Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন

চীনের অর্থনীতির সংকট মেটাতে খেসারত দিচ্ছে বিশ্ব, শেষ ভরসা কেবল রপ্তানি

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৫ পিএম

চীনের অর্থনীতির সংকট মেটাতে খেসারত দিচ্ছে বিশ্ব, শেষ ভরসা কেবল রপ্তানি

সংগৃহীত ছবি

Advertisement

দেশে প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে কারখানাগুলোকে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দিয়ে চাঙ্গা রাখছে বেইজিং। চীনের অর্থনীতি বাইরে থেকে যতটা শক্তিশালী মনে হয়, কাঠামোগতভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল এবং মূলত সরকার-ভর্তুকিপ্রাপ্ত রপ্তানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, টানা আরও এক বছর ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারেরও বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিয়ে বছর পার করতে যাচ্ছে চীন। গত শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেশটির রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেড়েছে।

তবে চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট। সরকারের নিজস্ব সন্দেহজনক হিসাব মতেই, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাড়ির দাম হু হু করে কমছে এবং আবাসন নির্মাতা ও স্থানীয় সরকারগুলো ঋণের পাহাড়ের নিচে ধুঁকছে। যুব বেকারত্বের হারও জেঁকে বসেছে, যা প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি।

দেশের অভ্যন্তরে ক্রেতাদের চাহিদা কম থাকায় প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে বিশ্ববাজারে রপ্তানির ওপর ব্যাপক ভর্তুকি দিচ্ছে চীন। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা, ইস্পাত কোম্পানি এবং অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ, কর ছাড়, সরকারি শিল্পপার্কগুলোতে বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে জমি এবং অনেক সময় সরাসরি নগদ অর্থসহায়তা পাচ্ছে।

এ চিত্র অবশ্য নতুন নয়। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্যমতে, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনের ১৫টি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যান্য প্রধান অর্থনীতির দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় তিন থেকে আট গুণ বেশি সরকারি সহায়তা পেয়েছে।

চীনের নাগরিকেরা বরাবরই সঞ্চয়ী। কিন্তু স্থবির অর্থনীতির কারণে তারা এখন টাকা খরচ করতে আরও বেশি অনাগ্রহী হয়ে উঠেছেন। মহামারির লকডাউনের পর গত মে মাসে প্রথমবারের মতো দেশটিতে খুচরা বিক্রি কমেছে। এ ছাড়া, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ—যেমন কারখানা, ভবন ও যন্ত্রপাতি ক্রয়—৪ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।

রপ্তানি নির্ভরতা কমিয়ে ভোক্তাদের ব্যয় বাড়াতে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চীনের নেতারা কয়েক দশক ধরেই কথা বলে আসছেন। ২০০৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ‘অস্থিতিশীল, ভারসাম্যহীন, সমন্বয়হীন ও টেকসই নয়’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তবে পরবর্তী দুই দশকে এর তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বাণিজ্যযুদ্ধ নিরসনের লক্ষ্যে চীনের অর্থনীতির ‘কাঠামোগত সংস্কার’কে তার ‘প্রথম ধাপের’ বাণিজ্য চুক্তির একটি অংশ করেছিলেন। কিন্তু প্রধান দাবিটি—চীন যেন রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি সীমিত করে—পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়া হয়, যা আর কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। আর বেইজিংও এই শর্ত মানার কোনো আগ্রহ কখনো দেখায়নি।

মুখে যা-ই বলা হোক না কেন, চীনের নেতারা হয়তো সত্যিকার অর্থে একটি ভোক্তাকেন্দ্রিক অর্থনীতির দিকে এগোতে চান না। এর প্রধান বাধা মূলত রাজনৈতিক। সাধারণ চীনারা এত বেশি সঞ্চয় করেন, কারণ দেশটিতে সরকারি পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা, শিক্ষা তহবিল এবং মৌলিক আয়ের ব্যবস্থা চরমভাবে অপ্রতুল।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাবে চীনারা আগাম সতর্কতা হিসেবে সঞ্চয় করেন। ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ানোর অর্থ হলো, রাষ্ট্রীয় খাত এবং সরকার-সমর্থিত উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে সম্পদ সাধারণ মানুষের হাতে স্থানান্তর করা। যেকোনো সর্বাত্মকবাদী (টোটালিটারিয়ান) সরকারই এটি করতে চাইবে না, কারণ এটি তাদের ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ঠিক এ কারণেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এমন অনেক সংস্কারে বাধা দিয়েছেন, অর্থনীতিবিদদের মতে যেগুলো আসলে মানুষকে সঞ্চয় কমিয়ে বেশি খরচ করতে উৎসাহিত করত। এ ছাড়া শি জিনপিং 'ওয়েলফেয়ারিজম' বা জনকল্যাণবাদেরও তীব্র সমালোচনা করেন; অর্থাৎ, রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণকে খুব বেশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়ার ঘোর বিরোধী তিনি।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের কথা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের এই রপ্তানিনির্ভরতা বাণিজ্য আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি সুবিধা (লেভারেজ) দেবে। এটা ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্রেরও চীন থেকে ‘রেয়ার-আর্থ এলিমেন্ট’ (বিরল মৃত্তিকা উপাদান) এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ প্রয়োজন। তবে এই প্রয়োজনীয়তা আসলে দ্বিমুখী।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম