স্বপ্নের ইউরোপে প্রবাসজীবন: আয় আছে স্বস্তি নেই
Advertisement
আবদুল আহাদ সালমান
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উন্নত জীবন, ভালো আয়, নিরাপদ ভবিষ্যৎ আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ পাড়ি জমান ইউরোপে। তাঁদের অনেকের কাছে ইউরোপ মানেই উচ্চ বেতন, উন্নত নাগরিক সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ত জীবন। কিন্তু প্রবাসে পা রাখার পর অনেকেই বুঝতে পারেন, উন্নত দেশের সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি সেখানে টিকে থাকার লড়াইটাও কঠিন।
বিশেষ করে পর্তুগালের মতো দেশে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য প্রতিদিনের খরচ মেটানোই বড় চ্যালেঞ্জ। বাইরে থেকে প্রবাসজীবন যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে অনেকের জীবন ততটাই সংগ্রামমুখর।
বেতনের বড় অংশ চলে যায় বাড়িভাড়ায়
পর্তুগালে ২০২৬ সালে মাসিক ন্যূনতম বেতন ৯২০ ইউরো। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ১১ শতাংশ কর্তনের পর সাধারণ হিসাবে হাতে থাকে প্রায় ৮১৮.৮০ ইউরো। তবে কর ও অন্যান্য কর্তনের কারণে প্রকৃত প্রাপ্তি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
অন্যদিকে, লিসবন ও আশপাশের এলাকায় বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ইন্টারনেট, খাবার, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায়। সন্তান থাকলে তাদের শিক্ষা, যত্ন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচও যোগ হয়।
একজনের আয়ে পুরো পরিবারের ব্যয় চালাতে হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। মাসের শুরুতেই বেতনের বড় অংশ বাড়িভাড়ায় চলে গেলে বাকি টাকা দিয়ে সংসার চালানো, দেশে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানো কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তখন প্রশ্ন জাগে, উন্নত জীবনের আশায় হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যে দেশে আসা, সেই জীবন কি সত্যিই সবার নাগালে আসে?
নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্যের বাসায় ভাড়া
প্রবাসজীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ আবাসনসংকট। দেশে অনেকের নিজস্ব বাড়ি ছিল, ছিল একাধিক ঘর কিংবা বড় বাসা। নিজের বাড়িতে নিজের মতো করে থাকার অভ্যাসও ছিল। কিন্তু ইউরোপে এসে তাঁদের অনেককে অন্যের বাসায় একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়।
খরচ কমাতে অনেকে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে রান্নাঘর ও বাথরুম ভাগাভাগি করেন। কেউ একই ঘরে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে থাকেন। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানসিক স্বস্তি ও স্বাধীনতা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে।
ব্যাচেলরদের জীবনও সহজ নয়। দীর্ঘ সময় কাজ করার পাশাপাশি নিজের খাবার তৈরি, কাপড় ধোয়া, ঘরের কাজ সামলানো এবং বাড়িভাড়া ভাগ করে নেওয়ার হিসাব রাখতে হয়। অর্থ সঞ্চয়ের আশায় একসঙ্গে কয়েকজন থাকলেও ব্যক্তিগত স্বস্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ কমে যায়।
সংসার চালাতে কাজে নামতে হয় দুজনকেই
অভিবাসনের পর অনেক পরিবারের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে। দেশে কোনো কোনো পরিবারে স্বামী উপার্জন করতেন, আর স্ত্রী সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনা করতেন। পরিবারের দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতার জন্য গৃহকর্মীও থাকতেন।
কিন্তু বিদেশে এসে সংসারের ব্যয় সামলাতে অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কাজে নামতে হয়। সন্তান থাকলে তাদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করাও বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। কাজের সময়ের সঙ্গে শিশুর যত্ন, স্কুলের সময়সূচি ও পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেলাতে গিয়ে বাড়ে মানসিক চাপ।
কেউ কাজ না পেয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন, কেউ এক কাজ ছেড়ে আরেক কাজের সন্ধান করেন। আবার অনেকে নিজের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ না পেলেও সংসারের প্রয়োজনে যেকোনো সৎ কাজ বেছে নেন।
পরিস্থিতি এমনও হয়, দেশে যাঁরা কখনো চাকরি করার কথা ভাবেননি, বিদেশে এসে তারাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের আবেদন করেন। সংসারের খরচ মেটাতে পরিবারের একাধিক সদস্যের উপার্জন প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
দেশে গৃহকর্মী রাখতেন, বিদেশে নিজেই শ্রমিক
অভিবাসনের বাস্তবতা বোঝাতে এমন অনেক অভিজ্ঞতা সামনে আসে, যা কারও কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। দেশে কোনো কোনো পরিবারে ঘরের কাজে সহযোগিতার জন্য একাধিক গৃহকর্মী থাকতেন। কিন্তু বিদেশে এসে সেই পরিবারেরই কাউকে অন্যের বাসায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশন, দোকান বা শপিংমলে কাজ কিংবা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।
তবে ঘরের কাজ, রেস্তোরাঁয় কাজ, দোকানে কাজ কিংবা নির্মাণশ্রম—কোনো সৎ পেশাই অসম্মানের নয়। প্রতিটি কাজই সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় এবং সম্মানের যোগ্য।
এখানে মূল পরিবর্তনটি জীবনযাত্রার। দেশে যে কাজ অন্যকে দিয়ে করানো হতো, বিদেশে এসে সেই কাজ নিজেকেই করতে হচ্ছে। আগে যিনি নিজের সুবিধামতো সময় কাটাতেন, এখন তাঁকে কাজের সময়, যাতায়াত ও আয়ের হিসাব মিলিয়ে চলতে হয়।
এটি কারও ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং দেশ বদলালে মানুষের সামাজিক অবস্থান, দায়িত্ব ও জীবনযাপনের ধরন কতটা বদলে যেতে পারে, তারই প্রতিফলন।
তবু মানুষ ইউরোপে আসেন কেন?
এর উত্তর একেকজনের কাছে একেক রকম। কেউ উন্নত ভবিষ্যতের আশায় আসেন, কেউ সন্তানদের ভালো শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে চান। কেউ দেশে কর্মসংস্থানের অভাব কিংবা কম আয়ের কারণে বিদেশে পাড়ি জমান। আবার কেউ রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসতে চান।
অনেকের জন্য অভিবাসন সত্যিই জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। তারা ভালো আয় করেন, পরিবারকে সহযোগিতা করেন, ব্যবসা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থার উন্নতি ঘটান। কেউ কয়েক বছরের পরিশ্রমে বাড়ি কেনেন, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেন।
আবার অনেকের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে যায়। দীর্ঘদিন কাজ করেও সঞ্চয় হয় না। দেশে টাকা পাঠাতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন কমাতে হয়। পরিবার কাছে থাকলে ব্যয় বাড়ে, আর পরিবার দূরে থাকলে তৈরি হয় একাকিত্ব ও মানসিক চাপ।
অর্থাৎ, ইউরোপে আসা মানেই সবার জীবন বদলে যাওয়া নয়। কারও জন্য এটি উন্নতির সুযোগ, কারও জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম, আবার কারও জন্য সুযোগ ও কষ্টের মিশ্র অভিজ্ঞতা।
শুধু বেতন নয়, হিসাব করতে হবে পুরো জীবনের
অভিবাসনের সাফল্য বিচার করতে শুধু মাসিক বেতনের অঙ্ক দেখলে হবে না। একজন মানুষ কত আয় করেন, তার পাশাপাশি তাকে কত বাড়িভাড়া দিতে হয়, পরিবারের পেছনে কত খরচ হয়, কত ঘণ্টা কাজ করতে হয় এবং মাস শেষে কতটা সঞ্চয় থাকে, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
কারও বেতন তুলনামূলক বেশি হলেও আয়ের অধিকাংশ বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে শেষ হয়ে গেলে তার আর্থিক স্বস্তি সীমিত থাকে। অন্যদিকে, কম ভাড়ায় বাসা, স্থায়ী কাজ ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে তুলনামূলক কম আয়েও ভালোভাবে জীবন পরিচালনা করা সম্ভব।
তাই বিদেশে আসার আগে শুধু সম্ভাব্য বেতনের হিসাব করলেই চলবে না। বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয়, কাজের সুযোগ, ভাষাগত দক্ষতা, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষ করে পরিবার নিয়ে আসার ক্ষেত্রে আবাসন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি আগে থেকেই ভেবে রাখা জরুরি। কারণ, একা একজনের জীবনযাত্রার ব্যয় আর চার সদস্যের পরিবারের ব্যয় এক নয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোও জরুরি
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে শুধু ব্যক্তিগত সাশ্রয় দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মানুষের আয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।
পর্তুগালসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়ার চাপ নিয়ে আলোচনা চলছে। এ পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী বাসার সরবরাহ বাড়ানো, শ্রমিকদের আয় ও কর্মপরিবেশ উন্নত করা, শিশুদের যত্ন নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যূনতম বেতন বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না। একই সঙ্গে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য জরুরি ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার উদ্যোগও দরকার। অন্যথায়, আয় বাড়লেও ব্যয়ের চাপে জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
অভিবাসীদের জন্য ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের তথ্য এবং আবাসনসংক্রান্ত সহায়তা নিশ্চিত করাও তাদের নতুন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করতে পারে।
স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তবতাও বুঝতে হবে
মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশে আসেন ভালো থাকার আশায়। কেউ পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চান, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে চান, আবার কেউ নিজের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য পেতে চান। এসব স্বপ্ন খুবই স্বাভাবিক।
কিন্তু উন্নত দেশের নাগরিক সুবিধা আর ব্যক্তিগত জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য এক বিষয় নয়। একটি দেশে উন্নত সড়ক, নিরাপদ পরিবেশ, আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা কিংবা সামাজিক সুরক্ষা থাকলেও সবার পক্ষে সেই দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
যে মানুষটি দেশে নিজের বাড়িতে পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতেন, বিদেশে এসে তাকে যদি বাড়িভাড়া মেটাতে প্রতিদিন হিসাব করতে হয়, অতিরিক্ত কাজ খুঁজতে হয় কিংবা পরিবারের সবাইকে উপার্জনের চাপে থাকতে হয়, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিদেশে আসা ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা প্রবাসজীবন মানেই ব্যর্থতা। বরং এর অর্থ হলো, অভিবাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, জীবনের সাফল্য শুধু বেশি আয় করা কিংবা বেশি ইউরো উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাফল্য হলো নিজের ও পরিবারের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, পর্যাপ্ত খাবার, মানসিক শান্তি, সম্মানজনক জীবন এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।
উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখা অপরাধ নয়। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা, সঠিক পরিকল্পনা করা এবং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের পরিশ্রমের মূল্য থাকবে এবং সাধারণ আয়ের মানুষও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবেন।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (PBCCI) ও সম্পাদক, ইউরোবাংলা

