Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

গাজার পুনর্গঠন নকশায় ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের ছায়া

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৩ এএম

গাজার পুনর্গঠন নকশায় ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের ছায়া

ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'বোর্ড অফ পিস' বিশ্বব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাইডলাইনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার 'বোর্ড অফ পিস' বা শান্তি পরিষদের চার্টার স্বাক্ষর করছেন, গাজায় তখনো লাশের মিছিল থামেনি। 

কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুলতান বারাকাত আল জাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করেছেন, ট্রাম্প ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা আদতে একটি 'রিয়েল এস্টেট প্রসপেক্টাস' বা আবাসন ব্যবসার বিজ্ঞাপনের মতো, যা বাস্তবতার চেয়ে অলীক কল্পনার ওপর বেশি নির্ভরশীল। 

গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৮০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে চারজন নিহত হয়েছেন ঠিক সেই দিনটিতেই যেদিন শান্তি চুক্তির নামে এই চার্টার স্বাক্ষর করা হচ্ছিল।

গাজা কোনো ব্যবসার স্টার্টআপ নয়

জ্যারেড কুশনারের এই পরিকল্পনায় গাজাকে দেখা হয়েছে একটি 'ব্লাঙ্ক ক্যানভাস' বা ফাঁকা জায়গা হিসেবে, যেখানে বিলাসবহুল আবাসন, বাণিজ্যিক জোন, ডেটা হাব এবং সমুদ্র সৈকতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। সুলতান বারাকাত মনে করেন, গাজা কোনো ব্যর্থ 'স্টার্টআপ' নয় যা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল খুঁজছে; বরং এটি ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনির আবাসস্থল যারা বছরের পর বছর অবরোধ, বাস্তুচ্যুতি এবং যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। 

কুশনারের এই চাকচিক্যময় উপস্থাপনায় মানবাধিকারের চেয়ে বাজারকে এবং ন্যায়ের চেয়ে মুনাফাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের কাছে তাদের শরণার্থী শিবিরের সাধারণ বাড়িটিও কেবল একটি ইটের কাঠামো নয়, বরং এটি তাদের বংশপরম্পরার স্মৃতি এবং ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালে হারানো ভিটায় ফেরার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাই জাঁকজমকপূর্ণ টাওয়ার বা বিলাসবহুল ভিলার প্রলোভন দিয়ে তাদের এই দীর্ঘদিনের সংগ্রামকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

ফিলিস্তিনিদের ছাড়াই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা

ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার বড় একটি ত্রুটি হলো এতে মূল অংশীজন অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। এই পরিকল্পনাগুলো তৈরি হয়েছে অভিজাত কনফারেন্স হলে, অথচ যাদের ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের সাথে কোনো আলোচনাই করা হয়নি। ইরাক বা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া পুনর্গঠন পরিকল্পনা কখনোই সফল হয় না। 

এছাড়া এই পরিকল্পনায় গাজার দুঃখ-কষ্টের মূল কারণ—অবরোধ, দখলদারিত্ব এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণ—সম্পর্কে পুরোপুরি নীরব থাকা হয়েছে। সুলতান বারাকাত প্রশ্ন তুলেছেন, যে সামরিক যন্ত্র গাজাকে বারবার ধ্বংস করেছে, তাকে অর্থায়ন ও বহাল রেখে টেকসই পুনর্গঠন কীভাবে সম্ভব? পিঞ্জরের ভেতর থেকে কখনই প্রকৃত সমৃদ্ধি আসতে পারে না।

সামরিক নিয়ন্ত্রণের নতুন স্থাপত্য

পরিকল্পনাটির অন্যতম বিতর্কিত দিক হলো গাজার ভৌগোলিক নকশা পরিবর্তন করা। প্রস্তাবিত নকশায় বাফার জোন, খণ্ডিত জেলা এবং বিশেষ করিডোর রাখার কথা বলা হয়েছে, যা মূলত ফিলিস্তিনিদের জীবন সহজ করার বদলে ইসরাইলি বাহিনীর নজরদারি ও সামরিক প্রবেশাধিকার সহজ করবে। আধুনিকায়নের নামে এটি আসলে গাজাকে একটি সুরক্ষিত খাঁচায় পরিণত করার কৌশল মাত্র। 

এছাড়া গাজার জনসংখ্যাকে দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ মিশরের সীমান্তের কাছাকাছি সরিয়ে নেওয়ার যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা ফিলিস্তিনিদের পরিচয় এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে ধ্বংস করবে। অধ্যাপক বারাকাতের মতে, এই 'বোর্ড অফ পিস' আদতে একটি রাজনৈতিক থিয়েটার ছাড়া আর কিছুই নয়। যতদিন ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার, মর্যাদা এবং স্বাধীনতার বিষয়টি নিশ্চিত না করা হবে, ততদিন কুশনারের এই চকচকে 'নিউ গাজা'র স্বপ্ন বালির প্রাসাদের মতোই প্রথম ঢেউয়ে ধসে পড়বে।

সূত্র: আলজাজিরা


Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম