ইসলামের দৃষ্টিতে বাল্যবিবাহ
Advertisement
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সমকালীন বিশ্বে ‘বাল্যবিবাহ’ একটি আলোচিত ও সংবেদনশীল বিষয়। সমাজের পরিবর্তন, শিক্ষার বিস্তার এবং মানবাধিকার সচেতনতার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটি আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে ইসলাম কি অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়েকে সমর্থন করে, নাকি এর ভেতরে রয়েছে আরও গভীর শর্ত ও দায়িত্বের ধারণা?
ইসলাম বিয়েকে কেবল একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখে না, বরং এটি একটি দায়িত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেখানে পারস্পরিক অধিকার, মানসিক সামঞ্জস্য এবং পারিবারিক স্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন, তোমরা এতিমদের পরীক্ষা কর, যতক্ষণ না তারা বিয়ের উপযুক্ত বয়সে পৌঁছে, অতঃপর যদি তাদের মধ্যে পরিপক্বতা দেখতে পাও, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে তুলে দাও। (সূরা আন-নিসা, ৬)
এই আয়াত ইসলামী চিন্তায় একটি মৌলিক নীতির ভিত্তি স্থাপন করে বিয়ের জন্য শুধু বয়স নয়, বরং ‘রুশদ’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যবহারিক পরিপক্বতা অপরিহার্য।
রাসুলুল্লাহ সা. এর বাণীতেও একই দিকনির্দেশনা প্রতিফলিত হয়। তিনি বলেন, হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। (সহিহ বুখারি, মুসলিম)
এখানে ‘সামর্থ্য’ শব্দটি কেবল শারীরিক সক্ষমতার সীমায় আবদ্ধ নয়, বরং এটি আর্থিক দায়িত্ব, মানসিক প্রস্তুতি এবং পারিবারিক জীবন পরিচালনার যোগ্যতার সমন্বিত ধারণা।
ইসলামী ফিকহের ইমামগণ এই বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
ইমাম মালিক ইবনে আনাস রহ. , ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস আশ-শাফি’ঈ রহ. এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. তাদের মাজহাবে অভিভাবকের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও, দাম্পত্য জীবন শুরু করার ক্ষেত্রে পরিপক্বতা ও সক্ষমতার ওপর সুস্পষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা আন-নুমান ইবনে সাবিত রহ. এর ফিকহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে, যেখানে বাল্যবয়সে সম্পাদিত বিয়ের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই বিয়ে বহাল রাখা বা বাতিল করার অধিকার রাখে (খিয়ারুল বুলুগ)। এটি ইসলামী আইনে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্মতির গুরুত্বকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো ক্ষতি পরিহার করা। ফিকহের সুপরিচিত নীতিতে বলা হয়, ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিদানও দেওয়া যাবে না।’
এই নীতির আলোকে সমকালীন আলেমরা ব্যাখ্যা করেন, যদি অল্প বয়সে বিয়ে শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক ক্ষতির কারণ হয়, তবে তা শরীয়তের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
ঐতিহাসিক বাস্তবতায় দেখা যায়, অতীত সমাজে বয়স, পরিপক্বতা এবং সামাজিক কাঠামো বর্তমান সময়ের তুলনায় ভিন্ন ছিল। কিন্তু ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্য ন্যায়, কল্যাণ এবং মানবিক মর্যাদা সময়ের সঙ্গে অপরিবর্তিত। ফলে আজকের বাস্তবতায় এই নীতিগুলোর আলোকে বাল্যবিবাহের প্রশ্ন নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশের গুরুত্ব বিবেচনায় বহু ইসলামী চিন্তাবিদ মত দেন যে, বিবাহের জন্য উপযুক্ত বয়স নির্ধারণ করা শরীয়তের মাকাসিদ (উদ্দেশ্য)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারণ এটি ব্যক্তি ও সমাজের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করে।
সবশেষে বলা যায়, ইসলাম বাল্যবিবাহকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে না, বরং বিয়ের ক্ষেত্রে পরিপক্বতা, সক্ষমতা, সম্মতি এবং কল্যাণকে মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই ইসলামের সৌন্দর্য যেখানে শরীয়তের বিধান ও মানবিক বাস্তবতা একসঙ্গে মিলে একটি সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক ও স্থিতিশীল সমাজ নির্মাণের পথ নির্দেশ করে।
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর


