ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার না করলে ইমামের পেছনে নামাজ পড়ার হুকুম কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নামাজ মুসলিম জীবনের অন্যতম প্রধান ইবাদত এবং এর সঠিক নিয়মকানুন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। জামাতে নামাজ আদায়ের সময় ইমামের যোগ্যতা, পবিত্রতা এবং নামাজের বিভিন্ন মাসআলা নিয়ে প্রায়ই সাধারণ মুসল্লিদের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। ইমামের সামান্য ভুল বা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলো মুক্তাদির নামাজের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা জানা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক। নিচে এ বিষয়ে ইসলামের সুনির্দিষ্ট ফিকহি বিধান তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন ও মূল প্রসঙ্গ
নামাজের কোনো নিয়ম-কানুন ভুল করলে তার পেছনে মুক্তাদির নামাজ হবে কি? আর ইমাম যদি ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার না করেন, তাহলে তার পেছনে নামাজ পড়া যাবে কি?
শরিয়তের বিধান ও সমাধান
মুক্তাদির নামাজের শুদ্ধতা মূলত ইমামের নামাজের শুদ্ধতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। ইমামের নামাজ যদি শরিয়তসম্মতভাবে শুদ্ধ হয়, তবে মুক্তাদির নামাজও শুদ্ধ বলে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে, শরিয়তের কোনো ওজর বা ত্রুটির কারণে ইমামের নিজের নামাজই যদি শুদ্ধ না হয়, তবে মুক্তাদিদের নামাজও শুদ্ধ হবে না।
তবে ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার করা বা না করার সঙ্গে ইমামের পেছনে ইকতিদা (ইমামের অনুসরণে নামাজ পড়া) করার শুদ্ধতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। এক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো— ইমাম সাহেব পেশাব-পায়খানা ও অন্যান্য নাপাকি থেকে শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী যথাযথভাবে পবিত্রতা অর্জন করেছেন কি না।
অতএব, ইমাম সাহেব যদি শরিয়তসম্মত উপায়ে পবিত্রতা অর্জন করে নামাজ পড়ান, তবে তার পেছনে ইকতিদা করা সম্পূর্ণ সহিহ হবে। আর তিনি যদি নাপাক অবস্থায় নামাজ পড়ান এবং তার নিজের নামাজই নষ্ট হয়ে যায়, তবে মুক্তাদিদের নামাজও বাতিল বলে গণ্য হবে।
ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে দলিল ও রেফারেন্স
ইমাম ও মুক্তাদির নামাজের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তা শুদ্ধ বা নষ্ট হওয়ার মূলনীতি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হয়েছে—
وَإِذَا ظَهَرَ حَدَثُ إمَامِهِ وَكَذَا كُلُّ مُفْسِدٍ فِي رَأْيِ مُقْتَدٍ بَطَلَتْ فَيَلْزَمُ إعَادَتُهَا لِتَضَمُّنِهَا صَلَاةَ الْمُؤْتَمِّ صِحَّةً وَفَسَادًا
‘ইমামের ওজু বা পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি (নামাজের ভেতরে বা পরে) প্রকাশ পেলে—এবং মুক্তাদির নিজস্ব ইজতিহাদ বা মতানুযায়ী নামাজ নষ্টকারী অন্য কোনো বিষয় দেখা গেলে— ইমামের নামাজ বাতিল হয়ে যাবে। আর এর ফলে মুক্তাদির ওপরও সে নামাজ পুনরায় পড়া (কাজা করা) ওয়াজিব হয়ে যাবে। কারণ, মুক্তাদির নামাজটি বৈধতা ও বাতিলের দিক থেকে ইমামের নামাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’ (আদ-দুররুল মুখতার)
فَإِذَا صَحَّتْ صَلَاةُ الْإِمَامِ صَحَّتْ صَلَاةُ الْمُقْتَدِي إلَّا لِمَانِعٍ آخَرَ، وَإِذَا فَسَدَتْ صَلَاتُهُ فَسَدَتْ صَلَاةُ الْمُقْتَدِي لِأَنَّهُ مَتَى فَسَدَ الشَّيْءُ فَسَدَ مَا فِي ضِمْنِهِ
‘ইমামের নামাজ যখন সহিহ হয়, তখন মুক্তাদির নামাজও সহিহ হয় (যদি অন্য কোনো বাধা না থাকে)। আর যখন ইমামের নামাজ ফাসেদ বা নষ্ট হয়ে যায়, তখন মুক্তাদির নামাজও ফাসেদ হয়ে যায়। কারণ, কোনো বস্তু যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন তার অন্তর্ভুক্ত বা অধীনস্থ বস্তুও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নষ্ট হয়ে যায়। (রদ্দুল মুহতার তথা ফাতাওয়া শামী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪০)
وَإِذَا فَسَدَ هَذَا الْجُزْءُ مِنْ صَلَاةِ الْإِمَامِ فَسَدَتْ صَلَاةُ الْمُقْتَدِي؛ لِأَنَّ صَلَاتَهُ مَبْنِيَّةٌ عَلَى صَلَاةِ الْإِمَامِ فَتَتَعَلَّقُ بِهَا صِحَّةً وَفَسَادًا
‘ইমামের নামাজের এই অংশটি যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন মুক্তাদির নামাজও নষ্ট হয়ে যায়। কারণ, মুক্তাদির নামাজ ইমামের নামাজের ওপর ভিত্তিশীল; তাই শুদ্ধতা ও ফাসাদের দিক থেকে মুক্তাদির নামাজ ইমামের নামাজের সঙ্গেই সম্পৃক্ত।’ (বদায়িউস সানাই, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৪৬)
সংক্ষেপে বলা যায়, ইমাম সাহেবের পেছনে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে তার পবিত্রতা ও রুকন-শর্তগুলো সঠিকভাবে আদায় হওয়াই মুখ্য বিষয়। কেবল বাহ্যিক বা অপ্রধান বিষয় নিয়ে অনুমান বা সন্দেহ পোষণ করে জামাত ত্যাগ করা সঠিক নয়। শরিয়তের বিধান হলো, ইমামের পবিত্রতা ও নামাজ যদি সহিহ হয়, তবে মুক্তাদিদের নামাজও পূর্ণ সওয়াবের সঙ্গে আদায় হয়ে যাবে।

