বার্গার-ফ্রাইড চিকেন আর দিনে ১২ ক্যান ডায়েট কোক— ট্রাম্পের খাদ্যতালিকায় আর কী থাকে
Advertisement
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবিটি এইআই দিয়ে তৈরি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজনীতির মঞ্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যতটা আলোচিত তার বিতর্কিত বক্তব্য, নির্বাচনি সমাবেশ আর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের জন্য, খাবারের টেবিলেও তিনি ততটাই ব্যতিক্রমী। বার্গার, ফ্রাইড চিকেন, স্টেক, কেক আর দিনে ১২ ক্যান পর্যন্ত ডায়েট কোক—এটাই তার খাবারের দুনিয়ার পরিচিত চিত্র। সবুজ সবজির প্রতি অনীহা, ব্যায়ামে অনাগ্রহ আর ফাস্টফুডের প্রতি প্রবল ঝোঁক—সব মিলিয়ে ট্রাম্পের খাদ্যাভ্যাস যেন তার ব্যক্তিত্বেরই আরেকটি অদ্ভুত অধ্যায়। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর একজন মানুষের প্রতিদিনের খাবারের তালিকা আসলে কেমন? আর এত ফাস্টফুড ও মিষ্টির মাঝেও কীভাবে তিনি নিজের কর্মশক্তি ধরে রাখেন? চলুন, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ট্রাম্পের খাবারের টেবিলের গল্প।
বার্গার, ফ্রাইড চিকেন আর প্রচুর ডায়েট কোক
ফাস্টফুডের প্রতি ট্রাম্পের ঝোঁক অনেকটাই কিংবদন্তিতুল্য। ব্যক্তিগত বিমানে তাকে কেএফসির বালতি ভর্তি ফ্রাইড চিকেন খেতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতেও তাকে ম্যাকডোনাল্ডসের বার্গার ও ফ্রাই খেতে দেখা যায়।
ট্রাম্পের সাবেক নির্বাচনী প্রচার উপদেষ্টা কোরি লেওয়ানডোস্কি ও ডেভিড বসি একবার জানিয়েছিলেন, তার (ট্রাম্প) ব্যক্তিগত বিমানে সবসময় চার ধরনের খাবার মজুত থাকত। তারা মজা করে এগুলোকে ট্রাম্পের ‘চার প্রধান খাদ্যগোষ্ঠী’ বলেছিলেন—ম্যাকডোনাল্ডস, কেনটাকি ফ্রাইড চিকেন, পিৎজা এবং ডায়েট কোক।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ট্রাম্প দিনে ১২ ক্যান পর্যন্ত ডায়েট কোক পান করতেন। এতটাই বেশি যে, হোয়াইট হাউসে তার ডেস্কে একটি বিশেষ বোতাম রাখা ছিল—চাইলেই যেন নতুন একটি ক্যান ডায়েট কোক এনে দেওয়া যায়।
আগের অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেখানে শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কথা বলতেন, ট্রাম্প প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, তিনি খুব একটা ব্যায়াম করতে পছন্দ করেন না। বরং তার বিশাল নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে দীর্ঘ সময়ের ব্যস্ততাকেই তিনি এক ধরনের ‘শারীরিক পরিশ্রম’ হিসেবে দেখেন।
ভালোভাবে পোড়ানো স্টেক, সঙ্গে কেচাপ
ফাস্টফুডের বাইরে ট্রাম্পের পছন্দের খাবারের তালিকায় রয়েছে ভালোভাবে রান্না করা স্টেক। আর সেই স্টেকের সঙ্গে থাকে প্রচুর কেচাপ।
মার-এ-লাগোর সাবেক বাটলার টনি সেনেকাল একবার জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প মাংস অতিরিক্ত রান্না করা বা ভালোভাবে পোড়ানো অবস্থায় পছন্দ করেন। পাশাপাশি তিনি চাইতেন না স্টেকের সঙ্গে কোনো ‘অপ্রয়োজনীয়’ কিছু দেওয়া হোক। অর্থাৎ সবজি, সাজসজ্জার উপকরণ বা অভিনব কোনো সস তার পছন্দ ছিল না।
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে ট্রাম্পের নিজের নামে কিছু বিশেষ খাবারও ছিল। এর মধ্যে ছিল ‘মিস্টার ট্রাম্পস ওয়েজ সালাদ’ এবং তার মায়ের বিখ্যাত মিটলোফের রেসিপি।
তবে সালাদ খেলেও ট্রাম্পের খাবারের ধরন খুব একটা বদলাত না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সালাদের ওপরও তিনি প্রচুর পরিমাণে থাউজ্যান্ড আইল্যান্ড ড্রেসিং ঢেলে খেতেন।
মিষ্টির প্রতি দুর্বলতা
বার্গার ও ফ্রাইয়ের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি ট্রাম্পের রয়েছে মিষ্টির প্রতিও বেশ দুর্বলতা। হোয়াইট হাউসে তার সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে যখন অতিথিদের আইসক্রিম পরিবেশন করা হতো, তখন অন্যরা এক স্কুপ করে পেলেও ট্রাম্প পেতেন দুই স্কুপ।
এমনকি তার ব্যক্তিগত বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানেও ওরিও, ভিয়েনা ফিঙ্গারস, বিভিন্ন ধরনের আলুর চিপস ও প্রেটজেল মজুত থাকত।
মিষ্টির প্রতি তার ভালোবাসার একটি আলোচিত উদাহরণ পাওয়া যায় ২০১৭ সালে। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প সিরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাকে পরিবেশন করা ‘সবচেয়ে সুন্দর চকলেট কেক’ নিয়ে গর্ব করেছিলেন।
ট্রাম্প কি সবজি খান?
সবুজ শাক-সবজির প্রতি ট্রাম্পের অনীহা বেশ পরিচিত। তবে এর মানে এই নয় যে তিনি একেবারেই সবজি খান না।
ট্রাম্পের সাবেক হোয়াইট হাউস চিকিৎসক রনি জ্যাকসনের বক্তব্য অনুযায়ী, তার খাদ্যাভ্যাস কিছুটা স্বাস্থ্যকর করতে চিকিৎসকদের কখনো কখনো ম্যাশড পটেটোর সঙ্গে ফুলকপি মিশিয়ে দিতে হতো, যাতে ট্রাম্প বুঝতে না পেরে কিছুটা সবজি খেয়ে ফেলেন। তবে সবুজ শাকসবজির প্রতি তার অনাগ্রহ আছেই।
জ্যাকসন আরও জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প শরীরচর্চায় খুব একটা আগ্রহী নন। বরং নির্বাচনি প্রচারণার সময় দীর্ঘ সময় ধরে চলাফেরা ও সমাবেশে ব্যস্ত থাকাকেই তিনি নিজের ব্যায়ামের বিকল্প হিসেবে দেখতেন।
ম্যাকডোনাল্ডসের ড্রাইভ-থ্রুতে ট্রাম্প
ফাস্টফুডের প্রতি ট্রাম্পের ভালোবাসা ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় যেন নতুন মাত্রা পায়
পেনসিলভানিয়ায় প্রচারণার সময় তিনি একটি ম্যাকডোনাল্ডসের ড্রাইভ-থ্রুতে গিয়ে ‘কাজ’ও করেন। কিচেন অ্যাপ্রন পরে তিনি গ্রাহকদের হাতে ম্যাকনাগেটস ও চিজবার্গার তুলে দেন। সেখানে ট্রাম্প জানান, ম্যাকডোনাল্ডসের মেনুর প্রায় সবকিছুই তার পছন্দ।
ঘটনাটি নিঃসন্দেহে প্রচারণার অংশ ছিল। কিন্তু এর মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়—ফাস্টফুড শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের খাবার নয়, বরং এটি তার জনপরিচয়েরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রেসিডেন্টের খাবার, নাকি স্বাস্থ্যঝুঁকি?
এত ফাস্টফুড, মিষ্টি ও ব্যায়ামের প্রতি অনীহা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প বরাবরই নিজের সুস্বাস্থ্যের কথা বলে এসেছেন। এমনকি ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি দাবি করেছিলেন, তার ওজনও কমেছে।
তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ব্রুস অ্যারনওয়াল্ডও একবার ট্রাম্পের স্বাস্থ্যের বিষয়ে ইতিবাচক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময়টি ছিল প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ৮১তম জন্মদিনের কাছাকাছি।
ট্রাম্প নিজের উচ্চ কর্মশক্তির কথা বললেও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই কম শারীরিক পরিশ্রম এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
হোয়াইট হাউসের চিকিৎসকেরাও তাকে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং আরও বেশি শারীরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে ট্রাম্প বাস্তবে তার খাদ্যাভ্যাসে কতটা পরিবর্তন এনেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
‘সাধারণ মানুষের মতো’ নাকি চিন্তার কারণ?
ট্রাম্পের খাবারের অভ্যাস নিয়ে আমেরিকানদের আগ্রহ ও মতভেদ দুটোই রয়েছে।
তার সমর্থকদের কাছে ম্যাকডোনাল্ডস ও কেএফসির মতো খাবারের প্রতি ট্রাম্পের ভালোবাসা তাকে আরও সাধারণ মানুষের কাছাকাছি একজন ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরে। অর্থাৎ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও তিনি সাধারণ আমেরিকানদের মতোই পরিচিত ও সহজলভ্য খাবার উপভোগ করেন।
অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে তার স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি অনীহা এবং ব্যায়াম না করার প্রবণতা উদ্বেগের বিষয়। তাদের প্রশ্ন, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে এমন জীবনযাপন কতটা কার্যকর?
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনোমিক টাইমস




