একান্ত সাক্ষাৎকারে আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী
সামগ্রিকভাবে মানুষ ইসলামের দিকেই ফিরে আসছে
Advertisement
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
আল্লামা ড. খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আল্লামা ড. খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী। মুসলিম বিশ্বের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক। ভারতীয় মুসলিমদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সংস্থা অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ’ল বোর্ডের সদস্য ও মুম্বাইয়ের ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক।
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতা ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে দাওয়াহ, আত্মশুদ্ধি এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি। বিখ্যাত উর্দু ইসলামি সাময়িকী আল ফুরকানের প্রধান সম্পাদকও তিনি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সফরের শেষদিকে মুসলিম উম্মাহর সমসাময়িক পরিস্থিতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও তরুণ প্রজন্মের বিভিন্ন বিষয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেন।
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন যুগান্তরের সহসম্পাদক- তানজিল আমির
প্রশ্ন: প্রথমেই আপনাকে বাংলাদেশে আগমনের জন্য শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। অনেকদিন পর বাংলাদেশ এলেন, শেষ কবে এসেছিলেন। এবারের সফর কেমন লাগছে?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: অনেকদিন পর আসা হলো। সর্বশেষ সম্ভবত ১৯৮৬ বা ১৯৮৭ সালে এসেছিলাম। এরপর আর আসা হয়নি। অনেক ভালো লাগছে। আমি যতটা আশা করেছিলাম, পরিবেশ-পরিস্থিতি তারচেয়েও অনেক ভালো পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।
প্রশ্ন: আমরা জানি, বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ এক দেহের মতো। বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত, মুসলমানরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে-এ বিষয়ে আপনার বিশ্লেষণ এবং এর সমাধান কী?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: দেখুন, এক হাজার বছর পর্যন্ত মুসলমানরা বিশ্বে প্রভাবশালী ছিল। এ সময় তারা শাসক ছিল, জনপ্রিয়ও ছিল। উসমানী খেলাফতের পতনের পর পশ্চিমা সভ্যতা আধিপত্য লাভ করে। এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। বাস্তবতা হলো, প্রতিটি জাতিকেই বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়; কিন্তু পরিস্থিতি কখনই এক অবস্থায় থেমে থাকে না।
একজন মানুষের যেমন সময় বদলায়, জাতিরও পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়। কয়েক শত বছর ধরে মুসলমানরা পতনের শিকার। এ ছাড়া বিভিন্ন মত-ভিন্নতাও রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও সংস্কারমূলক অনেক কাজ হয়েছে। আত্মশুদ্ধি ও দাওয়াতি কাজের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণও শুরু হয়েছে। এ সময়ের মধ্যেই বড় বড় মনীষী জন্ম নিয়েছেন, অনেক দ্বীনি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরে কাজও চলছে।
আলহামদুলিল্লাহ, সামগ্রিকভাবে বলা যায়, উম্মত ইসলামের দিকেই ফিরে আসছে। ভবিষ্যতের বিষয়ে আমি খুব ভালো প্রতাশ্যা রাখি। আরও কয়েকটি বছর আমাদের সামান্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে; কিন্তু এরপর সে সময় চলে আসবে, পুরো বিশ্বে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে ইনশাআল্লাহ।
প্রশ্ন: বিশ্ব নেতৃত্বে মুসলমানরা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। আপনার দৃষ্টিতে এ পতনের কারণগুলো কী এবং এ থেকে আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীণের সঠিক পথ ও পদ্ধতি কী হতে পারে?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করো, পরস্পরে ঝগড়া-বিবাদ করো না, করলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে, তোমাদের শক্তি-ক্ষমতা বিলুপ্ত হবে।’ (সুরা, আনফাল, ৪৬)
মুসলমানদের পতনের কারণ কী হতে পারে, সেটা কুরআনেই স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। কুরআন বলছে, যদি নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করো, তাহলে তোমরা মনোবল হারাবে। তোমাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাবে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, পারস্পরিক ইখতিলাফ। আমরা নিজেরাই নিজেদের সঙ্গে লড়াই করছি। এর পরিবর্তে আমাদের শক্তি-সামর্থ্য কাজে লাগানো উচিত জুলুমের বিরুদ্ধে।
বিশ্বে কোথাও যেন জুলুম না হয়, মুসলিম-অমুসলিম সবাই যেন ন্যায়বিচার পায়; এটিই ইসলামের বার্তা। আমি অত্যন্ত আশাবাদী, বর্তমান তরুণ-যুবসমাজ এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ পরিবর্তন আনবে ইনশাআল্লাহ।
প্রশ্ন: নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ কীভাবে কমিয়ে আনা যায়?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ অনেকটা আত্মহত্যার মতো। আমরা যখন নিজেদের সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে নেব, তখনই আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে শত্রুর মোকাবিলা করতে পারব। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া নয়, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে। শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সবার জন্য।
প্রত্যেক জাতি শুধু নিজেদের কথা চিন্তা করছে। শুধু নিজেদের ব্যাপারে চিন্তা করা এটি মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য নয়। মুসলমান হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, আমরা সমগ্র মানবতার কথা চিন্তা করব।
প্রশ্ন: উপমহাদেশে দেওবন্দিধারার শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের বিষয়ে আলেমদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে-এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: যখনই যুগের পরিবর্তন ঘটে, তখন কিছু নতুন চাহিদা বা দাবি সামনে এসে দাঁড়ায়। নতুন কিছু এলে সবার মত এক থাকে না। উভয় পক্ষে মুখলিস মানুষ থাকেন। একদল পূর্ণ ইখলাসের সঙ্গে মনে করছেন, আমাদের প্রচলিত পুরোনো শিক্ষাপদ্ধতিকে শক্তভাবে ধরে রাখা উচিত এবং মাদ্রাসায় জাগতিক শিক্ষার প্রবেশ ঘটানো উচিত নয়। তাদের আশঙ্কা, জাগতিক শিক্ষা সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করলে মাদ্রাসার মূল দ্বীনি শিক্ষার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে।
কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো, একজন আলেম জাগতিক শিক্ষা অর্জন করলে তার উদ্দেশ্য কী হবে?
অনেকে বলেন, এর মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যতের সমস্যা সমাধান হবে। আমি এ ধারণার কঠিন বিরোধিতা করি। আমরা কি রুজি-রুটির জন্য ইলম অর্জন করছি? ইলম কি ক্রয়-বিক্রয়ের বস্তু?
অন্যদিকে যেসব আলেম চান মাদ্রাসার আলেমরা জাগতিক শিক্ষাও অর্জন করুন, তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো-আলেমরা যেন যুগকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন এবং মানুষের সামনে ইসলামকে ভালোভাবে তুলে ধরতে পারেন।
আমরা যদি নতুন প্রজন্ম ও আধুনিক শ্রেণির মনস্তত্ত্ব, তাদের সমস্যা, সন্দেহ এবং মনের নানা প্রশ্ন না জানি, তাহলে কীভাবে এসবের উত্তর দেব? তারা শৈশব থেকে যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছে, সেখানে তারা ডারউইনের থিওরি পড়েছে। ফলে তাদের অন্তরে আল্লাহর অস্তিত্ব ও ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে সন্দেহ ও প্রশ্ন রয়েছে।
আমরা যদি ডারউইনের থিওরি না পড়ি, তাহলে সেটি রদ কীভাবে করব?
আমাদের ইমামরা ইলমুল কালাম পড়েছেন, মানতিক পড়েছেন, দর্শন পড়েছেন। মানতিক ও দর্শন মূলত ইসলামি জ্ঞান ছিল না; এগুলো ছিল গ্রিক সভ্যতার। কিন্তু আমাদের ইমামরা এসব জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
ইমাম গাজ্জালি দর্শনের রদ কখন করেছিলেন? যখন তিনি নিজেই দর্শনের ইমাম হয়েছিলেন। ইমাম আবুল হাসান আশআরী আহলুস সুন্নাহর আকিদা অনুযায়ী ইলমুল কালাম কীভাবে সংকলন করেছিলেন? যখন তিনি নিজে ইলমুল কালামে অভিজ্ঞ হয়েছিলেন। তাই এখন আমাদেরও সায়েন্সে দক্ষ হতে হবে।
বুখারি, মুসলিম, হাদিস, তাফসির ও ফিকহে অভিজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়তে হবে। যেসব আলেম বলেন, মাদ্রাসায় জাগতিক শিক্ষা দেওয়া উচিত, তাদের উদ্দেশ্য এটিই।
প্রকৃত সমস্যা হলো, আমরা একে-অপরকে বুঝতে পারছি না। কারণ, সরাসরি একসঙ্গে বসে একে অপরকে বোঝার মানসিকতা আমাদের নেই। আমরা তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে একে অপরকে বুঝতে চেষ্টা করি। সেই তৃতীয় ব্যক্তি কি সঠিকভাবে উভয় পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরবে?
জাগতিক শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি শুধু রুজি-রুটি অর্জন হয়, তাহলে আমি এর তীব্র বিরোধী। আপনারা কি কোনো ইঞ্জিনিয়ারের দস্তরখানায় হাজার হাজার মানুষকে খাবার খেতে দেখেছেন? অথচ আমাদের আকাবিরের দস্তরখানায় আলহামদুলিল্লাহ হাজার হাজার মানুষ খাবার খেয়েছেন।
তাই এটি রুজি-রুটির সমস্যা নয়। প্রকৃত বিষয় হলো, দাওয়াতের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করা। রাসুল (সা.) কয়েকজন সাহাবিকে হিব্রু ভাষা শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা হিব্রু ভাষা শিখেছিলেন। অন্য জাতির ভাষা ও চিন্তাধারা বুঝলে তাদের ষড়যন্ত্র থেকেও সুরক্ষিত থাকা যায়।
আমাদেরও পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র ও চিন্তাধারা বুঝতে হবে। এ উদ্দেশ্যে জাগতিক শিক্ষার কথা বলা হলে মতপার্থক্যটা শুধু শব্দের মধ্যে; মৌলিক কোনো মতবিরোধ নেই।
সবাই একমত, ইসলামকে আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কোনো দেশে ইসলামকে ভালোভাবে উপস্থাপনের জন্য জাগতিক জ্ঞান অর্জন করা উপকারী হলে তা অর্জন করা উচিত।
কিন্তু এ কথা বলা সম্পূর্ণ ভুল, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের রুজি-রুটির জন্য জাগতিক শিক্ষা দরকার; কারণ, একজন মাওলানার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
আলহামদুলিল্লাহ, হাজার হাজার ইঞ্জিনিয়ার চাকরির সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোনো মাওলানাকে চাকরির সন্ধানে ঘুরতে আমরা দেখিনা।
প্রশ্ন: আপনি যেভাবে জাগতিক শিক্ষার কথা বললেন, তা কি সবার জন্য হবে, নাকি নির্বাচিত কিছু ছাত্রের জন্য?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: আমাদের প্রতিষ্ঠানে সবার জন্যই এ কারিকুলাম চালু করেছি। দায়িত্বশীল আলেমরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের জন্য যা উপযুক্ত মনে করেন, সেটি করতে পারেন।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে কাদিয়ানি ও অন্যান্য ভ্রান্ত মতাদর্শের বিস্তার রোধে আলেম ও দাঈদের কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: আলেমদের দাওয়াতের ভাষায় কথা বলতে হবে। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানির জীবন ও চরিত্র ভালোভাবে পড়তে হবে। তার ব্যক্তিগত চরিত্র এতটাই নোংরা ছিল, তা কল্পনা করাও কঠিন। তার ব্যক্তিগত চরিত্রের ওপর বেশি আলোকপাত করা উচিত, এমন চরিত্রের মানুষ কি নবী হতে পারে?
সাধারণত মানুষ কাদিয়ানিয়াত সম্পর্কে আলোচনা করে। আমি বলি, কাদিয়ানিয়াত নিয়ে কথা বলার আগে কাদিয়ানি সম্পর্কে কথা হওয়া উচিত। মির্জা গোলাম আহমদের ব্যক্তিগত চরিত্রকে তুলে ধরুন। আপনারা যদি তার জীবনী না পড়ে থাকেন, তাহলে পড়ুন। তার ব্যক্তিগত জীবন ও চরিত্র কেমন ছিল, তা মানুষকে জানান।
প্রশ্ন: এ দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজে পড়ে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের দ্বীনি শিক্ষার আওতায় আনতে আলেমদের কী ধরনের ভূমিকা পালন করা উচিত?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: মসজিদে কুরআন শিক্ষার আসর করে সেখানে তরুণ-যুবকদের দাওয়াত করতে হবে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য পুরস্কারভিত্তিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যেতে পারে। ঘোষণা করুন: অমুক বিষয়ে যারা প্রবন্ধ লিখবে, তাদের মধ্য থেকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের পুরস্কৃত করা হবে। তাদের দু-তিনটি বিষয় নির্ধারণ করে দিন। তরুণরা পুরস্কারের আকর্ষণেও এতে অংশ নেবে।
প্রবন্ধ লেখার প্রস্তুতির জন্য তাদের কিছু কিতাব হাদিয়া দিন। তারা যখন সেই কিতাবগুলো পড়বে, তখন ইনশাআল্লাহ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হবে। তারা এখানে পুরস্কারও পাবে এবং তাদের চিন্তা ও বাস্তব জীবনে পরিবর্তনও আসবে।
আমাদের দেশে আল্লাহর শোকর, অনেক অমুসলিম ছেলেমেয়েও এসব পুরস্কারভিত্তিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। তারা প্রবন্ধ লেখে, কিতাব পড়ে এবং সেই কিতাব পড়ার বরকতে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে।

প্রশ্ন: আপনার বক্তব্যে প্রায়ই তরুণদের উদ্দেশে কোনো বার্তা থাকে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: তরুণদের ওপরই আমার শতভাগ প্রত্যাশা। তারা বড়দের সম্মান করবে, তাদের কাছে যে তাকওয়ার দৌলত রয়েছে, তা গ্রহণ করবে এবং এ কাফেলাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রশ্ন: বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে ধর্মের বিষয়ে চিন্তার বিচ্যুতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার মূল কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: আমি এর জন্য প্রধানত দুটি বিষয়কে দায়ী মনে করি। প্রথমত, সেই শিক্ষাব্যবস্থা, যেখান থেকে আমাদের তরুণরা পড়াশোনা করে বের হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, উলামায়ে কিরামের ব্যর্থতা। আলেমরা তরুণদের নিজেদের কাছে টানতে পারছে না। দুপক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে।
দেখুন, আমরা যে পরিবেশে বড় হয়েছি, যদি তারাও সেই মাদ্রাসার পরিবেশে বড় হতো, তাহলে তারাও আমাদের মতোই হতো।
আবার আমরা যদি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পরিবেশে বড় হতাম, তাহলে আমরাও তাদের মতোই হতাম। সুতরাং, এটি মূলত পরিবেশের প্রভাব, যে পরিবেশে তাদের লালন-পালন ও মানসিক বিকাশ হয়েছে।
তাই শুরুতেই তাদের কথাবার্তা সহ্য করতে হবে। তাদের জন্য প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতা, ইসলামি বিষয়ভিত্তিক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। ইসলামি বিষয়ের বই পড়ার সুযোগ দিতে হবে। নাশতা ও খাবারের দাওয়াত দিতে হবে। পুরস্কার দিতে হবে। বুকে টেনে নিতে হবে। সম্মানের সঙ্গে মসজিদে দরসে কুরআনে আমন্ত্রণ জানাতে হবে।
আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই-তরুণরা ভালোবাসার যোগ্য। তাদের বুকে টেনে নিন, আপন করে নিন। যে ত্রুটিগুলো আছে, সেগুলো চিরস্থায়ী নয়। ভালোবাসাই বিশ্বজয়ী শক্তি। ভালোবাসা দিয়েই কাজ করুন। ইনশাআল্লাহ তারা সবাই কাছে চলে আসবে।
আজকের তরুণদের অনেকের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। কারও আপত্তি রাসুলের (সা.) একাধিক বিয়ে নিয়ে, কারও আপত্তি জিহাদ নিয়ে, কারও আপত্তি পর্দা নিয়ে। এসব বিষয় যদি যুক্তিসংগত হিকমত ও প্রজ্ঞা তুলে ধরা যায়, তাহলে তাদের অন্তর প্রশান্ত হবে। ইনশাআল্লাহ তারা বিশ্বাসগত বিচ্যুতি থেকেও বেরিয়ে আসবে।
আমি বলি-আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা একজন তরুণ যদি বিশ্বাসগত বিচ্যুতিতে আক্রান্ত না হয়, বরং সেটাই বিস্ময়ের বিষয়। কারণ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাই ইসলাম সম্পর্কে নানা ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি করে।
প্রশ্ন: এ দেশের তরুণ আলেমদের নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: বাংলাদেশের তরুণ আলেমদের মধ্যে আমি যে সম্ভাবনা দেখছি, যদি তাদের সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা ও পরিচালনা করা হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ শুধু উপমহাদেশেই নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমি অত্যন্ত আশাবাদী। আমি আগেও বলেছি-যতটা আশা নিয়ে এদেশে এসেছিলাম, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি আশা নিয়ে ফিরে যাচ্ছি।
প্রশ্ন: মুসলমানরা দীর্ঘ সময় ভারত শাসন করেছে। আমাদের বহু পূর্বসূরি এ ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ভারতের মুসলমানদের সুখ-দুঃখ বাংলাদেশের মুসলমানরাও অনুভব করেন। বাস্তবে ভারতের মুসলমানদের সামগ্রিক পরিস্থিতি আসলে কী?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: সেখানে শুধু মুসলমানদের ওপর নয়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর জুলুম ও বাড়াবাড়ি হচ্ছে। একটি বিশেষ চিন্তাধারার গোষ্ঠী সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এ কারণে শুধু মুসলমানরা নয়, দেশের অধিকাংশ মানুষই চিন্তিত ও অসন্তুষ্ট। সবাই মিলেমিশে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। ইনশাআল্লাহ, আজ না হলে কাল, পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে।
প্রশ্ন: বর্তমানে দ্বীনি মাদ্রাসা ও বিভিন্ন ধর্মীয় চিন্তাধারাগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার শিকার বলে মনে হয়। আপনার মতে, এর কারণ কী হতে পারে?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: আমি তো কোনো স্থবিরতা দেখছি না। হতে পারে আমার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল, তাই দেখতে পাচ্ছি না! আপনাদের মধ্যেও আমি কোনো স্থবিরতা দেখতে পাচ্ছি না। এটি ভুল কথা, একেবারেই ভুল কথা। বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা থাকলে আপনারা আমাকে এখানে দাওয়াত করতেন না।
প্রশ্ন: আগে বাংলাদেশ থেকে সহজে দেওবন্দ, নদওয়াসহ ভারতের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা পড়তে যেত, ভিসা জটিলতার কারণে বর্তমানে ভারতে পড়াশোনার জন্য যাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের উভয় সরকারের প্রতি আপনার কী বার্তা বা দাবি থাকবে?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: আমি চাই, দুদেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকুক। এটি উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর। প্রচুর সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয় সম্পদ বাংলাদেশে রয়েছে, ভারতেও রয়েছে।
দুদেশের পারস্পরিক ঝগড়ার কারণে পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো লাভবান হয়। আমাদের দেশগুলোর কোনো লাভ হয় না। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, দুদেশের রাজনৈতিক নেতারা বিষয়টি বুঝবেন এবং পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত করবেন।
ভারতের সাধারণ মানুষের আকাঙ্খাও হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হোক। আমাদের দেশের সাধারণ হিন্দু, শিখ ও খ্রিষ্টান-সবাই ভালো সম্পর্ক চায়। যুদ্ধ, হিংসা ও বিরোধিতা কেউ পছন্দ করে না। একটি বিশেষ দল হিংসা ছড়ানোর পলিসি গ্রহণ করেছে।
আমি বাংলাদেশ সরকারের কাছেও আবেদন করছি, তারা যেন কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করে এবং পজিটিভ পয়েন্টগুলো খুঁজে বের করে। এভাবে কাজ করলে তারা সফল হবে, ইনশাআল্লাহ। আমি এর জন্য দোয়া করি।
প্রশ্ন: আপনি ভারতীয় মুসলিমদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সংস্থা অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ’ল বোর্ডের একজন সদস্য। এ বোর্ডের কাজ কী এবং বর্তমানে এটি কীভাবে কাজ করছে?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: এ বোর্ড দুটি উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম উদ্দেশ্য হলো, দেশের পার্লামেন্ট অথবা কোনো রাজ্যসভায় মুসলমানদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় (বিবাহ, তালাক, ওয়াকফ, মিরাস ও ওসিয়ত সম্পর্কিত আইন) সম্পর্কিত এমন কোনো আইন পাশ হলে, যা শরিয়তবিরোধী, তখন সেই আইন পরিবর্তনের চেষ্টা করা।
দ্বিতীয়, যে কোনো আদালতে-তা পারিবারিক আদালত বা সুপ্রিমকোর্ট হোক-মুসলিম পার্সোনাল ’ল সম্পর্কিত কোনো মামলা চললে, সেই মামলার ওপর নজর রাখা। চেষ্টা করা হয় আদালতের সিদ্ধান্ত যেন শরিয়তবিরোধী না হয়; বরং শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হয়। একই সময়ে বোর্ডকে বিশটিরও বেশি মামলা পরিচালনা করতে হয়। বোর্ডের আরেকটি বড় কাজ হলো, সমাজ সংশোধন প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের মুসলমানদের শরিয়তের ওপর আমল করতে উদ্বুদ্ধ করা।
