সাবেক ইসরাইলি সেনাকে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার, অ্যাডিডাস বয়কটের ডাক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গাজায় ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের মধ্যে সাবেক এক ইসরাইলি সেনাকে বিজ্ঞাপনের মুখ হিসেবে ব্যবহার করায় সমালোচনার মুখে পড়েছে ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। প্রতিষ্ঠানটির ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’ প্রচারণায় সাবেক ইসরাইলি সেনা শালেভ বিটনকে যুক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেকে অ্যাডিডাসের পণ্য বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন।
অ্যাডিডাসের ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’ মূলত এমন ব্যক্তিদের জন্য, যাদের কোনো একটি পা নেই। জোড়ার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী একটি জুতা কেনার সুযোগ দেওয়াই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। তবে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই প্রচারণার জন্য সাবেক ইসরাইলি সেনাকে বেছে নেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, গাজায় সংঘাতের কারণে যখন হাজারো মানুষ অঙ্গহানি ও গুরুতর আহত হওয়ার শিকার হয়েছেন, তখন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য নেওয়া একটি সুবিধামূলক উদ্যোগের প্রচারণায় কেন ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যকে সামনে আনা হলো।
শালেভ বিটন ২০২১ সালের মে মাসে গাজার কাছে এক সংঘর্ষে আহত হয়ে বাম পা হারান। অ্যাডিডাসের প্রচারণায় তার অন্তর্ভুক্তি গাজায় চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অঙ্গহানি ও প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে উপস্থাপন করছে, তা নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৬ সালের মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় সংঘাতের কারণে ৫ হাজারের বেশি মানুষ হাত বা পা হারিয়েছেন। একই সময়ে ২২ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন।
সংঘাতের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে শিশুদের ওপরও। ইউনিসেফের সর্বশেষ ‘স্টেট অব প্যালেস্টাইন’ আপিল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি শিশু এমন গুরুতর আঘাত পেয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাদের জীবনে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগেও গাজায় শিশুদের অঙ্গহানির ভয়াবহ চিত্র বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সিএনএন, সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফের তথ্যের বরাতে জানানো হয়েছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি শিশু একটি বা দুটি পা হারিয়েছে। ওই সময়ের হিসাব অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রায় এক হাজার শিশু একটি বা দুটি পা হারিয়েছিল।
ডব্লিউএইচওর আরেক হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত গাজায় অঙ্গহানি হওয়া ২ হাজার ২৭৭ জনের মূল্যায়ন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র ৫০২ জন কৃত্রিম অঙ্গ পেয়েছেন। সংস্থাটির মতে, গাজায় পুনর্বাসনসেবা ও প্রয়োজনীয় সহায়ক চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট রয়েছে।
এ ছাড়া ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, গাজায় ৪২ হাজারের বেশি মানুষ এমন গুরুতর আঘাত পেয়েছেন, যাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন চিকিৎসার প্রয়োজন।
এমন বাস্তবতায় সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, অঙ্গহানি হওয়া ফিলিস্তিনিরা প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও প্রবেশগম্যতা নিয়ে আলোচনায় যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছেন কি না। তাদের আপত্তি মূলত ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’ উদ্যোগটির বিরুদ্ধে নয়; বরং গাজা যুদ্ধের বর্তমান রাজনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে প্রচারণার মুখ হিসেবে বিটনকে বেছে নেওয়াকেই তারা সমস্যাজনক হিসেবে দেখছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীতে কাজ করার অতীত রয়েছে—এমন একজনকে গাজা যুদ্ধের এই সময়ে অ্যাডিডাস কেন প্রচারণার প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিল।
অ্যাডিডাসের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পণ্য বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেমও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্টোরি পোস্টে অনুসারীদের অ্যাডিডাস বয়কট করার আহ্বান জানান তিনি। ইসরাইলে বিটনকে সামনে রেখে ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’ প্রচারের সিদ্ধান্তের পরই তার এই প্রতিক্রিয়া আসে।
অ্যাডিডাস ইউরোপে ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’ চালু করে ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি। পরে মার্চে উদ্যোগটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। অ্যাডিডাসের মালিকানাধীন স্টোরের মাধ্যমে ইউরোপের ২৩টি দেশে এই সেবা চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
প্রতিবন্ধী ও অঙ্গহানি হওয়া মানুষের জন্য এমন উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হলেও, গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং এর ফলে ব্যাপক অঙ্গহানির বাস্তবতায় প্রচারণার জন্য একজন সাবেক ইসরাইলি সেনাকে বেছে নেওয়ায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের প্রচারণায় পণ্য বা সেবার সামাজিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

