গয়না ছাড়াও যেসব কাজে ব্যবহার হয় স্বর্ণ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বর্ণের কথা উঠলেই প্রথমে মনে আসে গয়নার কথা। হাজার বছর ধরে অলংকার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মূল্যবান এই ধাতু। নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবেও বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের কদর রয়েছে। এ কারণে অনেকেই স্বর্ণের বার ও কয়েন কিনে রাখেন।
তবে গয়না তৈরি কিংবা বিনিয়োগের বাইরেও নানা কাজে ব্যবহার করা হয় স্বর্ণ। স্মার্টফোন, কম্পিউটার থেকে শুরু করে মহাকাশযান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে রয়েছে এই ধাতুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এমনকি বিশেষ কিছু খাবার সাজাতেও ব্যবহার করা হয় খাওয়ার উপযোগী স্বর্ণ, যা ‘এডিবল গোল্ড’ নামে পরিচিত।
স্বর্ণের বহুমুখী ব্যবহারের পেছনে রয়েছে এর বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য। এটি সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে এবং একে অত্যন্ত পাতলা পাত কিংবা সূক্ষ্ম তারে রূপ দেওয়া সম্ভব।
চলুন, গয়নার বাইরেও স্বর্ণের নানা ব্যবহার সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
খাবারেও ব্যবহার হয় স্বর্ণ
স্বর্ণ শুধু অলংকার হিসেবে পরা হয় না, বিশেষ কিছু খাবারেও ব্যবহার করা হয়। এসব খাবারে সাধারণত ২২ থেকে ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধ স্বর্ণের অত্যন্ত পাতলা পাত ব্যবহার করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুশি, মিষ্টি, চকলেট, কেক, আইসক্রিমসহ নানা বিলাসবহুল খাবার সাজাতে ব্যবহার করা হয় খাওয়ার উপযোগী স্বর্ণের পাত, যা ‘এডিবল গোল্ড লিফ’ নামে পরিচিত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহারের জন্য স্বর্ণ ‘ই১৭৫’ নামে অনুমোদিত খাদ্য সংযোজক হিসেবে পরিচিত।
তবে স্বর্ণ খেলে শরীরের বিশেষ কোনো উপকার হয় কিংবা পুষ্টি পাওয়া যায়, এমন প্রমাণ নেই। ধাতব স্বর্ণের দ্রাব্যতা খুব কম হওয়ায় মানুষের পরিপাকতন্ত্রে এটি সাধারণত শোষিত হয় না। মূলত খাবারের সৌন্দর্য বাড়ানো ও বিলাসিতার প্রকাশ হিসেবেই স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়।
দামি হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার ও পানীয় আকর্ষণীয় করে তুলতে স্বর্ণের পাত, ছোট টুকরা কিংবা গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় মিষ্টি সাজাতে স্বর্ণ ও রুপার পাত ব্যবহারের দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। এগুলো সাধারণভাবে ‘ভারক’ বা ‘ওয়ার্ক’ নামে পরিচিত।
খাবারে স্বর্ণ ব্যবহারের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালে ‘পার্টিকলস অ্যান্ড ফাইবার টক্সিকোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ইঁদুরের ওপর ৯০ দিনের এক গবেষণায় দেখা যায়, ‘ই১৭৫’ খাওয়ানোর পর তাদের যকৃৎ, প্লীহা কিংবা অন্ত্রে সরাসরি কোনো ক্ষতি শনাক্ত হয়নি। তবে অন্ত্রের জীবাণুর গঠন ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। মানুষের স্বাভাবিক গ্রহণমাত্রার চেয়ে বেশি স্বর্ণ খাওয়ানো স্ত্রী ইঁদুরের অন্ত্রে হালকা প্রদাহও দেখা গিয়েছিল।
মোবাইল, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন যন্ত্রে স্বর্ণ
হাতের স্মার্টফোনটির ভেতরেও রয়েছে স্বর্ণ, যদিও এর পরিমাণ খুবই সামান্য। কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সার্কিট বোর্ড, সংযোগকারী, সুইচ ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সংযোগস্থলেও এই ধাতু ব্যবহার করা হয়।
এর প্রধান কারণ, স্বর্ণ বিদ্যুৎ পরিবহনে কার্যকর এবং সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। ফলে বৈদ্যুতিক সংযোগ দীর্ঘদিন সচল রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কম্পিউটার ও যোগাযোগের সরঞ্জামসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে স্বর্ণের ব্যবহার থাকলেও একটি যন্ত্রে এর পরিমাণ সাধারণত খুব কম। তবে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদিত হওয়ায় সব মিলিয়ে এই খাতে স্বর্ণের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।

এ কারণে পুরোনো মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে পুনরায় ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এতে মূল্যবান ধাতুর অপচয় কমানোর পাশাপাশি ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও সহায়তা পাওয়া যায়।
মহাকাশেও কেন প্রয়োজন স্বর্ণ?
মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তিতে স্বর্ণের ব্যবহার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণ আলো ও তাপ বিকিরণ প্রতিফলিত করতে পারে এবং সহজে এর উজ্জ্বলতা নষ্ট হয় না। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের আয়নায় স্বর্ণের অত্যন্ত পাতলা প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে অবলোহিত বা ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে স্বর্ণ কার্যকর। এই আলো শনাক্ত করার মাধ্যমে জেমস ওয়েব মহাবিশ্বের দূরবর্তী নক্ষত্র, ছায়াপথ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করে।
মহাকাশচারীদের হেলমেটেও ব্যবহার করা হয় স্বর্ণ। নাসার তথ্য অনুযায়ী, হেলমেটের সামনের স্বচ্ছ অংশে স্বর্ণের পাতলা প্রলেপ থাকে। এটি সূর্যের তীব্র আলো ও ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে মহাকাশচারীদের সুরক্ষায় সহায়তা করে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা এবং ক্ষয় প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের কারণে মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক সংযোগেও স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়।
রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় স্বর্ণের ব্যবহার
চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বর্ণের ব্যবহার নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘গোল্ড সল্ট’ নামে পরিচিত স্বর্ণের কিছু যৌগ একসময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা বাতজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে আরও কার্যকর ওষুধ সহজলভ্য হওয়ায় এ ক্ষেত্রে স্বর্ণের ব্যবহার অনেক কমেছে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বর্ণের নতুন ব্যবহার নিয়েও গবেষণা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অতি ক্ষুদ্র স্বর্ণকণা বা ‘গোল্ড ন্যানোপার্টিকল’ ব্যবহার করে রোগ শনাক্ত করা, শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। তবে এসব ব্যবহারের অনেকগুলো এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে।
কিছু রোগ নির্ণয়ের দ্রুত পরীক্ষার কিটেও স্বর্ণকণা ব্যবহার করা হয়। এসব কিটে ফলাফল বোঝাতে যে রঙিন রেখা দেখা যায়, তা তৈরিতে স্বর্ণের অতি ক্ষুদ্র কণা ভূমিকা রাখতে পারে।
দাঁতের চিকিৎসায়ও দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ ব্যবহার হয়ে আসছে। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সহজে ক্ষয় না হওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে দাঁত মেরামত এবং পুনর্গঠনে স্বর্ণ ও এর সংকর ধাতু ব্যবহার করা হয়।
তবে স্বর্ণের উচ্চমূল্য এবং বিকল্প উপকরণের সহজলভ্যতার কারণে বর্তমানে দাঁতের চিকিৎসায় এর ব্যবহার আগের তুলনায় কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ মজুত রাখে কেন?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণও রিজার্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।
একসময় অনেক দেশের মুদ্রাব্যবস্থা সরাসরি স্বর্ণের মজুতের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা প্রচলিত না থাকলেও বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক সম্পদের একটি অংশ স্বর্ণ হিসেবে ধরে রাখে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের মজুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। দেশটির মজুতের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন, যা ৮১ লাখ ৩৩ হাজার কিলোগ্রামের বেশি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৬ হাজার ৪০০ টন স্বর্ণ ছিল। এসব দেশের বৈদেশিক রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ ৭০ শতাংশেরও বেশি।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনও স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ কিনেছে এবং বৈদেশিক রিজার্ভে এর পরিমাণ বাড়িয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে চীনের স্বর্ণের মজুত ছিল প্রায় ২ হাজার ২৭৯ টন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটি আরও প্রায় ১৯ টন স্বর্ণ কেনে। এর আগে ২০২৩ সালেও চীন প্রায় ৮৮ টন স্বর্ণ কিনেছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে স্বর্ণের মজুত রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বৈদেশিক সম্পদে বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মূল্য সংরক্ষণ করা। তবে স্বর্ণের দাম ওঠানামা করে বলে এর বাজারমূল্যও পরিবর্তিত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
