Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

লোহিত সাগর থেকে সৌদি আরব, হুথিদের উত্থান যেভাবে

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০১ পিএম

লোহিত সাগর থেকে সৌদি আরব, হুথিদের উত্থান যেভাবে

২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে উৎখাত করে।

Advertisement

ইয়েমেনের হুথিরা একসময় ছোট একটি পাহাড়ি মিলিশিয়া ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা শক্তিশালী হয়ে এখন বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব অনেক বেড়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইরানের সহযোগিতায় হুথিরা ধীরে ধীরে এমন একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে, যারা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে এবং প্রতিবেশী সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালাতে সক্ষম।

যেভাবে উত্থান

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে হুথি পরিবারের নেতৃত্বে জায়দি শিয়া মুসলিমদের পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে গোষ্ঠীটির যাত্রা শুরু। পরে তারা সরকারের বিরুদ্ধে ছয়টি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং শক্তিশালী স্থানীয় মিলিশিয়া গড়ে তোলে।

২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে সেই সুযোগ কাজে লাগায় হুথিরা। আরও বিস্তৃত এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়ে তারা ইরান ও ইরানের লেবানিজ মিত্র হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।

২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে উৎখাত করে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থিত রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া থামিয়ে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। শুরু হয় দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, যা শেষ পর্যন্ত অচলাবস্থায় গিয়ে ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হয়।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানায় হুথিরা। পাশাপাশি ইসরাইল ও লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তারা। 

ইয়েমেনে সামরিক পরিস্থিতি

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গিয়ে পুরোনো যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে আবার লড়াই শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর ইয়েমেনের মারিব ও জাওফ, দক্ষিণের উচ্চভূমির তাইজ, মধ্যাঞ্চলের ধালে এবং লোহিত সাগরের তিহামা উপকূলীয় অঞ্চল।

গত সপ্তাহে হুথিরা দক্ষিণ তিহামা অঞ্চলে অগ্রসর হয়ে প্রথমে মোচা বন্দরনগরী এবং পরে লোহিত সাগরের উপকূল ও দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর ফলে ১৯ কিলোমিটার প্রশস্ত বাব আল-মান্দাব প্রণালির পুরো উপকূলজুড়ে তাদের অস্ত্র মোতায়েনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই ভূখণ্ডগত সাফল্য লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব থেকে এশিয়ায় তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সৌদি আরব সরকারপন্থি বাহিনীর সমর্থনে বিমান হামলা চালিয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে কতটা শক্তিশালী হুথিরা

দূরপাল্লায় নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতার কারণে ইয়েমেনের বাইরেও হুথিদের গুরুত্ব বেড়েছে। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটারের বেশি দূরে ইসরাইল পর্যন্ত পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের প্রধান বিমানবন্দরের সীমানায় আঘাত হানে।

সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হুথিরা বারবার হামলা চালিয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যার ফলে ওই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে হুথিদের ড্রোন হামলাও নিয়মিত হয়েছে এবং ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির আগের সময়ের তুলনায় এখন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার বেড়েছে।

অস্ত্রের মজুদ পায় যেভাবে

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুইভাবে হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সেগুলো হলো প্রযুক্তিগত সহায়তা ও নিজস্ব উৎপাদন।  জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ওমান সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে এবং সমুদ্রপথে ব্যাপক অস্ত্র পাচার হয়েছে।

জব্দ করা সরঞ্জামের মধ্যে ছিল ড্রোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জাহাজের নেভিগেশন তথ্য গ্রহণের সরঞ্জাম, ড্রোনের ইঞ্জিন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন উপাদান। ইরান হুথিদের অস্ত্র ও বিশেষজ্ঞ সরবরাহ করেছে বলে ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে হুথিদের অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে।

সামরিক সক্ষমতা বাড়ল যেভাবে

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হুথিদের সামরিক কৌশলের মধ্যে রয়েছে অনুপ্রবেশ, ড্রোন হামলা, গোলাবর্ষণ এবং মাইন ও বিস্ফোরক স্থাপন। তাদের যোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সিদেরও নিয়োগ করা হয়েছে।

ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও হিজবুল্লাহর প্রশিক্ষণ হুথিদের সামরিক রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক বারায়া শিবান বলেন, আরব বসন্তের পরপরই এই প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এর মাধ্যমে হুথিরা একটি মিলিশিয়া বাহিনী থেকে আরও সংগঠিত সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পরিচালনাকারীরা হুথিদের সঙ্গে ইয়েমেনে অবস্থান করছিলেন। ইরানের কুদস বাহিনীর জেনারেল আবদোলরেজা শাহলায়িও একসময় ইয়েমেনে থেকে হুথিদের সঙ্গে কাজ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম