খুলনা সিটি নির্বাচন
বিএনপির বাধা কোন্দল গ্রুপিং জামায়াতের টার্গেট ‘মেয়র’
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক পদে রয়েছেন মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি খুলনা-২ আসনে জামায়াত প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গ্রুপিং, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে কম গুরুত্ব দেওয়াসহ নানা কারণে এই পরাজয় ঘটে। কিন্তু খুলনা জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটি আসনই জিতে নেয় বিএনপি। সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইতোমধ্যে দেশের অন্য সিটি করপোরেশনের মতো খুলনা সিটি নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
নগরীর বিভিন্ন মোড়ে বিএনপি-জামায়াতের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা পোস্টার সাঁটানো শুরু করেছেন। পাশাপাশি তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এমনকি অনেক ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীরাও প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছেন। তারা মোড়ে মোড়ে পোস্টার, ব্যানার লাগানোসহ নানা সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের জানান দিচ্ছেন।
কেসিসির সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে যান। পরে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসক দিয়ে কেসিসি পরিচালনা করে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সাবেক সংসদ-সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে প্রশাসক পদ দেওয়া হয়। এখন অবধি মেয়র প্রার্থী হিসাবে বিএনপির পক্ষে তিনিই মাঠে রয়েছেন। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা, মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম জহির, মহানগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা চৌধুরী সাগরসহ অনেকেই।
তবে জামায়াতের একক মেয়র প্রার্থী হিসাবে মাঠে রয়েছেন মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান। সাংগঠনিকভাবে কেসিসি নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে জামায়াত। কারণ গত সংসদ নির্বাচনের পর থেকে তাদের একমাত্র টার্গেট কেসিসির মেয়রের চেয়ারটি। তারা রাজনৈতিকভাবে একক প্রার্থী ঘোষণা দিয়েই কাজ শুরু করেছেন। পাশাপাশি খুলনার ৩১টি ওয়ার্ডের মধ্যে বেশির ভাগ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। অথচ এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো পদেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি। এদিকে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী হিসাবে মাঠে রয়েছেন এসএম মুশফিকুর রহমান। তিনি ২০১৮ ও ২০২৩ সালে কেসিসি নির্বাচন করেছিলেন।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, খুলনা সিটি মেয়র পদটি কোনোভাবেই হারাতে চায় না বিএনপি। প্রতিনিয়ত প্রশাসক মঞ্জু তার রুটিন কাজের পাশাপাশি দলীয় কাজেও অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু ডেঙ্গু মোকাবিলা, জলাবদ্ধতাসহ নানা কারণে তাকে পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া সংসদ নির্বাচনের পর দলীয় অন্তর্কোন্দল আরও প্রকাশ্যে এসেছে। সর্বশেষ কেসিসি বাজেট মিটিংয়ে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কাউকে দেখা যায়নি। তবে নেতাদের দাবি, সব সংকট কাটিয়ে আগামী নির্বাচনে বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে মেয়র পদটি প্রধানমন্ত্রীকে ‘উপহার’ দেবেন।
এদিকে নাম প্রকাশ না করে বিএনপির একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, মহানগর বিএনপির সঙ্গে মঞ্জু-মনি ভাই গ্রুপের দ্বন্দ্বের অবসান হয়নি। যার প্রভাব গত সংসদ নির্বাচনে পড়েছিল। আগামীতে এই গ্রুপিং যদি থেকে যায়, তবে মেয়র পদটিও হারাতে পারে বিএনপি।
খুলনার ইতিহাসে মেয়র পদে কোনো দিন জামায়াত আসেনি; কিন্তু এবার অনেকটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় বিএনপি খুলনার স্থানীয় দলীয় অন্তর্কোন্দল মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। খুলনায় বিএনপি দেখতে যতটা ঐক্যবদ্ধ, ভেতরটা ততই ফাঁকা। নেতাদের ভাষ্য-এই সংকট মোকাবিলায় কাঁধে কাঁধ মিশিয়ে রাজনীতি করতে হবে। বিএনপি নেতাদের অন্তর্কোন্দলের কারণে ওয়ার্ড পর্যায়ে নেতৃত্ব সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
মেয়র প্রার্থী এসএম মুশফিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আগে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করলেও এবার আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করব। বিএনপির গ্রুপিং ও জামায়াতের ওপর মানুষের আস্থা না থাকায় খুলনাবাসী এবার আমাকেই মেয়র করবেন বলে আশাবাদী।’
মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি দলের কাছে মেয়র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন চাইব। দল মনোনয়ন দিলে অবশ্যই নির্বাচন করব।’
কেসিসির বর্তমান প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘দল থেকে সিটি নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি। আগে ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচন। এরপর সিটি নির্বাচন। আমাকে প্রধানমন্ত্রী যে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেটি পালন করে যাচ্ছি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরবাসীর জন্য কাজ করছি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই করব না।’
জামায়াতের মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘জামায়াত দ্বিতীয়বারের মতো এখানে মেয়র নির্বাচন করছে। এর আগে ছাতা প্রতীক নিয়ে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচন করেছিলেন। আমরা কেসিসি মেয়র পদে জয় নিয়ে শতভাগ আশাবাদী। খুলনা-২ ও খুলনা-৩ আসন নিয়ে কেসিসির নির্বাচন। গত সংসদ নির্বাচনে এই দুটি আসন থেকে সাধারণ মানুষ আমাদের পক্ষে ব্যাপক সাড়া দিয়েছে। আশা করি কেসিসি নির্বাচনে জনগণ আমাদের পাশে থাকবে। আমরা ইতোমধ্যে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করে ফেলেছি।’
নগরীর খানজাহান আলী, দৌলতপুর, খালিশপুর, সোনাডাঙ্গা, সদর থানাসহ ৩১টি ওয়ার্ড নিয়ে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এখন পর্যন্ত নগরীতে ভোটার পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯১ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৭৭ হাজার ৯০৬ ও নারী দুই লাখ ৭৯ হাজার ৯৬৭ জন। ১৯৮৪ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কেসিসিতে ২০ জন মেয়র দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে বিএনপির ছিল আটজন এবং আওয়ামী লীগের পাঁচজন।

