আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইরানকে একঘরে করে রাখতে চায়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম
প্রতীকী ছবি (এআই দিয়ে তৈরি)
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্র এক অভাবনীয় ও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে বিশাল একটি নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন।
এর আওতায় তেহরানের প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, পণ্যবাহী জাহাজ, সোনা, প্রযুক্তি, বিমান চলাচল এবং ডিজিটাল সম্পদের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করছেন, যাতে সবাই ইরানের সাথে সব ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও দেনা-পাওনা চুকিয়ে ফেলে।
তবে তেহরানকে রাতারাতি একা করে ফেলা ওয়াশিংটনের জন্য একেবারেই সহজ কাজ নয়। বহু বছর ধরে চলা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সামলাতে ইরান এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সাথে শক্তিশালী অর্থনৈতিক বাণিজ্য গড়ে তুলেছে।
কাস্টমস উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি এবং ৬৮.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
ইরানের বিশ্ববাজারে টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি চীন ও ইরাক। চীন মূলত ইরান থেকে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল কেনে। ইরানের সমুদ্রপথে পাঠানো মোট অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি যায় চীনে, যা ২০২৪ সালে প্রায় ১৪.৫৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাণিজ্য নিশ্চিত করেছে।
পশ্চিমা চোখ ফাঁকি দিতে কম দামে বা ছায়া-জাহাজের বহর ব্যবহার করে এই তেলের বড় অংশ লেনদেন হয়। অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরাক তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও সরাসরি বিদ্যুৎ কেনে ইরান থেকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও নির্মাণসামগ্রীসহ ২০২৪ সালে তারা ইরান থেকে ১১.৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এতদিন ইরানের জন্য অন্যতম প্রধান অর্থপ্রবাহ ও পণ্য অন্য দেশে পাঠানোর মূল পথ বা রি-রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছিল, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৭.১৬ বিলিয়ন ডলার।
তবে সম্প্রতি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে দুবাই হঠাৎ তেহরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় ইরানের এই বড় রাস্তাটি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তবে অন্য দুই প্রতিবেশী তুরস্ক ও আফগানিস্তান এখনো ইরানের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। তুরস্ক গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল ও খাদ্যসামগ্রীর বদলে ৬.১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করেছে, আর আফগানিস্তান জ্বালানি ও অবকাঠামো সামগ্রীর জন্য ২.৩ বিলিয়ন ডলারের কেনাকাটা করেছে।
আমদানির ক্ষেত্রেও ইরান নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর একইভাবে নির্ভরশীল। গত বছর পর্যন্ত ইরানের মোট আমদানির ৩০ শতাংশেরও বেশি বা ২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আসত সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে, যেখানে দুবাইয়ের মধ্যস্থতায় মূলত পশ্চিমা বিশ্বের যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স পৌঁছাত। তবে এই পথ বন্ধ হওয়ায় চীন এখন ইরানের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। সেখান থেকে ১৭.৮ বিলিয়ন ডলারের চীনা যন্ত্রপাতি, গাড়ির পার্টস ও শিল্প সরঞ্জাম সরবরাহ পাচ্ছে তেহরান। পাশাপাশি ভৌগোলিক সুবিধার কারণে তুরস্কের স্থলপথ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ও শিল্পপণ্যসহ ১১.১ বিলিয়ন ডলারের আমদানি সম্পন্ন হয়।
এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত থেকেও ইরান সীমিত আকারে পণ্য এনে থাকে, যার মধ্যে ইউরোপ থেকে ৬.১ বিলিয়ন ডলারের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ভারত থেকে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের চাল, চা ও মৌলিক ওষুধ অন্যতম।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যি সত্যি ইরানকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়, তবে তাদের মূলত চীন, ইরাক ও তুরস্কের মতো বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের ইরানের সাথে লেনদেন বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে—যেটা বাস্তবায়ন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

-6a8d93d93fead.jpg)
-6a8d8c8f6996e.jpg)