আলজাজিরার প্রতিবেদন
১ ডলারে ২০ লাখ রিয়াল, চরম মূল্যস্ফীতিতে দিশাহারা ইরানিরা
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দরপতন নতুন রেকর্ড গড়েছে। দেশটির মুক্তবাজারে এখন ১ মার্কিন ডলারের দাম ছাড়িয়েছে ২০ লাখ রিয়াল। তেহরানের অর্থনীতি চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরই মুদ্রাটির এই নজিরবিহীন পতন হয়েছে।
কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি নানা সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির প্রায় সব খাতে।
রিয়ালের মূল্য কমার পাশাপাশি বাড়ছে মূল্যস্ফীতি, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ ইরানের প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কতটা পড়েছে, তা বোঝাতে তেহরানের বাজারে খাদ্য, পোশাক ও ওষুধের বর্তমান দাম সংগ্রহ করে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
২০ লাখ রিয়ালে এখন কতটুকু প্রয়োজনীয় পণ্য?
যুদ্ধ শুরুর আগে ২০ লাখ রিয়ালে প্রায় ৪ কেজি টমেটো, আধা কেজি মুরগির মাংস এবং ১ লিটারের কিছু কম রান্নার তেল কেনা যেত। এখন একই পরিমাণ অর্থে এসব পণ্যের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ কেনা যায়। টমেটোর গড় দাম বেড়েছে ৭১ শতাংশ, মুরগির দাম ৭৪ শতাংশ এবং রান্নার তেলের দাম বেড়েছে ১৭৭ শতাংশ।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনসুলিনের দাম বেড়েছে ৬৪২ শতাংশ। প্যারাসিটামলের মতো প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। সরকার বড় ধরনের ভর্তুকি দিলেও শিশুখাদ্য বা বেবি ফর্মুলার দাম বেড়েছে ৯৫ শতাংশ। ফলে ইরানি পরিবারগুলো শুধু আগের তুলনায় কম পণ্য কিনছে না, খাদ্যতালিকাতেও পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে।
তেহরানের ৩৫ বছর বয়সি গৃহিণী আফসানেহের এক বছর বয়সী সন্তান রয়েছে। তিনি জানান, যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ অর্থে তাদের পরিবারের এক সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত, এখন সেই খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
আফসানেহ বলেন, আগে তারা তিন বা ছয় মাস পর কী করবেন, তা নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারতেন। এখন তাদের একমাত্র চিন্তা হলো, বর্তমান আয় দিয়ে কোনোভাবে মাসের শেষ পর্যন্ত চলা।
তিনি ও তার স্বামী দুজনই চাকরি করেন। কিন্তু শিশুর দেখাশোনার জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ তুমান দিতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল।
ইরানে রিয়ালের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘তুমান’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। ১ তুমান সমান ১০ রিয়াল। বড় অঙ্কের হিসাব সহজ করার জন্য দেশটির মানুষ সাধারণত তুমানেই দাম উল্লেখ করেন।
সরকারের ভর্তুকির কারণে শিশুখাদ্যের খরচ কিছুটা কমলেও শিশুর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টি-সম্পূরক ওষুধের খরচ বিমার আওতায় না থাকায় আফসানেহর পরিবারের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, নতুন পোশাক কেনা কিংবা গাড়ি পরিবর্তনের মতো অনেক পরিকল্পনা বাদ দিতে হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও তিনি আশা করছেন না।
দাম বেড়েছে সবকিছুর
যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন স্থানে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ আমদানি-রপ্তানি আরও কঠিন করে তুলেছে। রিয়ালের দরপতনে পণ্যের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের প্রবেশাধিকারও সীমিত হয়েছে। এর বিপরীতে মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি।
মার্চ ২০২৭-এ শেষ হতে যাওয়া বর্তমান ইরানি ক্যালেন্ডার বছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত সর্বনিম্ন মজুরি ১৬ কোটি ৬০ লাখ রিয়াল। ডলার হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৮২ ডলার। সরকারি সহায়তা ও বিভিন্ন সুবিধা যোগ করলেও মোট অর্থ ২২ কোটি রিয়ালের কম, অর্থাৎ প্রায় ১০৮ ডলার।
তেহরানের ৩৫ বছর বয়সি পোশাকের ব্যবসায়ী জামির জানান, গত বছরের তুলনায় তার বিক্রি ৪০ শতাংশ কমেছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, বাজারের অনেক ব্যবসায়ী শীত শেষ হওয়ার আগেই দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন। শ্রমিকদের মজুরি, কাঁচামালের দামসহ প্রায় সবকিছুর খরচ বেড়েছে।
তিনি বলেন, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ফিরে আসা পর্যন্ত কফি, সিগারেট, পানি ও যাতায়াতের মতো সাধারণ খরচেই অন্তত ২০ লাখ তুমান বা প্রায় ১০ ডলার ব্যয় হয়ে যায়। খুব হিসাব করে চললেও নিয়মিত বাজার ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ লাখ তুমান বা ৩.৫ থেকে ৪ ডলার খরচ হয়।
আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ছে
বেতননির্ভর মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো—পরবর্তী বেতন পাওয়ার আগেই আগের বেতনের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় প্রদেশ হরমোজগানে বসবাসকারী ২৮ বছর বয়সি সালামা এক সন্তানের মা। তিনি মৎস্য খাতে কাজ করেন। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে বসবাসকারী এই নারীর সংসারেও মূল্যবৃদ্ধির বড় প্রভাব পড়েছে।
সালামা বলেন, আগে সপ্তাহের বাজার করতে প্রায় ৫ লাখ তুমান (২.৫ ডলার) লাগত। এখন একই বাজারের জন্য অন্তত ৫০ লাখ তুমান (২৫ ডলার) খরচ করতে হচ্ছে। ফলে মাংস ও মুরগির মতো খাবার কমিয়ে দিতে হয়েছে, অনেক সময় পুরোপুরি বাদও দিতে হচ্ছে।
তিনি জানান, শিশুদের সাধারণ সর্দির ওষুধ বা মৌসুমি অ্যালার্জির ওষুধের দাম এখন ইরানি ব্র্যান্ডের হলেও প্রায় ৩ লাখ তুমান। আর সাধারণ চিকিৎসকের কাছে একবার দেখাতেই কমপক্ষে ১০ লাখ তুমান খরচ হয়।
যুদ্ধ ইরানের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেনি, তবে সংকটকে আরও গভীর করেছে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বন্দর অবরোধ অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বেকারত্ব ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর পক্ষে এই বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে লাখ লাখ ইরানির কাছে এখন প্রশ্ন শুধু পণ্যের দাম কতটা বেড়েছে, তা নয়; বরং মাসের বেতন দিয়ে এক মাসের খাবার, বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কতটুকু কেনা সম্ভব—সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।


