শূকরের কিডনি নিয়ে ২৭১ দিন বহাল তবিয়তে ছিলেন তিনি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ পিএম
দুই চিকিৎসকের সঙ্গে টিম অ্যান্ড্রুজ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শূকরের শরীর থেকে প্রতিস্থাপন করা একটি কিডনি এক রোগীর শরীরে ২৭১ দিন কার্যকর ছিল। এটি এ ধরনের চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের রেকর্ড বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা। খবর বিবিসির
কিডনি প্রতিস্থাপন করা ওই রোগীর নাম টিম অ্যান্ড্রুজ। তিনি জানান, এই চিকিৎসা তাকে নতুন করে বাঁচার আশা দিয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক মাস হাসপাতালে গিয়ে ডায়ালাইসিস মেশিনের মাধ্যমে রক্ত পরিশোধনও করতে হয়নি তাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাস জেনারেল ব্রিগহাম হাসপাতালের চিকিৎসক দল বলছে, তাদের এই সাফল্য প্রমাণ করে, মানুষের কিডনি পাওয়া পর্যন্ত শূকরের অঙ্গকে ‘সেতু’ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
তবে ২৭১ দিন পর শূকরের কিডনিটি শেষ পর্যন্ত কাজ করা বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসকেরা সেটি অপসারণ করেন। এরপর নতুন মানবদাতা পাওয়া পর্যন্ত অ্যান্ড্রুজকে অল্প সময়ের জন্য আবার ডায়ালাইসিস নিতে হয়।
অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় কিডনির সংকট দীর্ঘদিনের। এ কারণে বিজ্ঞানীরা অন্য প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন (xenotransplantation)।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু প্রতি বছর কেবল ২৫ হাজারের মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়। যুক্তরাজ্যেও সাত হাজারের বেশি মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের তালিকায় রয়েছেন।
অ্যান্ড্রুজকে বলা হয়েছিল, কিডনি প্রতিস্থাপনের তালিকায় তার সুযোগ আসতে সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কিন্তু ডায়ালাইসিসে একজন মানুষ গড়ে প্রায় পাঁচ বছর বাঁচেন।
অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘আমার হাতে সময় কম ছিল। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক হয়ে উঠছিল।’
শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগকে তিনি তাই ‘আশা’ এবং ‘সুড়ঙ্গের শেষের আলো’ হিসেবে দেখেছিলেন।
কেন শূকরের কিডনি?
গবেষকদের কাছে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনের জন্য শূকরকে সবচেয়ে উপযোগী প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ তাদের অঙ্গের আকার মানুষের অঙ্গের কাছাকাছি।
তবে সাধারণ শূকরের কিডনি সরাসরি মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা যায় না। মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে বহিরাগত অঙ্গ হিসেবে শনাক্ত করে আক্রমণ শুরু করবে। ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কিডনির কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অঙ্গটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এই সমস্যা কাটাতে গবেষকেরা ইউকাটান মিনিয়েচার পিগ বা ছোট আকারের শূকরের বিশেষ জাত তৈরি করেছেন। এসব শূকরের জিনে মোট ৬৯টি পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে তাদের অঙ্গ মানুষের শরীরের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
এই জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে শূকরের কোষের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বাদ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজেই শনাক্ত করে আক্রমণ করে।
এ ছাড়া শূকরের অঙ্গে কিছু মানব জিন যুক্ত করা হয়েছে, যা এক ধরনের আড়ালের মতো কাজ করে এবং মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে শূকরের টিস্যুকে লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
শূকরের ডিএনএ-তে থাকা সম্ভাব্য ভাইরাসগুলোকেও নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে মানুষের শরীরে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
চিকিৎসকদের এই সাফল্য অঙ্গ সংকট মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। ভবিষ্যতে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের ঘাটতি পূরণে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।


