Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

রয়টার্সের বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কেন ১০০ ডলারের নিচে

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২০ পিএম

ইরান যুদ্ধ সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কেন ১০০ ডলারের নিচে

প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের তীব্র সামরিক সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এখনো ১০০ ডলারের নিচে অবস্থান করছে। 

চলতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দামে উর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও দাম কাঙ্ক্ষিত সেই সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।

বাজার গবেষণা সংস্থা আর্গাস জানায়, সাত মাস আগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকদের অপরিশোধিত তেল রফতানি দৈনিক ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। তবুও বেশ কয়েকটি কৌশলগত এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোগত কারণে বাজারের দাম একশ ডলার স্পর্শ করতে পারছে না।

হরমুজ প্রণালিতে বিকল্প ব্যবস্থার সাফল্য 

সংঘাত সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন সম্ভব হচ্ছে। রাইস্ট্যাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিম্বার্থির মতে, ৩০ আগস্ট পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় দ্বিগুণ। 

বর্তমানে এই প্রবাহ কমে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নামলেও দৈনিক গড় পরিবহন দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেলে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিবহনের কারণেই বাজারে তেলের যৌক্তিক মূল্য ৯৫ ডলারের আশেপাশে টিকে আছে।

একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরের রফতানিকারকরা হরমুজের বাইরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের (শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার) মতো বিকল্প পথ খুঁজে নিয়েছেন। সৌদির রাস তানুরা বন্দর থেকে উত্তোলন পুনরারম্ভ এবং রিয়াদ থেকে বিকল্প বন্দর হিসেবে মিশরের সিদি কেরির দিয়ে আগস্টে দৈনিক ২১ লাখ ৩৯ হাজার ব্যারেল তেল রফতানি করা সম্ভব হয়েছে, যা জুনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। 

এছাড়া ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তাদের রফতানি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে এনেছে, যদিও মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের রফতানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বহিরাগত উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিকল্প সরবরাহ 

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং গায়ানার মতো ওপেক-বহির্ভূত উৎপাদক দেশগুলো চলতি বছরে তাদের উৎপাদন দিনে আরও ১৪ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যোগান ঘাটতি কিছুটা হলেও কমছে। অন্যদিকে রাশিয়ার তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে ইউক্রেনীয় হামলার কারণে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার কমায় তারা জুলাই ও আগস্টে প্রতিদিন প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেল রফতানি বজায় রেখেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চাহিদা হ্রাস 

চাহিদার ঘাটতি বা ‘ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন’ তেলের দাম লাগামহীন হতে না দেওয়ার অন্যতম বড় কারণ। পেট্রোকেমিক্যাল ও পরিবহন জ্বালানির চাহিদা চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে প্রতিদিন ৩৫ লাখ ব্যারেল কমে গেছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল আমদানিকারক দেশ চীন বিদ্যুৎচালিত পরিবহনের প্রসার এবং কয়লা-ভিত্তিক কেমিক্যালের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।

 চীন জুলাই ও আগস্টে সাগরপথে তেল আমদানি দৈনিক ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল থেকে কমিয়ে ৭০ লাখ ব্যারেলে নামিয়ে এনেছে। তাছাড়া চীনের নিজস্ব ১.১৭ বিলিয়ন ব্যারেলের বিশাল তেলের মজুদ বৈশ্বিক বাজারকে এক ধরণের স্বস্তি দিচ্ছে।

স্পট মার্কেট ও আগামী দিনের পূর্বাভাস 

যদিও ফিউচার মার্কেটে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে, তবে ভৌত বা স্পট মার্কেটে কিন্তু ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ওমান ও দুবাই ক্রুডের ক্যাশ মূল্য ইতোমধ্যেই ১০৪ থেকে ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। 

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ডিসেম্বরের দিকে বাজারে ডিযেলের তীব সংকট তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে গোল্ডম্যান স্যাক্স এবং মরগান স্ট্যানলির মতো বৈশ্বিক ব্যাংকগুলো তাদের ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য পূর্বাভাস বাড়াতে শুরু করেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে বছরের শেষ প্রান্তিকে তেলের গড় মূল্য ১০০ ডলারের ঘরে পৌঁছাতে পারে।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম