মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ
কেন ইরান যুদ্ধের চরম মূল্য দিচ্ছে ইউরোপ ও এশিয়ার মার্কিন মিত্ররা?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য যাই হোক না কেন, এর অর্থনৈতিক প্রভাব এক ভিন্ন ও ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের ফলে ইরানকে দুর্বল করার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে এর সবচেয়ে বড় ধকল সইতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় ও ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোকে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির এক-পঞ্চমাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের এক-তৃতীয়াংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভারত এবং তাইওয়ানের মতো উৎপাদনকারী দেশগুলো কাঁচামাল ও জ্বালানির তীব্র সংকটে পড়েছে।
বিশেষ করে কাতারের রাস লাফান এলএনজি কেন্দ্রে ইরানি পাল্টা হামলায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলোর জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার বাজারে ইতোমধ্যে ১২ শতাংশ ধস নেমেছে এবং জাপানের বাজারও ৭ দশমিক ২ শতাংশ পড়ে গেছে।
ইউরোপের পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হওয়ার পথে। ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই এই নতুন সংঘাত ইউরোপের শিল্প খাতের চাকা থামিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে ইউরোপের গ্যাস মজুত সক্ষমতার মাত্র ২৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শীতের আগে এই মজুত পূর্ণ করতে না পারলে মহাদেশটি এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে পড়বে। জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইতালির মতো বড় অর্থনীতিগুলো ইতোমধ্যে বাজার দর পতনের শিকার হয়েছে এবং গ্যাসের দাম সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রায় ৯৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সাম্প্রতিক বার্তায় মিত্রদের এই দুরবস্থার প্রতি সহমর্মিতা না দেখিয়ে বরং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন যে তাদের নিজেদের সুরক্ষা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে।তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, মিত্ররা চাইলে আমেরিকার কাছ থেকে জ্বালানি কিনতে পারে অথবা নিজেরাই লড়াই করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর ব্যবসায়িক অবস্থান ইউরোপীয় এবং এশীয় মিত্রদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ কেবল ইরানের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং পশ্চিমা জোটের দীর্ঘদিনের মিত্রতাকেও চিরস্থায়ী ভাঙনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হওয়া যতটা বিপজ্জনক, মিত্র হওয়া তার চেয়েও বেশি ‘মারাত্মক’ হতে পারে—এই প্রবাদটিই এখন বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে।

