ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন প্রধান কে এই মোহসেন রেজাই?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মোহসেন রেজাইকে দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে ইরান। এরই মধ্য দিয়ে সোমবার (১০ আগস্ট) কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র রেজাইকে গুরুত্বপূর্ণ এই পদে বসানো হলো। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রেজাই মোহাম্মদ বাঘের জোলকদরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। এসএনএসসি ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি সমন্বয়কারী গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। এর চেয়ারম্যান দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। জোলকদরকে খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
৭১ বছর বয়সি মোহসেন রেজাই সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তুলে ধরা হলো—
২৭ বছর বয়সেই বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরপরই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসে (আইআরজিসি) যোগ দেন রেজাই। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৮১ সালে তিনি আইআরজিসির কমান্ডার হন। প্রায় ১৬ বছর তিনি বাহিনীটির নেতৃত্ব দেন। এর মধ্যে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরান-ইরাক যুদ্ধের অধিকাংশ সময় তিনি আইআরজিসির কমান্ডার ছিলেন।
তার নেতৃত্বে আইআরজিসির স্থল, নৌ ও বিমান সক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়। বিপ্লবের সময় গোপন তৎপরতা থেকে উঠে আসা আইআরজিসির যে প্রজন্ম পরবর্তী সময়ে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসে, রেজাই তাদের অন্যতম।
আইআরজিসির কমান্ডারের দায়িত্ব ছাড়ার পরও তিনি ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট পদে তিনি একাধিকবার প্রার্থী হয়েছেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রেজাই তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
মোজতবার উপদেষ্টা
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন। এরপর চলতি বছরের মার্চে রেজাইকে মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত চলাকালে রেজাই নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। আলোচনার বিষয়ে তিনি গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন সময় হুমকিও দিয়েছেন।
এপ্রিল মাসে রেজাই বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালে সেটি ‘দারুণ’ হবে। কারণ, তার ভাষায়, ‘আমরা হাজার হাজার জিম্মি করতে পারব এবং প্রত্যেক জিম্মির বিনিময়ে এক বিলিয়ন ডলার করে আদায় করব।’
সে সময় তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে তিনি নন এবং এটি তার ব্যক্তিগত মতামত।
জুন মাসে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ১৭ জুন ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার আগে রেজাই বলেছিলেন, ওই চুক্তিতে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে, যেগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন। পরে ২৭ জুন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা সৃষ্টি করে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন।
মোজতবা খামেনির সঙ্গে রেজাইয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও তার নতুন দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। রোববার সর্বোচ্চ নেতা তাকে এসএনএসসিতে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। নিয়োগের আদেশে রেজাইয়ের দীর্ঘ সামরিক ক্যারিয়ারসহ তার ‘মূল্যবান অভিজ্ঞতার’ কথা উল্লেখ করেন খামেনি।
শাহবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন
১৯৭৯ সালে উৎখাত হওয়া পাহলভি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কিশোর বয়স থেকেই সক্রিয় ছিলেন রেজাই। ১৯৭৩ সালে শাহের গোয়েন্দা সংস্থা সাভাকের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণও করেন তিনি।
১৯৭০-এর দশকে রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় সশস্ত্র সংগঠন ‘মানসুরুন’ প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে ভূমিকা রাখেন রেজাই। ওই সংগঠনের যেসব সদস্য কারাবন্দি হয়েছিলেন, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে আইআরজিসির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা
ইরান-ইরাক যুদ্ধে রেজাইয়ের ভূমিকা নিয়ে ইরানে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকেরা এমন কয়েকটি ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যেগুলোতে বিপুলসংখ্যক ইরানি সেনা হতাহত হয়েছিল।
এর মধ্যে ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরের ‘কারবালা-৪’ অভিযান উল্লেখযোগ্য। ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরাকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে বসরার দিকে অগ্রসর হওয়া।
২০১৮ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রেজাই দাবি করেন, শত্রুকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই কারবালা-৪ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল এবং এর পরেই কারবালা-৫ অভিযান চালানো হয়। এ বক্তব্যের পর তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন।
পরে রেজাই ব্যাখ্যা করেন, কারবালা-৪ অভিযানটি শুরুতে সত্যিকার অর্থেই সামরিক আক্রমণ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর সেটিকে কারবালা-৫ অভিযানের আগে শত্রুকে বিভ্রান্ত করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তার এই বক্তব্যে যুদ্ধের সাবেক সেনা, নিহত সেনাদের পরিবার এবং ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার মধ্যেও তীব্র সমালোচনা দেখা দেয়।
সূত্র: দ্যা এক্সপ্রেস ট্রিবিউন

-6a7aebb8c6ce6.jpg)