আমি অর্থে দরিদ্র, মনে নয়
Advertisement
রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:১০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গরীবের সংগ্রাম বেঁচে থাকার সংগ্রাম, বড় লোকের সংগ্রাম ভাল থাকার সংগ্রাম। বিষয়টি যতো সহজভাবে লেখা হয়েছে তত সহজভাবে এর ব্যাখ্যা দেয়া যাবেনা। তবুও আমি বিষয়টির ওপর আলোচনা করব। সদ্য সুইডেনের সংবাদপত্রে এর ওপর লিখেছি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। কেন জেন মনে হলো বাংলাতেও বিষয়টি শেয়ার করতে। ডিসেম্বর মাস সচরাচর বরফে ঢাকা থাকে পুরো সুইডেন। শীতের মাত্রাও বেশ ভয়াবহ হয়।
গাছপালা, রাস্তাঘাট এমনকি ঘরের ছাদের উপরও প্রচুর তুষার জমা থাকে বিধায় সূর্যের আলো না থাকলেও বেশ ফর্সা থাকে দিনের কিছু সময়। এবার বরফ না থাকার কারণে বেশ অন্ধকার এবং ঠাণ্ডা তারপর টিপ টিপ করে বৃষ্টি ঝরছে সকাল, বিকাল ও সন্ধ্যায়, বলতে গেলে একেবারে বাজে ওয়েদার। এমন দিনে বাইরে যেতে কার মন চায়! আজ শনিবার।
মারিয়া আমার স্ত্রী বললো চলো শহরে যাই। উত্তরে বললাম এমন বৃষ্টি ভেজা দিনে বাইরে হাঁটাহাঁটি করে তেমন মজা হবে না। মারিয়া বললো সুইডেনে খারাপ ওয়েদার বলে কথা নেই। তবে খারাপ কাপড় পরা নিয়ে কথা আছে। মানে হাতে মোজা, মাথায় টুপি, পরণে প্রপার শীতের কাপড় এবং বরফের জুতা থাকলে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। কথা না বাড়িয়ে ঝটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে গেলাম স্টকহোম শহরের উদ্দেশ্যে। দশ মিনিট পরে শহরের নানা জায়গা ঘোরাঘুরি করার পর গেলাম স্টকহোমের নামকরা সালুহলে। সালুহল স্টকহোমের বিলাসবহুল গ্রোসারী মার্কেট যেখানে মাছ, মাংস, শাকসবজি সব পাওয়া যায়।
এ ছাড়াও সালুহলের ভেতরে রয়েছে নানা ধরণের রেস্টুরেন্ট। সালুহল গ্রসারী মার্কেটকে বড়লোকদের আড্ডাখানাও বলা যেতে পারে। আমি নিজে বড়লোক নই তবে তাদের অ্যাক্টিভিটিস দেখতে পছন্দ করি।
আজ ইচ্ছে ছিল লাঞ্চটা সেরে নেব তাদের সঙ্গে। খাবারের দাম দেখে মনে হলো পুরো সপ্তাহের বাজার সদাইয়ের জন্য যা প্রয়োজন তার পুরোটাই চলে যাবে। শেষে সালুহলে আর লাঞ্চ করা হলো না। অবশেষে ফিরে এলাম হটোরিয়েট হালেনে যেখানে জিনিসপত্রের দাম বেশ কম তুলনামূলকভাবে। এখানে শুধু মাছের ওপর একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে নাম (Kajsas fiskrestaurang), সুন্দর পরিবেশে বসে দুইজনে বেশ মজা করেই আমাদের লাঞ্চ সেরে নিলাম। সুইডেন বা ইউরোপের বড় লোকদের সমস্যা হলো কিভাবে অর্থ খরচ করবে। কারণ সস্তা খাবার, সস্তা টিকিট কেনা, সস্তা হোটেলে থাকা, অল্প দামে গাড়ি, বাড়ি, বোট বা শপিং করলে তো তাদের অর্থ জীবনেও শেষ হবে না। তাই তারা সবসময় ব্যয়বহুল জায়গা ভ্রমণ করা থেকে শুরু করে বিলাসী জীবন যাপন করে। অন্যদিকে আমাদের মত সাধারণ লোকেরা দামাদামি করা, দশ জায়গা ঘুরে কিছু কেনা, কমপক্ষে পঞ্চাশবার নিজেকে প্রশ্ন করা, যেমন আসলে কি জিনিসটার প্রয়োজন? না কিনলেই কি নয়? পরে কিনলে কেমন হবে? অনেক সময় বিরাট মূল্য হ্রাস দেবে, তাই দেরি করলে কেমন হয় ইত্যাদি। আজকে হটাৎ মনে হলো এতো বছর পরে যে, বড় লোক অর্থ খরচ করে যাতে করে তারা তাদের জীবনকে সুন্দর এবং মধুময় করে কাটাতে পারে।
আর গরীব সারাক্ষণ চিন্তা করে কিভাবে একটু সঞ্চয় করা যায় যাতে অর্থ শেষ না হয়। ভাবনায় ঢুকেছে কোনো উপায় কি নেই এর একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করা? জীবনে বেঁচে থাকার সময়টুকু বলতে গেলে সমান যেখানে বড়লোক বা গরীব বলে কথা নেই। মরতে তো সবাইকে হবে। যেহেতু আমরা গরীবের গ্রুপে পড়েছি সেহেতু সঞ্চয় করার প্রবণতা একটু বেশি। ঠিক আছে, তবে সঞ্চয় করতে গিয়ে নিজের মনকে দরিদ্র করা কি ঠিক? অর্থে দরিদ্র হয়ে বেঁচে থাকা আর মনে দরিদ্র অনুভব করা বা বেঁচে থাকা কিন্ত এক নয়।
যাই হোক না কেনো, আজকের লাঞ্চ দুইজনে একসঙ্গে শেয়ার করে খাবার পর হাতে হাত রেখে বৃষ্টি ভেজা স্টকহোমকে নানাভাবে উপভোগ করার মাঝে কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে গিয়েছে তা জানিনা। তবে নিজেদেরকে মনে দরিদ্র মনে হয়নি সারাদিন এক মূহুর্তের জন্যেও। হঠাৎ মনে হলো বেশ তো আছি, ভালোই আছি। ধন সম্পদে দরিদ্র হতে পারি কিন্তু মনে দরিদ্র নই। বিজয়ের মাসে এমন সুন্দর অনুভূতি আমার আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে।
