এলএনজি বাণিজ্যে ৫ কোম্পানির সিন্ডিকেট, প্রতি কার্গোতে গচ্চা ৪০ লাখ ডলার
Advertisement
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলএনজি কেনায় প্রতিযোগিতা কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে। গত ছয় মাসে বাংলাদেশ ৩৪ কার্গো এলএনজি কিনলেও এর ৩১টিই সরবরাহ করেছে মাত্র পাঁচটি কোম্পানি। আন্তর্জাতিক সূচকের (জেকেএম) চেয়ে বেশি দামে এসব কার্গো কিনতে গিয়ে প্রতি চালানে গড়ে ৪০ লাখ ডলারের বেশি অতিরিক্ত অর্থ গচ্চা দিচ্ছে বাংলাদেশ। ফলে বিলিয়ন ডলারের এলএনজি ব্যবসা পাঁচ কোম্পানির সিন্ডিকেটের কবজায় চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অতিরিক্ত এই আর্থিক ক্ষতি এড়াতে এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে স্পট মার্কেটকে নিরুৎসাহিত করে অন্তত ৫টি নতুন কোম্পানির সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির পথে হাঁটছে সরকার।
এদিকে টানা দেড় মাসের বেশি চলা সংকটের পর সোমবার রাত বা মঙ্গলবার সকাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ আরও ২০ কোটি থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট বাড়াতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। ২০-২৫ দিনের এলএনজি আমদানি অনেকটাই নিশ্চিত হওয়ায় শিল্পকারখানায় এই বাড়তি গ্যাস দিতে আগ্রহী সংস্থাটি। তবে কয়লাভিত্তিক আদানি ও আরএনপিএল-এর দুটি বিদ্যুৎ ইউনিট বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই বাড়তি গ্যাসের বড় অংশ নিজেদের অনুকূলে নিতে আগেভাগেই তদবির শুরু করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে ৩৪ কার্গো এলএনজি কিনেছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে টোটাল এনার্জিস সর্বোচ্চ ৯টি, বিপি সিঙ্গাপুর ৭টি, আরামকো ট্রেডিং ৬টি, ভিটল এশিয়া ৫টি, পসকো ইন্টারন্যাশনাল ৪টি, গানভর সিঙ্গাপুর ২টি এবং বিজিএন ইন্টারন্যাশনাল ১টি কার্গো সরবরাহ করেছে। জুলাই পর্যন্ত স্পট ও চুক্তির আওতায় এলএনজি কেনা বাবদ বাংলাদেশকে বিল পরিশোধ করতে হয়েছে ২৬৭ কোটি ৭১ লাখ ৯৭ হাজার ২২৬ ডলার।
স্পট মার্কেট থেকে কার্গো সরবরাহের জন্য ২৯টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত থাকলেও দরপত্রে অংশ নেয় মাত্র ৫-৬টি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অধিকাংশ কোম্পানির নিজস্ব সক্ষমতা নেই। তাছাড়া বকেয়া বিল পরিশোধের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেও অনেক কোম্পানি অংশ নেয় না। যেমন: ২০২৩ সালে কার্গো সরবরাহ করে সময়মতো বিল পায়নি জাপানের জেরা। এসব কারণে স্পট মার্কেটে প্রতিযোগিতা না থাকায় বাংলাদেশকে জেকেএম (জাপান-কোরিয়া মার্কার) সূচকের চেয়ে ১ থেকে ২ ডলার বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের জন্য স্পট মার্কেটের দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুরের দর ছিল প্রতি ইউনিট ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার, অথচ তখন জেকেএম মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ০৯ ডলার। এতে এক কার্গোতেই সরকারকে ৯০ লাখ ডলারের বেশি অতিরিক্ত দিতে হয়েছে। একইভাবে ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য ভিটল এশিয়া দর দিয়েছে ২৬ দশমিক ৬৬ ডলার, যেখানে জেকেএম-এর দর প্রায় ২৫ ডলার। মাত্রাতিরিক্ত দামের কারণে ৯ সেপ্টেম্বর ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অক্টোবরের জন্য প্রস্তাবিত দুটি কার্গোর অনুমোদন দেয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্পট মার্কেটে টোটাল এনার্জিস জেকেএম-এর চেয়ে ২ ডলার বেশি দাম নিলেও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে মাত্র ৬ সেন্ট প্রিমিয়ামে ১৮টি কার্গো দিতে সম্মত হয়েছে। এ কারণে সরকার এখন স্পট থেকে সরে চুক্তির দিকে ঝুঁকছে। বর্তমানে কাতার এনার্জি, ওকিউ ট্রেডিং, এক্সিলারেট এনার্জি, আরামকোসহ ৭টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। এর বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইআরএস, সুইজারল্যান্ডের ট্রাফিগুরা, বিপি, অস্ট্রেলিয়ার উডসাইড এনার্জি এবং জাপানের জেরার সঙ্গে আগামী জুন পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে পেট্রোবাংলা। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে কাতার ও ওমান তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিয়মিত কার্গো সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সরকারের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেছেন, বাধ্য না হলে স্পটে এলএনজি কিনতে আগ্রহী নয় সরকার। তাই স্পট থেকে না কিনে অন্য কোনোভাবে এলএনজি কেনা যায় কি না, তার সব পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, আগামীকাল রাতে পসকোর একটি এলএনজি কার্গো এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে পৌঁছাবে। এরপর আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নিয়মিত এলএনজি আমদানির শিডিউল রয়েছে। অক্টোবরে ১০টি কার্গো লাগবে, যার মধ্যে ৬টি এরই মধ্যে কেনা হয়েছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক ২৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যার মধ্যে এলএনজি থেকে আসছে ৭০ কোটি ঘনফুট। কাল রাত বা মঙ্গলবার থেকে মোট সরবরাহ বেড়ে ২৫০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে।
বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে ৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও পিডিবি তা ১০০ কোটিতে উন্নীত করার চাপ দিচ্ছে। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাস সংকট শুরু হয়। ৬ আগস্ট টার্মিনালটি সচল হলেও কার্গোর অভাব ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এতদিন সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে।




-6aa15e985c489.jpg)

