Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

সমুদ্রতলে কি যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ফেলছে চীন?

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম

সমুদ্রতলে কি যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ফেলছে চীন?

Advertisement

চীন প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর ও আর্কটিক (উত্তর মেরু) মহাসাগর জুড়ে বিশাল আকারে সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি এবং নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে এই বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ‘ওশান ইউনিভার্সিটি অব চায়না’ পরিচালিত গবেষণা জাহাজ ‘দং ফাং হং ৩’ ২০২৪ এবং ২০২৫ সাল জুড়ে তাইওয়ান ও মার্কিন ঘাঁটি গুয়ামের নিকটবর্তী সমুদ্র এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত এলাকাগুলোতে বারবার যাতায়াত করেছে। 

ওশান ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে জাহাজটি জাপানের কাছে পানির নিচে থাকা বস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম শক্তিশালী চীনা সেন্সরগুলো পরীক্ষা করে এবং গত মে মাসে আবার সেই একই এলাকায় ফিরে যায়। 

এছাড়া ২০২৫ সালের মার্চের দিকে এটি শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবর্তী জলসীমায় বেশ কয়েকবার যাতায়াত করে, যা সামুদ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ মালাক্কা প্রণালির প্রবেশমুখ।

বিশ্ববিদ্যালয়টির দাবি, জাহাজটি মূলত কাদা জরিপ এবং জলবায়ু গবেষণার কাজ করছিল। তবে ওশান ইউনিভার্সিটির একাডেমিকদের সহ-রচিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র দেখাচ্ছে যে, এটি ব্যাপকভাবে গভীর সমুদ্রের মানচিত্রও তৈরি করেছে। নৌ-যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, ম্যাপিং এবং সেন্সর স্থাপনের মাধ্যমে ‘দং ফাং হং ৩’ যে ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছে, তা চীনকে সমুদ্রের তলদেশের এমন এক চিত্র দিচ্ছে যা তাদের নিজস্ব সাবমেরিনগুলো আরও কার্যকরভাবে মোতায়েন করতে এবং শত্রুপক্ষের সাবমেরিন খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে।

জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য বলছে, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে এটি তাইওয়ান ও গুয়াম সংলগ্ন সমুদ্র এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল সম্পদের সন্ধানে নয়। এর ব্যাপ্তি দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তারা সমুদ্রের গভীর জলে এমন এক শক্তিশালী নৌ-সক্ষমতা তৈরি করতে চায় যা মূলত সাবমেরিন অপারেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে।

‘দং ফাং হং ৩’ একা কাজ করছে না। এটি কয়েক ডজন গবেষণা জাহাজ এবং শত শত সেন্সর সংবলিত সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তৈরি ও পর্যবেক্ষণের একটি বৃহত্তর অভিযানের অংশ। এই তৎপরতা অনুসন্ধানে চীনা সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র, জার্নাল এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের কোম্পানি ‘স্টারবোর্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স’-এর তৈরি জাহাজ-ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রশান্ত, ভারত ও আর্কটিক মহাসাগরে সক্রিয় ৪২টি গবেষণা জাহাজের গত পাঁচ বছরের গতিবিধি বিশ্লেষণ করেছে।

যদিও এই গবেষণার কিছু বেসামরিক উদ্দেশ্য রয়েছে—যেমন মৎস্য আহরণ ক্ষেত্র বা খনিজ অনুসন্ধান এলাকা জরিপ করা—তবে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করা নয়জন নৌ-যুদ্ধ বিশেষজ্ঞের মতে, এর সামরিক উদ্দেশ্যও রয়েছে।

পানির তলদেশের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য গবেষণা জাহাজগুলো নির্দিষ্ট পথে বারবার যাতায়াত করে সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তৈরি করে।  প্রশান্ত, ভারত ও আর্কটিক মহাসাগরের বড় একটি অংশ জুড়ে ট্র্যাক করা জাহাজগুলোর গতিবিধিতে এ ধরনের প্যাটার্ন দেখা গেছে।

চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া জাহাজের বর্ণনা এবং সরকারি বিজ্ঞপ্তিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ট্র্যাক করা জাহাজগুলোর মধ্যে অন্তত আটটি সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি করেছে এবং আরও ১০টি জাহাজ ম্যাপিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বহন করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার সাবমেরিন ফোর্সের সাবেক প্রধান পিটার স্কট বলেন, জাহাজগুলোর জরিপ করা তথ্য চীনা সাবমেরিনগুলোর জন্য ‘রণক্ষেত্র প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অমূল্য’ হতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘যেকোনো দক্ষ সামরিক সাবমেরিন ক্রু যে পরিবেশে তারা কাজ করছে তা বোঝার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালায়।’

জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য দেখাচ্ছে যে, চীনের সমুদ্রতলের এই জরিপ কার্যক্রমের একটি বড় অংশ ফিলিপাইন সংলগ্ন সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলসীমা, গুয়াম ও হাওয়াইয়ের নিকটবর্তী এলাকা এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ওয়েক অ্যাটলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর কেন্দ্রীভূত।

ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ের অ্যাডজান্ট প্রফেসর এবং সাবেক অস্ট্রেলীয় অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার অফিসার জেনিফার পার্কার বলেন, ‘তারা যা করছে তার বিশালতা কেবল সম্পদের সন্ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।’ তিনি আরও বলেন, পুরো কার্যক্রমের ব্যাপকতা দেখলে এটি স্পষ্ট যে, তারা সমুদ্রের গভীর জলে এমন এক শক্তিশালী নৌ-সক্ষমতা তৈরি করতে চায়, যা সাবমেরিন অপারেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে।

তাছাড়া পার্কার এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা যোগ করেছেন যে, এমনকি যেসব তথ্য বৈজ্ঞানিক উদ্দেশে সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও বেসামরিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নের একীকরণ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অধীনে চীন সরকারের একটি মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেইজিং এই পদ্ধতিকে ‘সিভিল-মিলিটারি ফিউশন’ (বেসামরিক-সামরিক সংমিশ্রণ) বলে অভিহিত করে।

চীনের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয় সমুদ্রতলের ম্যাপিং এবং মহাসাগর পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম সম্পর্কে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগও এ বিষয়ে করা প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি।

২০১৮ সালে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত টাইপ ০৯৪এ জিন-ক্লাস ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন দেখা যায়। নৌ-যুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের মানচিত্র তৈরি এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চীন তাদের সাবমেরিনগুলো আরও কার্যকরভাবে মোতায়েন করতে এবং শত্রুপক্ষের সাবমেরিন খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছে।

চলতি মাসে একটি সংসদীয় কমিশনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মার্কিন নেভাল ইন্টেলিজেন্স অফিসের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল মাইক ব্রুকস বলেন, চীন তাদের জরিপ কার্যক্রম নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে। এই তথ্যগুলো ‘সাবমেরিন চলাচল, লুকিয়ে থাকা এবং সমুদ্রতলে সেন্সর বা অস্ত্র মোতায়েনে সহায়তা করে।’

তিনি আরও বলেন, চীনা গবেষণা জাহাজগুলোর মাধ্যমে ‘সম্ভাব্য সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ একটি কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়।’

যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সমুদ্রের মানচিত্র তৈরি এবং পর্যবেক্ষণের নিজস্ব প্রচেষ্টাকে ঢেলে সাজিয়েছে, তবে তারা সাধারণত সামরিক জাহাজের মাধ্যমে এটি করে যারা বেসামরিক সফটওয়্যার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রাখার অনুমতি পায়। চীনের বেসামরিক জরিপ জাহাজগুলোও মাঝে মাঝে ট্র্যাকিং বন্ধ করে দেয়, যার অর্থ হতে পারে তাদের এই অভিযান নির্ধারিত পরিধির চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত।

প্রশান্ত, ভারত ও আর্কটিক মহাসাগর জুড়ে চীনের ম্যাপিং এবং পর্যবেক্ষণের এই বিশাল ব্যাপ্তির খবর এ প্রথম প্রকাশিত হলো। আগের প্রতিবেদনে কেবল গুয়াম ও তাইওয়ান এবং ভারত মহাসাগরের কিছু অংশের তৎপরতা উঠে এসেছিল।

মার্টিনসন আরও বলেন, কয়েক দশক ধরে মার্কিন নৌবাহিনী সামুদ্রিক রণক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি একতরফা সুবিধা ভোগ করে আসছিল। চীনের এই প্রচেষ্টা সেই সুবিধাকে ক্ষুণ্ণ করার হুমকি দিচ্ছে। এটি স্পষ্টতই গভীর উদ্বেগের বিষয়।

নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনা গবেষণা জাহাজগুলো সমুদ্রের তলদেশ এবং পানির অবস্থা সম্পর্কে যে তথ্য সংগ্রহ করছে তা সাবমেরিন অপারেশন এবং সাবমেরিন-বিরোধী যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ পার্কার বলেন, সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয় হলো—সংঘর্ষ এড়াতে এবং নিজেদের জাহাজ লুকিয়ে রাখতে কমান্ডারদের সমুদ্রতলের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে তথ্যের প্রয়োজন হয়।

কিন্তু সাবমেরিন শনাক্ত করার জন্যও এই তথ্য অপরিহার্য। সাধারণত সাবমেরিনগুলো নির্গত শব্দ বা সোনার (সমুদ্রের তলদেশের শব্দ শনাক্তকরণ পদ্ধতি) সিস্টেম থেকে পাঠানো সংকেতের প্রতিধ্বনির মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। সাবেক মার্কিন সাবমেরিন কমান্ডার টম শুগার্ট বলেন, এই শব্দতরঙ্গের চলাচল সমুদ্রতলের ভূপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। এছাড়া পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং স্রোতও শব্দতরঙ্গ ও সাবমেরিনের চলাচলের ওপর প্রভাব ফেলে।

এই অভিযানে জড়িত জাহাজগুলো চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা ওশান ইউনিভার্সিটির মতো রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন। 

ওশান ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট ২০২১ সালে জনসমক্ষে চীনা নৌবাহিনীর সঙ্গে তাদের ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ এবং ‘সামুদ্রিক শক্তি ও জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার’ প্রতি অঙ্গীকারের কথা উদযাপন করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়টি এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।

ফিলিপাইনের পূর্ব দিকে চীন তাদের সবচেয়ে ব্যাপক সামুদ্রিক জরিপ চালিয়েছে। এই অঞ্চল 'ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন' বা প্রথম দ্বীপ শৃঙ্খলের অন্তর্ভুক্ত—যা মূলত উত্তরের জাপানি দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে তাইওয়ান হয়ে দক্ষিণে বোর্নিও পর্যন্ত বিস্তৃত একগুচ্ছ ভূখণ্ড, যা মূলত আমেরিকার মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে। এই শৃঙ্খল চীনের উপকূলীয় সমুদ্র এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে।

অস্ট্রেলিয়ান নেভাল ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার সাবেক নৌ-অ্যাটাশে পিটার লিভি বলেন, ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইনের ভেতরে আটকা পড়ার বিষয়ে তারা (চীন) অত্যন্ত ভীত। চীনের এই ম্যাপিং কার্যক্রম সমুদ্রসীমা সম্পর্কে বিস্তারিত বোঝার আকাঙ্ক্ষাকেই নির্দেশ করে, যাতে তারা এই বাধা ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে।

ট্র্যাকিং তথ্যে দেখা গেছে যে, চীনের এই ম্যাপিং কার্যক্রম গুয়ামের চারপাশের জলসীমাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে—যেখানে বেশ কিছু মার্কিন পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েন রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, চীনা জাহাজগুলো আমেরিকার অন্য একটি আঞ্চলিক সামরিক কেন্দ্র হাওয়াইয়ের চারপাশের জলসীমারও মানচিত্র তৈরি করেছে; পাপুয়া নিউ গিনির একটি নৌঘাঁটির উত্তরের তলদেশ পরীক্ষা করেছে যেটিতে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি প্রবেশের অনুমতি পেয়েছে; এবং দক্ষিণ চীন সাগর ও অস্ট্রেলিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন ঘাঁটির মধ্যবর্তী পথে অবস্থিত অস্ট্রেলীয় অঞ্চল ক্রিসমাস আইল্যান্ডের আশেপাশেও অনুসন্ধান চালিয়েছে।

চীনের এই তৎপরতা আরও সুদূরপ্রসারী। তারা ভারত মহাসাগরের একটি বিশাল অংশের মানচিত্র তৈরি করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা থেকে চীনের তেল ও অন্যান্য সম্পদ আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। সাবেক অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার অফিসার পার্কার বলেন, সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীলতার ক্ষেত্রে চীনের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। এই জরিপ নির্দেশ করে যে তারা সম্ভবত ভারত মহাসাগরে আরও বেশি সাবমেরিন অপারেশন পরিচালনা করবে।

