শর্ত কথা বলার কিন্তু মেসেঞ্জারে সালামের জবাব দিলে কি তালাক হবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা রক্ষায় ইসলাম অনেক সুনির্দিষ্ট ও সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছে। কখনো কখনো মানুষ আবেগ বা রাগের বশে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেয়, যা পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের জটিলতার সৃষ্টি করে। তেমনি একটি বিষয় হলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। বর্তমান ডিজিটাল যুগে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মেসেঞ্জার বা চ্যাট ব্যবহার করা হয়। আর এই মাধ্যমেই যদি এমন কোনো শর্তের মুখোমুখি হতে হয়, তবে শরিয়তের বিধান কী হবে—তা জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে মূল মাসআলাটি সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করা হলো।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
এক ব্যক্তি প্রায় এক বছর আগে তার স্ত্রীকে শর্ত দিয়েছিলেন যে, ‘রহমান নামের কোনো লোকের সাথে কথা বললে তুমি তালাক।’ এরপর কয়েক মাস আগে ওই ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মেসেঞ্জারে লিখিত সালাম দেন এবং স্ত্রীও এর লিখিত উত্তর দেন। এখন প্রশ্ন হলো— এভাবে মেসেঞ্জারে লিখিত সালাম আদান-প্রদানের কারণে কি তালাক পতিত হয়েছে?
শরিয়তের বিধান ও সমাধান
আলোচ্য বিবরণ অনুযায়ী, মেসেঞ্জারে লিখিতভাবে সালামের জবাব দেওয়ার কারণে স্ত্রীর ওপর কোনো তালাক পতিত হয়নি।
এর মূল কারণ হলো, ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় ও সাধারণ সামাজিক রীতিনীতি (উরফ) অনুযায়ী, লিখে যোগাযোগ করা বা মেসেজ পাঠানো সরাসরি মুখে কথা বলার অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই কেবল লিখিতভাবে সালামের উত্তর দেওয়ার কারণে শপথ ভঙ্গ হয় না।
তবে এর একটি ব্যতিক্রমী দিকও রয়েছে। স্বামী যখন স্ত্রীকে “কথা বললে তালাক” শর্তটি দিয়েছিলেন, তখন যদি তার স্পষ্ট নিয়ত বা উদ্দেশ্য থাকে যে— মুখে কথা বলা ছাড়াও লিখে বা মেসেজে যোগাযোগ করাকেও এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তবে সে ক্ষেত্রে তালাক পতিত হওয়ার বিধান প্রযোজ্য হবে। নিয়তের ওপর ভিত্তি করে শরিয়তের হুকুম পরিবর্তন হতে পারে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে দলিল ও রেফারেন্স
ইসলামি শরিয়তে শপথ ও কথার সংজ্ঞায় মৌখিক উচ্চারণকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। ফিকহ ও হাদিসের কিতাবে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—
وَلَوْ قَالَ: وَاَللَّهِ لَا أُكَلِّمُ فُلَانًا بِهَذَا الْأَمْرِ فَهَذَا عَلَى الْكَلَامِ بِعَيْنِهِ لَا يَحْنَثُ بِكِتَابٍ وَلَا رَسُولٍ
কেউ যদি বলে, ‘আল্লাহর কসম, আমি অমুকের সাথে এ বিষয়ে কথা বলব না, তবে তা কেবল সরাসরি মুখের কথার ওপরই প্রযোজ্য হবে। এটি লেখা বা কোনো দূতের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর দ্বারা শপথ ভঙ্গ (হানাস) হবে না। (বদায়িউস সানাই, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৮৮)
(الْكَلَامُ) وَالتَّحْدِيثُ (لَا يَكُونُ إلَّا بِاللِّسَانِ) فَلَا يَحْنَثُ بِإِشَارَةٍ وَكِتَابَةٍ كَمَا فِي النُّتَفِ
‘কথা বলা এবং কোনো বিষয়ে কথোপকথন কেবল জিহ্বা বা মুখ দিয়েই হয়ে থাকে। তাই ইশারা বা লেখার মাধ্যমে কথা বলার শপথ ভঙ্গ হয় না, যেমনটি ‘আন-নুতাফ’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। (রদ্দুল মুহতার তথা ফাতাওয়া শামী খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৯৬)
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান প্রযুক্তির যুগে যোগাযোগের নানা মাধ্যম তৈরি হলেও শরিয়তের মৌলিক নীতিগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে। মুখে কথা বলার নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে কেবল চ্যাট বা মেসেজে লিখিত বার্তা আদান-প্রদান দ্বারা সাধারণত তালাক কার্যকর হয় না, যদি না স্বামীর অন্তরে সুনির্দিষ্টভাবে লেখার বিষয়টিও উদ্দেশ্য হিসেবে থাকে। তাই অহেতুক সন্দেহ বা সংশয়ে না ভুগে শরয়ি বিধান মেনে চলা উচিত এবং দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সতর্কতার মাধ্যমেই শান্তি বজায় রাখা শ্রেয়।