যেমন-সুন্নাহ অনুযায়ী বিয়ে, অপচয় না করা, যৌতুক দাবি না করা, মোহর পরিশোধে টালবাহানা, ওয়াকফের সম্পত্তি রক্ষা এবং ওয়াকফ সম্পত্তির মধ্যে খিয়ানত না করা-এসব বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অর্থাৎ একদিকে মুসলমানদের নিজেদের সংশোধনের চেষ্টা, অন্যদিকে সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে শরিয়তের আইনে হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করা। এভাবে দুটি সেক্টরে কাজ চলে। এ দুই বিষয়ে কাজ করার জন্যই অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ‘ল বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এ বোর্ডে বেরেলভী, শিয়া, বোহরা, ইসমাইলি ও আহলে হাদিসসহ সব গোষ্ঠী ও মাযহাবের মানুষ রয়েছেন। ভারতের সংবিধান যাদের মুসলমান হিসাবে স্বীকৃতি দেয়, তাদের সবাইকে বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে কি সব মতবাদের মানুষের সমন্বয়ে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: এ বিষয়ে বাংলাদেশের আলেমরাই ভালো বলতে পারবেন।
প্রশ্ন: আপনার এ সফরে শাহ ওয়ালিউল্লাহ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা অনুবাদ হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশে শাহ ওয়ালিউল্লাহকে (রহ.) কেন্দ্র করে যেন নতুন একটি জাগরণ শুরু হয়েছে। তার জ্ঞান-গবেষণা ও চিন্তাধারা থেকে আমরা কীভাবে উপকৃত হতে পারি?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: এ বিষয়ে আমি অনেক ভালো আশা করি। যদি বাস্তবেই শাহ ওয়ালিউল্লাহর (রহ.) কিতাবগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়া হয়; শুধু কনফারেন্স করেই শেষ না করা হয়, তাহলে অনেক উপকার হবে।
বিশেষভাবে তার বড় কিতাবগুলো পড়তে হবে; যেমন-হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, আল-বুদুরুল বাজিগাহ, আল-ফাওযুল কাবির ফি উসুলিত তাফসির, ইজালাতুল খাফা ইত্যাদি।
শাহ সাহেবের এসব কিতাব মনোযোগ দিয়ে পড়লে ইনশাআল্লাহ প্রত্যেক ব্যক্তি অনুভব করবে, উম্মতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ব অনেক বেড়ে গেছে। মতবিরোধ কমে যাবে এবং সম্প্রীতির বিষয়গুলো বৃদ্ধি পাবে।
প্রশ্ন: ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র দ্বীনি পরিবেশে এলে কখনো কখনো সন্ত্রাসবাদ বা উগ্রতার দিকে ঝুঁকে পড়ে- এমন অভিযোগও রয়েছে। এর সমাধান কী?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: যাদের ক্ষেত্রে এমন সমস্যা দেখা যায়, তারা আলেমদের তত্ত্বাবধানে থাকেন না; এ কারণেই এমনটি হয়। আলেমরা যদি তাদের কাছে টেনে সস্নেহে বুকে ধারণ করেন এবং মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ করেন, তাহলে এমন হবে না।
আমি বারবার বলছি-মসজিদে দরসে কুরআনের হালকা কায়েম করুন। মসজিদে নিয়মিত দরসে কুরআনের হালকা হলে যুবকরা ইসলামের সঠিক রূপ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বুঝতে পারবে।
প্রশ্ন: আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশে দ্বীনের দাওয়াত ও সমাজ সংস্কারে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: আধুনিক ও মাদ্রাসা শিক্ষাধারার দুই শ্রেণিকে কাছাকাছি আনতে হবে। একদিকে মাদ্রাসার শিক্ষিত সমাজ, অন্যদিকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত সমাজ। এ দুই শ্রেণির পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে দেশ শক্তিশালী হবে, পারস্পরিক দ্ব›দ্ব কমবে, আইনশৃঙ্খলা উন্নত হবে, আলেমদের যোগ্যতা যেমন সঠিকভাবে কাজে লাগবে, তেমনি তরুণদের মেধাও যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
প্রশ্ন: বর্তমান যুগে ইসলামি দাওয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী: নিজের মতাদর্শের দিকে নয়, ইসলামের দিকে দাওয়াত দিতে হবে। মতাদর্শের ওপর উম্মত কখনো ঐক্যবদ্ধ হবে না; ইসলামের ওপর ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে। এখন আমরা দেখি, অনেকে নিজেদের জামাত বা সংগঠনের দিকে মানুষকে আহ্বান করে। অথচ আহ্বান হওয়া উচিত ইসলামের দিকে। যদি ইসলামের বিষয়ে এক হওয়ার দাওয়াত দেয়, তাহলে এ বিষয়ে কারও মতানৈক্য থাকবে না।