চীনের জাহাজগুলো আলাস্কার পশ্চিম ও উত্তর দিকের সমুদ্রতলদেশেরও মানচিত্র তৈরি করেছে, যা আর্কটিক বা উত্তর মেরুতে প্রবেশের একটি অত্যাবশ্যকীয় পথ। বেইজিং আর্কটিককে একটি কৌশলগত সীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ২০৩০-এর দশকের মধ্যে একটি মেরু পরাশক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঘোষণা করেছে। সাবেক সাবমেরিন কমান্ডার শুগার্ট বলেন, এই ব্যাপক জরিপ এবং বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সমুদ্রতলদেশীয় সক্ষমতা হলো ‘একটি শীর্ষস্থানীয় সামুদ্রিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থানের লক্ষণ।’

একটি 'স্বচ্ছ মহাসাগর'

রাষ্ট্রীয় অধিভুক্ত চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের দিকে ওশান ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী উ লিক্সিন একটি উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব পেশ করেন। তার লক্ষ্য ছিল সেন্সর মোতায়েনের মাধ্যমে একটি ‘স্বচ্ছ মহাসাগর’ তৈরি করা, যা চীনকে নির্দিষ্ট এলাকার পানির অবস্থা এবং প্রবাহ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা দেবে। শানডং প্রদেশের কর্মকর্তাদের মন্তব্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাবটি দ্রুতই শানডং প্রাদেশিক সরকারের কাছ থেকে কমপক্ষে ৮৫ মিলিয়ন ডলারের সমর্থন পায়।

এই প্রকল্পের শুরু হয় দক্ষিণ চীন সাগর থেকে, যেখানে ওশান ইউনিভার্সিটির প্রকাশ্য বিবৃতিতে গর্বের সাথে বলা হয়েছে যে তারা গভীর সমুদ্র অববাহিকা জুড়ে একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

মার্কিন নেভাল ইন্টেলিজেন্স অফিসের পরিচালক ব্রুকস একটি সংসদীয় কমিশনে জানিয়েছেন যে, চীন সমুদ্রতলের এমন এক নজরদারি নেটওয়ার্ক তৈরি করছে যা ‘হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য—যেমন পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং স্রোত—সংগ্রহ করে সোনারের (সমুদ্রের তলদেশের শব্দ শনাক্তকরণ পদ্ধতি) কার্যক্ষমতা বাড়াতে এবং দক্ষিণ চীন সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চলাচলকারী সাবমেরিনগুলোর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাতে সাহায্য করে।

দক্ষিণ চীন সাগরে জরিপ শেষ করার পর চীনা বিজ্ঞানীরা এই 'স্বচ্ছ মহাসাগর' প্রকল্পটিকে প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে সম্প্রসারিত করেন। চীনা প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়, ওশান ইউনিভার্সিটি এবং শানডং সরকারের নথি অনুযায়ী, জাপান ও ফিলিপাইনের পূর্ব দিকে এবং গুয়ামের আশেপাশে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং সমুদ্রতলের গতিবিধি শনাক্ত করতে চীন শত শত সেন্সর, বয়া এবং সাবসি অ্যারে মোতায়েন করেছে।

ভারত মহাসাগরে চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস এবং প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নথিতে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে থাকা একটি সেন্সর নেটওয়ার্কের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যার একটি অংশ ‘নাইনটি ইস্ট রিজ’ নামক সমুদ্রতলের পর্বতমালা বরাবর বিস্তৃত। 

স্টারবোর্ড ডাটা অনুযায়ী, চীনা জাহাজগুলো এই পর্বতমালা অঞ্চলটি তন্নতন্ন করে খুঁজেছে। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রতলদেশীয় পর্বতমালাগুলোর একটি এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশপথে অবস্থিত, যে পথ দিয়ে চীনের অধিকাংশ তেল সরবরাহ আসে।

ওশান ইউনিভার্সিটি এবং ইনস্টিটিউট অব ওশানোলজি জানিয়েছে যে, এই বিস্তৃত সেন্সর নেটওয়ার্ক এখন চীনকে পানির অবস্থা এবং তলদেশের গতিবিধি সম্পর্কে রিয়েল-টাইম (তাতক্ষণিক) তথ্য সরবরাহ করছে। কিছু নৌ-যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ পানির নিচ থেকে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কারণে এই দাবিতে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন। 

তবে পার্কার বলেন, তথ্য পেতে দেরি হলেও তা মূল্যবান, কারণ এটি চীনকে মার্কিন সাবমেরিন অপারেশন শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।

অনেক সেন্সর অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানে বসানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি তাইওয়ান এবং ফিলিপাইনের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীতে চীনের প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে আমেরিকার শক্তিশালী অবস্থান তৈরির খবর প্রকাশ হয়েছিল। ওশান ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, ওই প্রণালির এমন কিছু অংশে চীন উন্নত সেন্সর মোতায়েন করেছে যেখান দিয়ে মার্কিন সাবমেরিনগুলো দক্ষিণ চীন সাগরে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।

