বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ যে কারণে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। নেপালের ভোটেকোশি নদী এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় দেশটির কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত ও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বুধবার নেপালের দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৬ আগস্ট ভোটেকোশি নদী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার পর নেপালের বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে দেশটির বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অথচ ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছিল মাত্র কয়েক দিন আগে। বন্যার প্রভাবে সেই সরবরাহ এখন প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
বর্ষা মৌসুমে নেপাল সাধারণত গড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে। বন্যার পর তা কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত দুই প্রকল্প
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পাওয়া নেপালের দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্প দুটি হলো ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। গত সপ্তাহ থেকেই প্রকল্প দুটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
চিলিমে প্রকল্প থেকে ভারতে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিশূলী প্রকল্প থেকে ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমোদন রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে এসব প্রকল্পের বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বিক্রি করা বিদ্যুতের মূল্য মার্কিন ডলারে পায় নেপাল।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ বলেন, ‘বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুটি প্রকল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই বিকল্প হিসেবে অন্য প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর অনুমতি দিতে আমরা ভারতকে অনুরোধ করেছি। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে।’
বন্যার ক্ষয়ক্ষতি শুধু ওই দুই প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগের পর থেকে নেপালের মোট ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক হওয়ার পথে নেপাল
দীর্ঘদিন ধরেই নেপাল, বিশেষ করে শুষ্ক শীত মৌসুমে, বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। এমন সময়ে ভয়াবহ বন্যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই প্রচেষ্টায় বড় বাধা তৈরি হয়েছে।
২০২১ সালে প্রথমবার বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করে নেপাল। এরপর দেশটির বিদ্যুৎ খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও বাংলাদেশে মোট ২ হাজার ৯৩২ কোটি নেপালি রুপি মূল্যের বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে দেশটি।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় বাংলাদেশ–নেপাল জ্বালানিসচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের পাশাপাশি বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি আরও ২০ মেগাওয়াট বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছিল। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরুর সিদ্ধান্তও হয়।
তবে পরে ভারত জানায়, সঞ্চালন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানি করা সম্ভব নয়। গত জুনে নেপাল-ভারত জ্বালানিসচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে নেপাল আবারও ওই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দিতে ভারতের প্রতি অনুরোধ জানায়।
বর্তমানে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। একই সঙ্গে চালু থাকা অন্যান্য প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ভারতের অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে।
গোড্ডা কেন্দ্র থেকেও কমেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ
এদিকে ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় কোম্পানিটি। বাংলাদেশে আদানির জনসংযোগ কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ফাইভ ডব্লিউ কমিউনিকেশনস গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারতে রেলপথে তীব্র জটের পাশাপাশি পণ্য বোঝাইয়ের ক্ষেত্রে একাধিক বিধিনিষেধ রয়েছে। এর ফলে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পরিবহনে সমস্যা তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিকের তুলনায় কম কয়লা পৌঁছানোর কারণে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাময়িকভাবে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দিনের ‘অফপিক’ সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

