ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম গোশত খাওয়া কি হালাল?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন অনেক বিষয়ের আবির্ভাব ঘটছে, যা অতীতে কেবল কল্পনাই করা যেত। বর্তমান যুগে গবেষণাগারে বা ল্যাবরেটরিতে প্রাণীদেহের কোষ থেকে কৃত্রিম উপায়ে মাংস উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই ল্যাব-গ্রাউন বা কাল্টিভেটেড মিট ব্যাপকভাবে বাজারজাত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাত্যহিক জীবনের নানা নতুন প্রশ্নের মতো এই আধুনিক খাদ্যপণ্যটি খাওয়া শরিয়তসম্মত হবে কি না—তা নিয়ে মুমিন মুসলমানের মনে নানা কৌতূহল ও প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত শরিয়ি বিধান তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন ও মূল প্রসঙ্গ
বর্তমানে গবেষণাগারে গরু বা অন্যান্য জীবিত প্রাণীর কোষ থেকে মাংস উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে তা বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত হতে পারে। জানার বিষয় হলো, ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত এই কৃত্রিম মাংস খাওয়া কি শরিয়তসম্মত হবে?
শরিয়তের মূলনীতি ও বিচার্য বিষয়
ল্যাবরেটরিতে প্রস্তুতকৃত মাংসের হালাল-হারামের বিধান কোনো এক বাক্যে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে এর উৎস, কাঁচামাল এবং প্রস্তুতপ্রণালীর ওপর। তাই শুধু কৃত্রিম উপায়ে তৈরি হয়েছে বলেই কোনো মাংসকে সরাসরি হালাল বা হারাম বলা যাবে না; বরং নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গভীরভাবে যাচাই করা আবশ্যক—
- কোষের উৎস: যে প্রাণী বা জীব থেকে মূল কোষটি সংগ্রহ করা হয়েছে, সে প্রাণীটি শরিয়তের দৃষ্টিতে হালাল হতে হবে। শূকর বা অন্য কোনো হারাম প্রাণীর কোষ থেকে উৎপাদিত মাংস সম্পূর্ণ হারাম হবে।
- সংগ্রহের পদ্ধতি: জীবিত বা মৃত—যে অবস্থাতেই কোষ নেওয়া হোক না কেন, তা যেন শরিয়তসম্মত উপায়ে সংগৃহীত হয়। যেমন—হালাল প্রাণীর ক্ষেত্রে তা শরয়ি নিয়মে জবাইকৃত প্রাণী থেকে হতে হবে। মৃত বা যবাই ছাড়া পশুর কোষ ব্যবহার করা যাবে না।
- অন্যান্য উপাদান ও মাধ্যম: কোষের বংশবৃদ্ধি ও পরিচর্যার জন্য যেসব রাসায়নিক উপাদান, হরমোন বা পুষ্টি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়, তা নাপাক বা হারাম হওয়া যাবে না। যে পাত্রে বা মাধ্যমে এটি চাষ করা হবে, তাও পবিত্র হতে হবে।
- উদ্ভিদজাত বিকল্প: যদি উদ্ভিদ বা ফাঙ্গাস থেকে এই মাংস প্রস্তুত করা হয়, তবে ব্যবহৃত সেই উদ্ভিদ বা উপাদান যেন নেশাজাতীয় বা মানবদেহের জন্য বিষাক্ত বা ক্ষতিকর না হয়।
- স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা: ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই মাংস মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক হলে তা খাওয়া জায়েজ হবে না।
সংক্ষেপে, উপরোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত কোনো নির্দিষ্ট মাংসকে সরাসরি হালাল বা হারাম বলে চূড়ান্ত ফতোয়া দেওয়া যায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত এর হালাল হওয়া নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ তা পরিহার করা বা এড়িয়ে চলাই মুমিনের জন্য নিরাপদ ও সতর্কতার কাজ।
হাদিস ও ফিকহের আলোকে দলিল ও প্রমাণ
সন্দেহজনক ও অস্পষ্ট বিষয় থেকে দূরে থাকার বিষয়ে ইসলাম কঠোর তাগিদ দিয়েছে। খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের মূলনীতি হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, হজরত নোমান ইবনু বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি—
الْحَلَالُ بَيِّنٌ وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ، وَبَيْنَهُمَا مُشَبَّهَاتٌ، لَا يَعْلَمُهَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ، فَمَنِ اتَّقَى الْمُشَبَّهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ...
‘হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দুয়ের মাঝে কিছু সন্দিগ্ধ বিষয় রয়েছে, যা অনেকেই জানে না। সুতরাং যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে নিরাপদ রাখে। আর যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে...।’ (বুখারি ৫২)
لبقائه أي اللحم على الحرمة أي التي هي الأصل إذ حل الأكل متوقف على تحقق الذكاة الشرعية، وبتعارض الخبرين لم يتحقق الحل فبقيت الذبيحة على الحرمة
‘মাংস তার পূর্বের হারাম অবস্থার ওপর বহাল থাকবে। কারণ, খাবার হালাল হওয়াটা শরিয়তসম্মত জবাইয়ের ওপর নির্ভরশীল। আর যখন তা নিশ্চিতভাবে অর্জিত না হয়, তখন হালাল হওয়া প্রমাণিত হয় না; ফলে জবাইকৃত বা প্রস্তুতকৃত বস্তুটি তার মূল হারাম অবস্থার ওপরই থেকে যায়।’ (হাশিয়াতুত ত্বহতাবি আলা মারাকিল ফালাহ, পৃষ্ঠা ৩৫)
পরিশেষে বলা যায়, ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত কৃত্রিম মাংসের বিষয়টি আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর অগ্রগতি হলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে এর হালাল-হারামের মানদণ্ড অত্যন্ত স্পষ্ট। যতক্ষণ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ইসলামি গবেষক ও ফকিহগণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এর উৎপাদন প্রক্রিয়া, কাঁচামাল এবং হালাল কোষের উৎস যাচাই করে চূড়ান্ত সার্টিফিকেট প্রদান না করছেন, ততক্ষণ এ ধরনের সন্দেহজনক খাদ্যপণ্য থেকে দূরে থাকা ইমানের হেফাজত ও তাকওয়ার দাবি রাখে।