চীনা বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সেন্সরগুলো জলবায়ু এবং মহাসাগরীয় পরিবর্তনের ওপর নজর রাখে, কিন্তু ২০১৭ সালে শানডং প্রদেশের সরকারি কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে, 'স্বচ্ছ মহাসাগর' প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো ‘সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’। তারা স্পষ্টভাবেই এই প্রকল্পকে আমেরিকার একটি সামরিক সমুদ্র-সেন্সর নেটওয়ার্ক তৈরির প্রচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

ম্যাপিং প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা উ লিক্সিন এখন 'কিংদাও ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি ফর মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি'-র মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক তত্ত্বাবধান করছেন। ল্যাবরেটরিটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, চীনের 'নেভাল সাবমেরিন একাডেমি' এর অন্যতম অংশীদার।

‘নতুন ধরনের যুদ্ধ সক্ষমতা’

চীনের ম্যাপিং এবং নজরদারি কার্যক্রম একত্রে তাদের এমন এক শক্তিশালী সরঞ্জাম দিচ্ছে যা দিয়ে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী সাবমেরিন শনাক্ত করতে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত জলসীমায় নিজেদের সাবমেরিন মোতায়েন করতে পারবে। সিঙ্গাপুরের আরএসআইএস ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো কলিন কোহ বলেন, এটি চীনের দূর-সমুদ্রে পৌঁছানোর সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। শান্তি বা যুদ্ধ—উভয় সময়েই তারা যে জলসীমায় কাজ করতে চায়, সে সম্পর্কে তাদের কাছে এখন একটি পরিষ্কার চিত্র রয়েছে।

চীনা গবেষকরাও তাদের এই কাজের কৌশলগত গুরুত্ব দেখছেন। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় সেন্সর নেটওয়ার্কের তত্ত্বাবধায়ক ওশান ইউনিভার্সিটির গবেষক ঝো চুন গত বছর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিলেন যে, তার কাজ তাকে ‘দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা এবং সামরিক সক্ষমতার দ্রুত বিকাশ’ দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। 

তিনি ভবিষ্যতে ‘সবচেয়ে উন্নত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অর্জনগুলোকে সমুদ্রে আমাদের সামরিক বাহিনীর জন্য নতুন ধরনের যুদ্ধ সক্ষমতায় রূপান্তর করার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সূত্র: ফার্স্ট পোস্ট।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সাগরে পেলেই ডুবিয়ে দেওয়া হবে: ইরান

মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সাগরে পেলেই ডুবিয়ে দেওয়া হবে: ইরান

চীনে কিম জং উনের ২৪ ঘন্টার ‘রহস্যজনক’  সফর

চীনে কিম জং উনের ২৪ ঘন্টার ‘রহস্যজনক’ সফর

মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার ছক ইরানের, গোপন গোয়েন্দা তথ্যে চাঞ্চল্য

মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার ছক ইরানের, গোপন গোয়েন্দা তথ্যে চাঞ্চল্য

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ইস্যুতে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের জরুরি সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ইস্যুতে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের জরুরি সতর্কবার্তা

ডেমোক্র্যাটরা চুরি করেছে, ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অধিকার আছে: ট্রাম্প

ডেমোক্র্যাটরা চুরি করেছে, ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অধিকার আছে: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কিনছে ‘একসময়ের রপ্তানিকারক’ কাতার

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কিনছে ‘একসময়ের রপ্তানিকারক’ কাতার

আরও পড়ুন

মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সাগরে পেলেই ডুবিয়ে দেওয়া হবে: ইরান

মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সাগরে পেলেই ডুবিয়ে দেওয়া হবে: ইরান

চীনে কিম জং উনের ২৪ ঘন্টার ‘রহস্যজনক’ সফর

চীনে কিম জং উনের ২৪ ঘন্টার ‘রহস্যজনক’  সফর

দুই শহরে সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব

দুই শহরে সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব

রাজীব গান্ধীর সঙ্গে প্রথম দেখা ও প্রেমের গল্প যেভাবে শুরু, জানালেন সোনিয়া

রাজীব গান্ধীর সঙ্গে প্রথম দেখা ও প্রেমের গল্প যেভাবে শুরু, জানালেন সোনিয়া

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম