার মূল ১০০ ইউরো ফেরত পান।
ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে কী হয়?
বন্ডের দাম কমে গেলে এর ইল্ড বা ফলন বেড়ে যায়। ফলে সরকারের জন্য ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। কোনো পরিবারের বাড়ির ঋণের সুদের হার বেড়ে গেলে যেমন মাসিক ব্যয় বাড়ে, তেমনি সরকারেরও সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে স্কুল, হাসপাতাল ও সড়কের মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়ের জন্য অর্থ কমে যায়।
ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার ২০০০-এর দশকের শুরুর পর আর ৫ শতাংশের মতো উচ্চ পর্যায়ে ওঠেনি।
২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটাপন্ন দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদ দিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছিল।
বর্তমানে ফ্রান্স ১০ বছর মেয়াদি ঋণ নিতে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। বিপরীতে জার্মানির ক্ষেত্রে এ হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। দুই দেশের সুদের হারের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো, ফ্রান্সকে ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফা চাইছেন।
ইউরোজোনের দেশগুলো ও যুক্তরাজ্যের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হারের তুলনায় দেখা যায়, ফ্রান্সকে এখন ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। অথচ ইউরোজোনের ঋণসংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ছিল এই দুটি দেশ। ইউরোর বাইরে থাকা যুক্তরাজ্যেই কেবল এ হার ফ্রান্সের চেয়ে বেশি।
সবচেয়ে বেশি ঋণ কোন দেশগুলোর?
সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ।
বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারে ঋণ নেওয়ার সুবিধা পায় যুক্তরাষ্ট্র। বৈশ্বিকভাবে ডলারের ব্যাপক চাহিদা দেশটির সরকারি ঋণের প্রতিও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধরে রাখতে সহায়তা করে। তবে দেশটির ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাও সীমাহীন নয়।
এরপর রয়েছে চীন। দেশটির সরকারি ঋণ ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। জাপানের ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার। প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি—১৯৯ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ।
বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির ঋণ ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ইতালির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার হলেও দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ, অর্থনীতির আকারের তুলনায় ইতালির ঋণের বোঝা ফ্রান্সের চেয়ে বেশি।
অন্যদিকে জার্মানির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির জিডিপির মাত্র ৬৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ বেড়ে জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকা দেখুন
ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার
সরকারি ঋণের পাশাপাশি পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণও বাড়ছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে মোট ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি ডলার বেড়ে ৩৬৫ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এই ঋণের মধ্যে রয়েছে সরকার, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ।
বিশ্বের প্রতিটি মানুষের হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে।
এই বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধ করাও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।
এই অর্থ বিশ্বের সামরিক খাতে ব্যয় হওয়া ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ব্যয় হওয়া ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয় হওয়া ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারের চেয়েও বেশি।
সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে জনসেবামূলক খাতে। স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো খাতে ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে অর্থ কমে আসে। সুদের বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে কর বাড়াতে অথবা সরকারি ব্যয় কমাতে হতে পারে।
এ ছাড়া সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেলে বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বাড়তে পারে। ফলে সরকারি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

